বহু দশকের মধ্যে নেপালের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারটিকে অন্তর্দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কী ভাবে দুর্বল করে দিল।
২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কেউ বিশ্বাস করতেন না যে কমিউনিস্টরা নেপালে ক্ষমতায় আসতে পারবে এবং এমন একটা শক্তি হয়ে উঠবে যাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। কাজেই যখন কে পি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল–ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট (সিপিএন–ইউএমএল) ও পুষ্পকমল দহলের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল–মাওয়িস্ট সেন্টার (সিপিএন–এমসি)–এর জোট নেপালের পার্লামেন্টের, অর্থাৎ ২৭৫ আসনের প্রতিনিধি সভার, প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ আসন (৬৪ শতাংশ) জিতে নিল, তখন তা ছিল বেশ বিস্ময়কর। কমিউনিস্টরা নিজেদের শক্তি আরও সুসংহত করে ফেলল যখন দুই প্রধান দল সিপিএন–ইউএমএল ও সিপিএন–এমসি মিলে গিয়ে ২০১৮ সালের মে মাসে তৈরি করল নতুন দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি)।
কমিউনিস্টরা শুধু কেন্দ্রীয় স্তরেই সরকার গড়ল না, সাতটি প্রদেশের ছ’টিতে এবং ৭৫৩টি গ্রাম পরিষদ বা পুরসভার অধিকাংশতেও জয়ী হল। ভোটে কমিউনিস্টদের এই অভূতপূর্ব জয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কে পি শর্মা ওলি নেপালের অন্যতম সর্বাধিক শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে এলেন। তাঁর স্থান হল প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুর রানা (১৮৪৬–১৮৭৭) ও প্রধানমন্ত্রী বি পি কৈরালার (১৯৫০–৬০) সঙ্গে একাসনে।
ভোটে কমিউনিস্টদের এই অভূতপূর্ব জয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কে পি শর্মা ওলি নেপালের অন্যতম সর্বাধিক শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে এলেন। তাঁর স্থান হল প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুর রানা (১৮৪৬–১৮৭৭) ও প্রধানমন্ত্রী বি পি কৈরালার (১৯৫০–৬০) সঙ্গে একাসনে।
কিন্তু পরিহাসের কথা হল এনসিপি নেতা কে পি শর্মা ওলি সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেললেন, যদিও তিনি পাঁচ বছর শাসন করার জনাদেশ পেয়েছিলেন। এই ঘটনাটাই আরও জমাট বাঁধল যখন জুলাইয়ের গোড়ার দিকে এক ঐতিহাসিক রায়ে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট নেপালি কংগ্রেস পার্টির নেতা শের বাহাদুর দেওবাকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে নতুন পার্লামেন্ট তৈরি করল। তার আগে এই বছরের মে মাসে ওলি নিজেই পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছিলেন।
সাংবিধানিক বন্দোবস্ত অনুযায়ী ১৩ জুলাই শের বাহাদুর দেওবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। তার অব্যবহিত পরেই ১৮ জুলাই ২৭১ আসনের পার্লামেন্টে তিনি আস্থাভোটেও জয়ী হলেন। তাঁর প্রয়োজন ছিল শুধু ১৩৮ জন আইন–প্রণেতার সমর্থন, কিন্তু তাঁর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ১৬৫ জন, আর ৮৩ জন সমর্থন করেছিলেন ওলিকে। আস্থা ভোটের সময় নেপালি কংগ্রেসের ৬১ জন ছাড়াও সিপিএন–এমসি–র ৪৮ জন, জনতা সমাজবাদী পার্টির ৩২ জন, সিপিএন–ইউএমএল–এর মাধব কুমার নেপাল গোষ্ঠীর ২২ জন, ওলি–গোষ্ঠীর আট জন ও তিন নির্দল আইনসভা–সদস্য দেওবার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
এনসিপি–র মধ্যে প্রাধান্যের লড়াইতে দহল দলের আর এক শক্তিশালী নেতা মাধব কুমার নেপালের সঙ্গে ঘরোয়া জোট তৈরি করলেন ওলিকে সরানোর জন্য।
নেপালে কমিউনিজমের পতনের অন্যতম বড় কারণ ছিল কে পি শর্মা ওলির একচ্ছত্র ক্ষমতা, যার উৎস ছিল দলের, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের, ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসক প্রতিনিধি সভাগুলোর উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্থাকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কব্জায় নিয়ে এসে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ওলি ও এনসিপি–র সহ–নেতা পুষ্পকমল দহলের মধ্যে আড়াই আড়াই বছর করে সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের বোঝাপড়া হয়েছিল, ওলি তা মানেননি। কাজেই এনসিপি–র মধ্যে প্রাধান্যের লড়াইতে দহল দলের আর এক শক্তিশালী নেতা মাধব কুমার নেপালের সঙ্গে ঘরোয়া জোট তৈরি করলেন ওলিকে সরানোর জন্য। একদিকে কমিউনিস্ট পার্টিতে ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীকোন্দল এবং অন্যদিকে সরকারের সর্বস্তরে দুর্নীতি সরকারের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি করল। এই পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের মে মাসে সিপিএন–ইউএমএল ও সিপিএন–এমসি–র মিলনকে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করার পর এনসিপি–র সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভাঙন ঘটল। এর পরেই কমিউনিস্ট পার্টির দুই গোষ্ঠী, ওলির সিপিএন–ইউএমএল ও দহলের সিপিএন–এমসি, মিলনের আগেকার অবস্থায় ফিরে গিয়ে দুটি পৃথক দলে পরিণত হল।
তারপরেও অবশ্য সিপিএন–ইউএমএল–এর ভেতরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শেষ হল না। দলের এক প্রবীণ নেতা মাধব কুমার মনে করছিলেন তিনি দলের মধ্যে বিমাতৃসুলভ আচরণের শিকার হয়েছেন, কারণ তাঁর সমর্থকদের দলে কোণঠাসা করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেওবা বিরোধী দল সিপিএন–ইউএমএল–কে আরও দুর্বল করার চেষ্টা শুরু করলেন। এর জন্য তিনি একটা অর্ডিন্যান্স নিয়ে এলেন যাতে কোনও রাজনৈতিক দলের যে কোনও গোষ্ঠীর কাছে পার্লামেন্টের বা কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ২০ শতাংশ সদস্য থাকলে সেই গোষ্ঠীকে দল ভাঙার ক্ষমতা দেওয়া হল।
কিন্তু নেপালে দীর্ঘদিন পরে যে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এসেছিল তার জায়গায় এবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ আগামী নির্বাচনে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়।
আগে দল ভাঙতে হলে রাজনৈতিক দলের একটি গোষ্ঠীকে পার্লামেন্টারি পার্টি ও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ৪০ শতাংশ সদস্যের সমর্থন পেতে হত। কাজেই আগে দল ভাঙা কঠিন ছিল। কিন্তু নতুন অর্ডিন্যান্স কার্যকর হওয়ার পর তা সহজ হয়ে গেছে। এই অর্ডিন্যান্স–এর ধারা কাজে লাগিয়ে সিপিএন–ইউএমএল–এর মাধব কুমার নেপালের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ২৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নতুন দল সিপিএন (ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট) হিসেবে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করল; তখন ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে ছিলেন ২৯ জন আইনপ্রণেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির ৫৫ জন সদস্য।
এনসিপি–তে ভাঙন না–হলে কমিউনিস্টরা দীর্ঘদিন দেশ শাসন করতে পারতেন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে কেন্দ্রে তাঁদের সরকার চলে গেল, আর সংগঠন ছোট ছোট দলে ভেঙে গেল। এর মূল কারণ নেতাদের অহং এবং নেতাদের মধ্যে গোষ্ঠীবিভাজন। কিন্তু তার চেয়েও তাঁদের যে বৃহত্তর ক্ষতি হল তা হচ্ছে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বেড়ে–চলা দুর্নীতি রুখতে এবং দেশে কোভিড–১৯–এর প্রকোপ মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য দেশের মানুষের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতার হানি।
তাঁরা মানুষের কল্যাণের দিকে তেমন দৃষ্টি না–দিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে ব্যস্ত ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর আরও ভাঙনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কমিউনিস্ট ব্লকের এই ধরনের ভাঙন দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করে এখনকার শাসক দল নেপালি কংগ্রেসের সুবিধা করে দিল। আগামী নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস এর ফসল ঘরে তুলবে। কিন্তু নেপালে দীর্ঘদিন পরে যে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এসেছিল তার জায়গায় এবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ আগামী নির্বাচনে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Hari Bansh Jha was a Visiting Fellow at ORF. Formerly a professor of economics at Nepal's Tribhuvan University, Hari Bansh’s areas of interest include, Nepal-China-India strategic ...
Read More +