Originally Published Dhaka Tribune Published on Sep 08, 2022 Commentaries 0 Hours ago

সঙ্কটের সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলিকে সাহায্য করার কাজে প্রথম সারিতে থেকেছে ভারত।

দক্ষিণ এশিয়ার দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বিশ্বস্ত শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান
দক্ষিণ এশিয়ার দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বিশ্বস্ত শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান

কোভিড-১৯ অতিমারি এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই সব ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলিতে রাজস্ব ঘাটতি, নগণ্য রফতানি আয় ও বৈচিত্র্য, বৈদেশিক ঋণ, বিদেশি মুদ্রার হ্রাসপ্রাপ্ত সঞ্চয়, খারাপ প্রশাসন এবং দুর্নীতির মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাগুলিকে গুরুতর করে তুলেছে।

নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরে এই সূচকগুলির ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং অতি সম্প্রতি বাংলাদেশও আই এম এফ-এর দ্বারস্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা উভয় দেশই তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতারও সম্মুখীন হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি মলদ্বীপ এবং ভুটানের অভ্যন্তরেও ক্ষোভের আগুন উস্কে দিয়েছে এবং দেশগুলির অভ্যন্তরে সংস্কারের দাবি জোরালো করেছে।

সমগ্র অঞ্চল জুড়ে যখন এহেন বিধ্বংসী পরিস্থিতি, তখন প্রধান শক্তিগুলি এই বিষয়ে তৎপরতা দেখানোয় অনীহা প্রকাশ করেছে। অঞ্চলটির এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হওয়ার সুবাদে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থিতিশীলতা প্রদান করার সম্ভাবনা এবং স্বার্থ দুই-ই আছে ভারতের। এবং এখনও পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশগুলিকে তাদের সঙ্কট থেকে উদ্ধার করার কাজে ভারত সক্রিয় ভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

অঞ্চলটির এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হওয়ার সুবাদে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থিতিশীলতা প্রদান করার সম্ভাবনা এবং স্বার্থ দুই-ই আছে ভারতের। এবং এখনও পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশগুলিকে তাদের সঙ্কট থেকে উদ্ধার করার কাজে ভারত সক্রিয় ভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

শ্রীলঙ্কার সঙ্কট প্রাথমিক ভাবে অঞ্চলস্থিত অন্যান্য দেশের জন্য ক্ষোভের সূচনাকারী এক মানদণ্ডের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ দিন যাবৎ উপেক্ষিত কাঠামোগত সমস্যাগুলি, যেমন – বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্প সঞ্চয় ও উৎস, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি জনতাবাদ, অযৌক্তিক নীতিগ্রহণ এবং বাহ্যিক ধাক্কা একটি পূর্ণ মাত্রার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের নেপথ্যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি দেশটি এখনও খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র অভাবের সম্মুখীন। বৈদেশিক সঞ্চয়ের ঘাটতির ফলে দ্বীপ দেশটি নিজেকে ‘দেউলিয়া’ বলে ঘোষণা করতে বাধ্য হয় এবং এর ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে আই এম এফ দ্বারা উদ্ধারের সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনের তীব্রতা দেশটির স্থিতিশীলতা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণের পথকে জটিলতর করেছে। মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভটি বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর সামগ্রিক পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়েছে। দেশের জনসাধারণ তাদের প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ না করলে দ্বীপদেশটির পক্ষে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

পাকিস্তানের অর্থনীতিও দীর্ঘদিন যাবৎ একই ধরনের কাঠামোগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল, যার ফলস্বরূপ এ বছর দেশটিতে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমান সরকার কর আদায় এবং রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধির চেষ্টা চালাতে গিয়ে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটকে আরও উস্কে দিয়েছে। মোট ১২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাকিস্তান আরও এক বার, ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই নিয়ে ২৪তম বারের জন্য আই এম এফ-এর কাছে বেল আউট বা আর্থিক সাহায্যের অনুরোধ জানিয়েছে। ঋণের বোঝা ক্রমশ বাড়তে থাকা, চরমপন্থার চ্যালেঞ্জ অব্যাহত থাকা এবং নিজের ঋণ শোধের অক্ষমতা, এমনকি বিনিয়োগও সুনিশ্চিত করতে না-পারা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাহ্যিক ধাক্কা নেপালের অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলিকেও তীব্রতর করে তুলেছে। দেশের বাইরে থেকে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি স্বল্প বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারের নেপথ্যে থাকা প্রধান কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এর ফলে ইতিপূর্বের ক্ষীণ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ আরও হ্রাস পেয়েছে এবং আমদানি-নির্ভর দেশটি জ্বালানি-সহ নির্দিষ্ট বেশ কয়েকটি পণ্যের আমদানির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে অথবা প্রয়োজন অনুসারে আমদানির পরিমাণ হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে। শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের মতো সঙ্কটজনক অবস্থা না হলেও দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক ইতিহাস বিবেচনা করলে নেপালের সঙ্কটকে একটি আদর্শ বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

পূর্বোক্ত তিনটি ক্ষেত্রেই চিনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চিন প্রদত্ত স্বল্প শর্তযুক্ত এবং সহজলভ্য ঋণ সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে কোনও রকম কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই ক্রমাগত ঋণ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়। এবং এমনটা করতে থাকার ফলে দেশগুলি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে আরও দুর্বল হয়ে পরে। এর পাশাপাশি চড়া সুদে চিনের ঋণ প্রদান এবং নিজস্ব মূলধনী পণ্য ও শ্রমিকদের কাজে লাগানোর ফলে আয়োজক দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধে পাওয়ার বদলে ক্রমশ দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়ে।

ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি করা বা ঋণ পরিকাঠামোর পুনর্গঠন নিয়ে চিন দ্বিধাগ্রস্ত এবং যে সমস্ত ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ কঠিন বলে মনে হচ্ছে, সেই সব ক্ষেত্রে সহায়তা করার বিষয়েও অনাগ্রহী। পাকিস্তানে চিনা বিনিয়োগ স্তব্ধ হয়েছে, শ্রীলঙ্কাও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহারের সম্মুখীন হয়েছে এবং নেপাল চিনের অস্বচ্ছতার কথা মাথায় রেখে নিজ ভূখণ্ডে এখনও একটিও বি আর আই প্রকল্পের কাজ শুরু করেনি। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীও চিনের বি আর আই প্রকল্পগুলি সম্পর্কে একই রকমের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন অঞ্চলটি মুদ্রাস্ফীতি এবং ধীর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সম্মুখীন।

পাকিস্তানে চিনা বিনিয়োগ স্তব্ধ হয়েছে, শ্রীলঙ্কাও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহারের সম্মুখীন হয়েছে এবং নেপাল চিনের অস্বচ্ছতার কথা মাথায় রেখে নিজ ভূখণ্ডে এখনও একটিও বি আর আই প্রকল্পের কাজ শুরু করেনি।

এহেন মন্তব্যগুলি মোটেও ভিত্তিহীন নয়। চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশ কাঠামোগত সমস্যা এবং বাহ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশটি রফতানি বৃদ্ধি, বৃহৎ পরিকাঠামোগত নির্মাণ, বাণিজ্য এবং সংযোগ ব্যবস্থার উপরে মনোনিবেশ করেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ অতিমারি এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনা অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ, বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি প্রেরিত অর্থ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার হ্রাসের মতো ঘটনাগুলিকে ত্বরান্বিত করেছে। বাধ্য হয়ে সে দেশের সরকার প্রি-এম্পটিভ অ্যাসিস্ট্যান্স বা অগ্র ক্রয়াধিকারের সহায়তার জন্য আই এম এফ-এর কাছে আবেদন জানিয়েছে।

যখন সমগ্র অঞ্চলটি এক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়তার ক্ষমতা ও আগ্রহ– দুই-ই ভারতের রয়েছে। ভারত শ্রীলঙ্কাকে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সাহায্য করেছে যখন শ্রীলঙ্কার এহেন অবস্থার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী অন্য প্রধান শক্তিগুলি এক উদাসীন মনোভাব দর্শিয়েছে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে ভারতীয় স্বার্থের প্রতি অসংবেদনশীল হওয়া সত্ত্বেও নয়াদিল্লির শ্রীলঙ্কাকে সাহায্য প্রদানের ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে স্থিতিশীলতা অর্জনের নিরিখে ভারতের গভীর আগ্রহকেই সুস্পষ্ট করে।

বহুমেরু বিশ্ব এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে নিজের ভূমিকা উপলব্ধি করার পাশাপাশি ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রদানকারী ভূমিকা পালন করে যেতে চাইছে। বর্তমান সঙ্কট ভারতকে বহুপাক্ষিক এবং ক্ষুদ্রতর বিন্যাসগুলি থেকে সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজতর করার মাধ্যমে অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রয়াস চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভারতকে অঞ্চলটিতে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্পের সূচনা করার মাধ্যমে এবং প্রকল্পগুলিকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সংযোগ ব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রসারের কাজে সাহায্য করবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক গতিপথের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলটি কী ভাবে তার উপরে প্রভাব বিস্তারকারী বহুবিধ সমস্যাগুলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন অন্যান্য প্রধান শক্তি সমস্যাগুলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।


এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-এ।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Aditya Gowdara Shivamurthy

Aditya Gowdara Shivamurthy

Aditya Gowdara Shivamurthy is an Associate Fellow with ORFs Strategic Studies Programme. He focuses on broader strategic and security related-developments throughout the South Asian region ...

Read More +
Harsh V. Pant

Harsh V. Pant

Professor Harsh V. Pant is Vice President – Studies and Foreign Policy at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations ...

Read More +