ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ যখন টিকার লক্ষ্যপূরণের জন্য লড়াই করছে, সেই সময় ভারত এই অঞ্চলে ভ্যাকসিন–সমতা নিশ্চিত করতে অন্য শক্তিগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তিতে টিকাকরণ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে পারে।
এই নিবন্ধ একটি সিরিজের অংশ, যার নাম ‘ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে স্থিতিশীল উন্নয়ন’।
২০২১ সাল যখন শেষ হতে চলেছে, সেই সময় অনেকেই আশা করেছিলেন যে বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে কোভিড-১৯ অতিমারি শেষ হয়ে আসার লক্ষণ দেখা যাবে। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হার তখন কম ছিল, এবং বেশিরভাগ দেশ সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সঙ্গে ‘বাঁচার’ কৌশল আয়ত্ত করছিল। ভারতে অবশ্য উৎসবের মরসুম কর্তৃপক্ষকে আতঙ্কিত করে তুলছিল, কারণ সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। প্রায় একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি একটি নতুন স্ট্রেন হিসেবে ওমিক্রন-কে শনাক্ত করেছিল, যা এখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরবর্তী কোভিড-১৯ তরঙ্গ তৈরি করছে। অতিমারি চলার পুরো সময়টায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) দেশগুলিকে একত্র হওয়ার এবং একযোগে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলির মধ্যে এই ধরনের সহযোগিতা ভারতকে এই ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে অগ্রগণ্য করে তুলতে পারে।
কোয়াড—ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত সমমনস্ক গণতন্ত্রগুলির একটি গোষ্ঠী—ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য হয়৷ কোয়াডের শুরুর শুরু ২০০৪ সালে, যখন ভারত মহাসাগরের প্রাণঘাতী সুনামির পর ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান ত্রাণকাজ সমন্বিত করেছিল। ভারত অবশ্য মনে করে এই ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত সমস্ত দেশগুলিই ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তারপর থেকে প্রাথমিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে মূলত সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। সহযোগিতার এই ক্ষেত্রগুলির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা একটি সাম্প্রতিক সংযোজন। অতিমারি প্রতিরোধের জন্য কোয়াড নেতারা কোভিড-১৯–এর কারণে উদ্ভূত জরুরি অবস্থার আরও ভাল ভাবে মোকাবিলা করতে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কোয়াড বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটিরও বেশি ভ্যাকসিন দান করবে। ২০২১–এর ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলিতে মোট ৭ কোটি ৯০ লক্ষ টিকার ডোজ দান করা হয়েছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার জন্য অন্য সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলির, যেমন টিকার উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের, ব্যবস্থাপনা কী ভাবে করা হবে তাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
একটি দেশের অভ্যন্তরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভ্যাকসিন সমতার বিষয়টি কোয়াড নেতাদের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা অনুশাসনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাম্প্রতিক তথ্য এই বিষয়টি তুলে ধরে যে বিশ্বব্যাপী নিম্ন-আয়ের দেশগুলির মধ্যে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪.২ শতাংশ পুরোপুরি টিকাপ্রাপ্ত। মধ্য ও উচ্চ-আয়ের দেশগুলির জনসংখ্যার টিকা পাওয়ার এই অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৩৫ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ। এই পার্থক্যের একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলিতে, যেখানে ক্লিনিকাল ট্রায়াল হয়েছিল, সেখানে ভ্যাকসিন ব্যবহারে ‘বিলম্বিত অনুমোদন’।
কোভ্যাক্স-এর কাঠামো যথেষ্ট নয়, এবং ভ্যাকসিন সমতা নিশ্চিত করতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা করতে পারে।
ভারতে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রা–জেনেকা কোভিশিল্ড ছিল প্রথম ভ্যাকসিন যা দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে স্থানীয় ভাবে তৈরি ভ্যাকসিনটির এই সব ট্রায়াল শুরু হয়েছিল ২০২০–র আগস্ট থেকে, অর্থাৎ ২০২০–র মে মাসে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে জৈবিক ভাইরাল উপাদানটি প্রথম পাওয়ার তিন মাস পরে। এর পর পাঁচ মাস সময় লেগেছিল কোভিশিল্ড ভারতীয়দের দেওয়া শুরু করতে। ২০২১–এর ১৬ জানুয়ারি থেকে তা দেওয়া শুরু হয়। দেশীয় কোভিড-১৯ টিকা কোভ্যাক্সিনের মাধ্যমে টিকাকরণের, আর ভারতে অনুমোদিত দ্বিতীয় টিকার ব্যবহারের, জন্য একই সময় লেগেছিল। স্থানীয় ভাবে তৈরি হলেও কোভিশিল্ড–এর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের ডোজগুলি পাওয়ার প্রশ্নে অগ্রাধিকার হিসেবে নির্দিষ্ট ছিল উচ্চ বা মধ্য-আয়ের দেশগুলি। ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার আগেই বিভিন্ন দেশ ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করার উপায় খুঁজে বার করছিল। বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেছিল। অনেকেই নির্মাতা/সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহের পথ নিয়েছিল, এবং এঁরা বেশিরভাগই মধ্য বা উচ্চ-আয়ের দেশের মানু্ষ।
কোভ্যাক্স (কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন্স গ্লোবাল অ্যাকসেস) প্রতিষ্ঠা করেছিল ‘হু’, আর এর লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক দেশে ভ্যাকসিন পাঠানো নিশ্চিত করা। তবে যে লক্ষ্যের জন্য এটি স্থাপন করা হয়েছিল, তা অর্জনে সাফল্য আসেনি। ভ্যাকসিনের ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিম্ন বা নিম্ন-মধ্য-আয়ের দেশগুলি এখনও পিছিয়ে রয়েছে। উচ্চ-আয়ের দেশগুলি ২০২০ সালের মে মাসেই ডোজ কিনে নিয়েছিল। তখনও ভ্যাকসিন সংস্থাগুলি মানুষের উপর কোনও পরীক্ষাই শুরু করেনি। কোভ্যাক্স-এর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য, যে দেশগুলি আগে থেকে ভ্যাকসিন কিনেছিল তাদের এক ধরনের ভ্যাকসিন রিফান্ড বা রিটার্নের ব্যবস্থা করা উচিৎ। তবে ওমিক্রন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় এখন তেমন কিছু ঘটার কোনও সম্ভাবনা নেই।
কোভ্যাক্স-এর ভ্যাকসিনের ন্যায্য বরাদ্দের পদ্ধতিতে সেই সমস্ত দেশের ভ্যাকসিন পাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল যেখানে কোভিড-১৯-এর বিপদ এবং ‘সুরক্ষার অভাব’ বেশি। কিন্তু প্রতিটি দেশই কোনও না কোনও ভাবে কোভিড-১৯–এর বিপদের মধ্যে রয়েছে বা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি এর আগেও, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় তরঙ্গের কবলে পড়েছিল তখন ভারত দায়িত্ব নিয়েছিল এবং দশ লক্ষ ডোজ পাঠিয়েছিল। ভারতের সিদ্ধান্তটি কিন্তু দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলির প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কারণ কয়েক মাস পরে ভারত কোভিড-১৯–এর দ্বিতীয় তরঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিল। ডেল্টা ভেরিয়্যান্টের আক্রমণে ভারতে রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যু প্রতিদিন হুহু করে বাড়ছিল। সমালোচনার হুল ছিল তীক্ষ্ণ, এবং তা অন্য দেশগুলির প্রতি ভারত সরকারের ‘দাতব্য’-কে বিদ্ধ করছিল। অন্য দেশগুলির বিপদ ও দুর্বলতা বেশি থাকলেও প্রশ্ন ছিল কেন নিজের নাগরিকদের প্রথমে টিকা দেওয়া হল না। এই ভাবে ভ্যাকসিন সমতার লক্ষ্যে কাজ করার প্রয়াস ব্যাহত হল। বিশ্বব্যাপী অন্য দেশগুলি যখন অতিমারির দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ তরঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিল, তখনও এই ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চ আয়ের দেশ ভারতে ভ্যাকসিন তৈরির কাঁচামাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ তারা ডেল্টা ভেরিয়্যান্টের বিরুদ্ধে নিজেদের তৈরি থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
কোভ্যাক্স-এর ভ্যাকসিনের ন্যায্য বরাদ্দের পদ্ধতিতে সেই সমস্ত দেশের ভ্যাকসিন পাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল যেখানে কোভিড-১৯-এর বিপদ এবং ‘সুরক্ষার অভাব’ বেশি। কিন্তু প্রতিটি দেশই কোনও না কোনও ভাবে কোভিড-১৯–এর বিপদের মধ্যে রয়েছে বা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্বব্যাঙ্কের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধা ডজনেরও বেশি দেশ রয়েছে যেগুলি নিম্ন-আয়ের বা নিম্ন-মধ্য আয়ের শ্রেণিভুক্ত। এই নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলিতেই এই অঞ্চলের মধ্যে জনসংখ্যা বেশি। ১ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে সিঙ্গাপুরের টিকা দেওয়ার হার সবচেয়ে বেশি ছিল।
চিত্র১: ২০২২–এর৫জানুয়ারিপর্যন্তকোভিড–১৯টিকাকরণহয়ে–যাওয়াজনসংখ্যারআনুপাতিকহার
উপলব্ধ প্রমাণ এই কথাই বোঝায় যে ভ্যাকসিনের কভারেজের পার্থক্য হয় একটি দেশের আয়ের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে। উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলির প্রতি ১০০ মানুষের জন্য যথাক্রমে ৫৮.৪৯, ১১.৯৫ এবং ১.২৬ ডোজ রয়েছে। উচ্চ-আয়ের দেশগুলিতে টিকা সংক্রান্ত নীতিগুলি বেশি শক্তিশালী; অন্য দিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে তা দুর্বল ও সীমিত। এই নীতিগুলি টিকা কভারেজের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও কাজ করেছিল। কোভ্যাক্স-এর কাঠামো যথেষ্ট নয়, এবং ভ্যাকসিন সমতা নিশ্চিত করতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা করতে পারে। ভারতের টিকাকরণের সংখ্যা ছিল মন–কাড়া, এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তা অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে। এই বিষয়ে অন্যান্য দেশের অনেক কিছু শেখার আছে। তবে, অন্তর্নিহিত যে উদ্বেগ থেকে গিয়েছে তা হল জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও টিকাপ্রাপ্ত নয়, এবং কোভিড-১৯ টিকার ক্ষেত্রে শহর-গ্রামীণ বিভাজনও রয়ে গেছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে যাদের টিকা দেওয়ার হার বেশি, তাদের অন্য নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলির টিকাকরণের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে হবে যাতে ‘হু’ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৭০ শতাংশ জনসংখ্যাকে ২০২২ সালের জুলাই মাসের মধ্যে অতিমারি রোধে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Ekta Jain has more than 13 years of experience in bioinformatics epidemiology data analytics databases andcomputer programming. She was a recipient of the National ...
Read More +