Published on Mar 21, 2023 Updated 0 Hours ago

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতও বিশ্বের নতুন শিল্প হাব হতে পারে

গর্জনরত বাঘ: ভারতের বিশ্ব @ ২০২৩

২০২৩ সাল ভারতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বছর। এটি জি২০ ও সাংহাই কো–অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)–এ ভারতীয় প্রেসিডেন্সির বছর। জি২০–র দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতীয় প্রেসিডেন্সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত বৈশ্বিক দক্ষিণ থেকে প্রেসিডেন্সি–ত্রয়ীর মাঝখানে রয়েছে:‌ ইন্দোনেশিয়া তার পূর্বসূরি, এবং ব্রাজিল তার উত্তরসূরি।

অন্যদিকে, এই বছরটিই সেই বছর যখন ওয়র্ল্ড পপুলেশন রিভিউ (ডব্লিউপিআর)–এর অনুমান অনুসারে জানুয়ারির মাঝামাঝি চিনকে অতিক্রম করে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে (ভারতের ১.৪১৭ বিলিয়ন বনাম চিনের ১.৪১২ বিলিয়ন) পরিণত হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে ভারতের জন্য ৫ ও ১০ ট্রিলিয়ন–ডলার জিডিপি অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে মানবপুঁজির এই বিশাল ভান্ডারটিকে একটি উৎপাদনশীল ফ্যাক্টর ইনপুটে রূপান্তরিত করার সুযোগ তৈরি করে। অবনতিশীল বৈশ্বিক ভূ–রাজনৈতিক ও আর্থিক পরিবেশ, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার হ্রাস, এবং চাহিদায় মন্দার ভয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাঙ্ক ভারতের জন্য বৃদ্ধির অনুমান ৬.৫ শতাংশ থেকে ৬.৯ শতাংশে উন্নীত করেছে, এবং কারণ হিসাবে বিশ্বব্যাপী ধাক্কার মধ্যে ভারতের অর্থনীতির দৃঢ় স্থিতিস্থাপকতার কথা উল্লেখ করেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গেসঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস করে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

অতিমারি ও তার পরবর্তী ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দিয়েছে। প্রথমত, নির্দিষ্ট অর্থনীতির উপর বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল বা জিভিসি–র অত্যধিক নির্ভরশীলতা অবশ্যই কমাতে হবে, এবং বৈচিত্র্য আনতে হবে। কারণ এই স্থানগুলিতে যে কোনও বড় ধরনের অভিঘাতের বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমানুক্রমিক (‌ক্যাসকেডিং)‌ প্রভাব থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অংশীদারির রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। দেশগুলি এখন বিশ্বায়ন ও স্থানীয়করণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে, যা উপ–আঞ্চলিক তুলনামূলক সুবিধাগুলিকে চিহ্নিত করে। তৃতীয়ত, এতে কোনও সংশয় নেই যে অতিমারিটি প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছুটা উন্নতি ঘটিয়েছে, এবং তা তৃণমূলে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরকারি পর্যায়ের সম্মেলন পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভারতের গল্প

এই তিনটি বিষয় থেকে ভারতীয় গল্পটি উঠে আসে, যার উপর ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের বছরে জোর দেওয়া উচিত। এর পুরোটাই মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগ (এমআইআই) দিয়ে শুরু হয়েছিল, যা ভারতকে একটি বৈশ্বিক ডিজাইন ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এমআইআই অবশ্যই একটি পুরনো আমদানি–প্রতিস্থাপন মতবাদের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু আদতে এটি ভারতে ব্যবসায়িক ইউনিট স্থাপনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্পোরেশনগুলিকে আকৃষ্ট করার উপযোগী অবস্থা তৈরি করার বিষয়।

একই সময়ে নিজেদের রাজ্যের অর্থনীতিগুলিকে এমন ইউনিট স্থাপনের উপযোগী আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসাবে উপস্থাপন করার দৌড়ে ভারতের উপ–জাতীয় ফেডারেল রাজ্য সরকারগুলিও সামিল হয়েছিল। এই প্রতিযোগিতামূলক ফেডারেলিজম কাঠামোর প্রক্রিয়ায় রাজ্যগুলি ক্রমাগত তাদের অনুশীলনে উল্লেখযোগ্য সংস্কার আনছে, এবং ব্যবসায়িক সংস্কার কর্ম–পরিকল্পনা বা বিআরএপি প্যারামিটারের  ভিত্তিতে ও ডিপার্টমেন্ট ফর প্রোমোশন অফ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড (ডিপিআইআইটি) নির্দেশিত পথে ব্যবসা করার লেনদেনের খরচ কমাতে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে। এটি শিল্প করিডোরগুলির বিকাশের দিকে চালিত করেছে, এবং এফডিআই–সদৃশ প্রতিরক্ষা উৎপাদন, রেলপথ, স্পেস, একক ব্র্যান্ড খুচরো ব্যবসা ইত্যাদির বিকাশ ঘটাচ্ছে।

ভারত ২১–২২ অর্থবর্ষে সর্বোচ্চ বার্ষিক এফডিআই পেয়েছে — ৮৪.৮৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটাই প্রত্যাশিত ছিল যে কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২২–২৩–এ কিছু এমআইআই ক্ষেত্রের জন্য আর্থিক প্রণোদনা থাকবে, যেমন অতিমারি বছরগুলিতে শুরু হওয়া প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা পিএলআই প্রকল্পকে খেলনা, বাইসাইকেল, চামড়া ও ফুটওয়্যারের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ। প্রকল্পটির লক্ষ্য উচ্চ–কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলিতে প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে আরও কর্মসংস্থান।

ভারতের তুলনামূলক অবস্থান কেমন?

গত দুই থেকে তিন দশক ধরে পশ্চিমী সংস্থাগুলি কম উৎপাদন খরচ ও প্রচুর দেশীয় ভোক্তা বাজারের কারণে চিনে বিনিয়োগ করেছে। এখন, দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে: অনেক পশ্চিমী কর্পোরেট চিন+১ কৌশল নিয়ে চিন্তা করছে, যার অর্থ কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি  কমাতে চিন ছাড়াও অন্যান্য দেশে ব্যবসায়িক বৈচিত্র্য ছড়িয়ে দেওয়া। এখানে ভারতের অবশ্যই একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কমপক্ষে সাতটি জায়গা রয়েছে যেখানে ভারত চিনকে ছাড়িয়ে গেছে।

প্রথমত, কম শ্রম ও উৎপাদন খরচের কারণে কম খরচে সোর্সিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে চিনের তুলনায় ভারতের স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভৌত পরিকাঠামোতে ক্রমাগত প্রচুর সরকারি বিনিয়োগের ফলে ভারতে পরিবহণের সময় ও খরচ ২০ শতাংশ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। চিনের ক্ষেত্রে কিন্তু প্রায়ই বলা হয় যে পিক–আপ, ওভার–দ্য–রোড ট্রান্সপোর্ট এবং চূড়ান্ত ডেলিভারি খুব কম সময়েই একক সংস্থা করে থাকে, যার ফলে শিপমেন্টের ট্র্যাকিং অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, তুলনামূলক জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ ভারতের পক্ষে কাজ করবে। ভারতের জনসংখ্যার ৫২ শতাংশেরও বেশি তিরিশের কমবয়সী;‌ কিন্তু চিনের অনুরূপ পরিসংখ্যানটি প্রায় ৪০ শতাংশে দাঁড়ানোয় আগামী ১০ বছরে তা শেষ হয়ে যাবে। ভারতের যুব সম্প্রদায় কিন্তু তখনও সঞ্চয় ও উপভোগের বৃদ্ধি ঘটিয়ে চলবে৷ উচ্চ ইন্টারনেটের সুযোগের (‌৪৩ শতাংশ)‌ পাশাপাশি উপনিবেশের যুগে শিল্প বিপ্লবের যে সমসাময়িক রূপগুলির সুবিধা ভারত নিতে পারেনি, এখন তা নেওয়ার জন্য তার তরুণ মানবপুঁজির ভিত্তিটি পর্যাপ্তভাবে ডিজিটাল দক্ষতা প্রদানের উপযুক্ত। নিওক্ল্যাসিকাল, এবং সেইসঙ্গে এন্ডোজেনাস গ্রোথ থিওরিগুলি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে দারিদ্র্যের পিছনে কারণ হিসাবে প্রযুক্তির স্তরের বৈচিত্র্যকেই নির্দেশ করে।

সুতরাং, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গেসঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস করে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

চতুর্থত, অনেক চিনা পণ্যের উপর শুল্ক ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভারতকে এই ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়। ইস্পাত পণ্যের উপর শুল্ক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পঞ্চমত, ভারতের শ্রম খরচ ও মজুরি চিনের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। চিনা মজুরি ২০১৯ সালে প্রতি মাসে ছিল ১,১৯৭.৩২ মার্কিন ডলার, যেখানে হিসাব অনুযায়ী ভারতে তা ছিল প্রতি মাসে ১৪৭.‌৪৬ মার্কিন ডলার। আরও নির্দিষ্টভাবে, ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারতের তুলনায় চিনে প্রতি ঘণ্টায় শ্রম উৎপাদনের গড় খরচ চার গুণ ছিল।

ষষ্ঠত, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতাই ভারতকে চিনের থেকে এগিয়ে রেখেছে। ইংরেজি হল ভারতে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা, এবং এক্সিকিউটিভরা প্রায়শই এটি ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যবহার করেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অনেক ইউরোপীয় ক্লায়েন্টদের জন্য যোগাযোগ সহজ করে তোলে।

সপ্তমত, সাম্প্রতিক নীতিগত হস্তক্ষেপগুলি ইঙ্গিত দেয় যে অনেক কর্পোরেট চিন+১ কৌশল অনুসরণ করবে বলে স্থির করায় যে সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারত তা কাজে লাগাতে তৈরি। প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ, বা পিএলআই স্কিম, ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্র–সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ নীতির উদারীকরণ, শ্রম ও কর ব্যবস্থার সংস্কার ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে বিনিয়োগের পরিবেশ বাড়ানোর জন্য একটি অনুকূল নীতি পরিবেশ তৈরি করেছে।

কর্ণাটক ও তেলঙ্গানায় ল্যান্ড পুল ও শিল্প টাউনশিপ স্থাপন, কর প্রণোদনা কার্যকর করা, এবং অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে ফাস্ট–ট্র্যাক ক্লিয়ারেন্সের অধীনে ১০০ শতাংশ এফডিআই স্বয়ংক্রিয় রুটে অনুমোদনের মতো নীতির মাধ্যমে আরও বিনিয়োগ এনে চিনকে মোকাবিলা করার জন্য ভারত ক্রমাগতভাবে শক্তি বাড়াচ্ছে, এবং নতুন উৎপাদন সংস্থাগুলির জন্য কর্পোরেট করের হার কমানোর মতো নানা রকম ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এছাড়া, ক্রমবর্ধমান গতিশীল বিশ্বব্যবস্থায় সাড়া দিয়ে ভারতীয় কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কোয়াড এবং আই২ইউ২-এর মতো অংশীদারি এবং অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ব্রিটেন, কানাডা ও ইইউ–এর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও আফ্রিকায় বর্ধিত পৌঁছ ভারতীয় ব্যবসাকে অর্থ, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার এনে দিয়েছে।

গর্জনরত বাঘ

অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে ২০২০ সালে অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষা ও বাণিজ্য ঘাটতি রোধ করার জন্য ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ট্রেডিং ব্লক রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ, বা আরসিইপি–তে যোগ না–দেওয়ায় আসিয়ান–এর বিস্তৃত এমএসএমই মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সুযোগ হারিয়েছিল। যাই হোক, সেই অনুভূত ‘‌হারানো সুযোগ’‌–এর ক্ষতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথেষ্ট পদক্ষেপ করা হয়েছে।

জি২০ পরিচালনা করা, যা বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ে গঠিত, একটি অনন্যভাবে কঠিন কাজ। কিন্তু ভারতীয় নেতৃত্বের জন্য নেতৃত্বে থাকার এর চেয়ে প্রকৃষ্ট সময় আর হতে পারে না, কারণ এখনই বিশ্বের তাকে প্রয়োজন বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম সর্বাধিক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসাবে। এটা স্পষ্ট যে ভারত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্লকের নতুন গর্জনরত বাঘ, এবং বিশ্ব যে ভয়ঙ্কর হট্টগোলের মধ্যে পড়েছে তার মধ্যে থেকে একটি নতুন শৃঙ্খলা তৈরি করার জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Nilanjan Ghosh

Nilanjan Ghosh

Dr Nilanjan Ghosh is a Director at the Observer Research Foundation (ORF) in India, where he leads the Centre for New Economic Diplomacy (CNED) and ...

Read More +
Soumya Bhowmick

Soumya Bhowmick

Soumya Bhowmick is an Associate Fellow at the Centre for New Economic Diplomacy at the Observer Research Foundation. His research focuses on sustainable development and ...

Read More +