Author : Sohini Bose

Published on Jun 06, 2023 Updated 0 Hours ago

ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন (আইবিএফপি) দুই দেশের শক্তি সহযোগিতার মুকুটে নতুন পালক

ডিজেল পাইপলাইন: ভারত-বাংলাদেশ শক্তি সংযোগকে সুদৃঢ় করার প্রয়াস

২০২৩ সালের ১৮ মার্চ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ে্র সূচনা হল যখন উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীরা ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন (আইবিএফপি) উদ্বোধনের জন্য একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে মিলিত হলেন। এই সহযোগিতার প্রধান কর্মসূচিই হল ভারতের অসমের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের সহায়তায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহি ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় হাইস্পিড ডিজেল সরবরাহ করা। নুমালিগড় শোধনাগার ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারত থেকে ৬০০০০-৮০০০০ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করে। আইবিএফপি চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর শহর থেকে প্রতি ব্যারেল আমদানি করা ডিজেলের পরিবহণ খরচ ৮ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ৫ মার্কিন ডলার করবে। এটি পরিবহণ সময়ও কয়েক দিন থেকে কমিয়ে আনবে মাত্র এক ঘণ্টায়।

ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মানচিত্র

সূত্র: নরেন্দ্র মোদী, ইউটিউব

আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইনটি এ ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার তেল ডিপো পর্যন্ত যাবে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩২ কিলোমিটার  যার প্রায় ৫ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডে এবং বাকি ১২৭ কিলোমিটার বাংলাদেশে অবস্থিত। পাইপলাইনের বার্ষিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন ডিজেল স্থানান্তর করার ক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিকভাবে তা প্রতি বছর বাংলাদেশকে ২.৫ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহ করবে এবং পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ৪.৫ লক্ষ টনে উন্নীত করা হবে। আইবিএফপি প্রকল্পটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল এবং এটি ভারতীয় অনুদানে প্রায় ৩৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল, যা প্রায় ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। এটি দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার মুকুটে নতুন পালক, বিশেষ করে এটি গত বছর থেকে বাংলাদেশ যে জ্বালানি সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে, তা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।

বাংলাদেশে জ্বালানি সঙ্কট

বাংলাদেশ ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে একটি দেশব্যাপী পাওয়ার গ্রিড ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছিল, যার ফলে সারা দেশে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ বিদ্যুৎবিহীন ছিলেন। ব্যর্থতার সঠিক কারণ অজানা থাকলেও এই ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎহীনতার ঘটনা ছিল দীর্ঘ এবং ঘন ঘন লোডশেডিং এর একটি অন্যতম উদাহরণ, যেখানে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষ প্রায় ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীনতার সম্মুখীন হন। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল ব্যবহার করে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অন্বেষণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ব্যবহার না করা-সহ এই গ্যাস ঘাটতির অনেক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে; দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে এবং প্রায় এককভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল করা; রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি; রুশ অপরিশোধিত তেলের উপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউরোপীয় বাজারে এর উচ্চ চাহিদার কারণে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির দাম বেড়েছে; এবং ওপিইসি+ তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এই কারণগুলির মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি ক্রয়ের জটিলতাও বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। কারণ দেশটি তার মোট তেল এবং পরিশোধিত জ্বালানির প্রায় ৭৭ শতাংশই আমদানি করে।

আরএমজি অর্থনীতিতে নেতিবাচক বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানি হ্রাস, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন সংগ্রাম, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন বাংলাদেশের নাগরিকদেরও অসন্তুষ্ট করেছে, ঢাকার রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ সঙ্কট অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির পতাকাবাহী রেডিমেড গারমেন্ট শিল্প (আরএমজি) প্রায় প্রতিদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এমনকি গড়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ফলে অনেক পোশাক কারখানার উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছে। এর পাশাপাশি অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে নির্মাতারা ডায়িং এবং ওয়াশিং ইউনিটগুলিকে কার্যকর রাখার জন্য ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটরের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, যাতে কাপড় নষ্ট হওয়া রোধ করা যায়। এ ভাবে উৎপাদনের খরচ তো বেড়েইছে, তার পাশাপাশি আবার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এই বিলম্ব প্রভাব ফেলেছে এবং নির্মাতারা সময়ের ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্ট বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই ক্ষেত্রটি ৭.৫ শতাংশ নেতিবাচক বৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে। আরএমজি অর্থনীতিতে নেতিবাচক বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানি হ্রাস, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন সংগ্রাম, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন বাংলাদেশের নাগরিকদেরও অসন্তুষ্ট করেছে, ঢাকার রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে এ বছর নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ায় আওয়ামি লিগ সরকারের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে প্রতিকূলতর।

আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব

আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর জয় সুনিশ্চিত করতে উন্নয়নকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করার উপর অনেকটাই নির্ভর করছেন। পদ্মা বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু নির্মাণ, ভারতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সংযোগ প্রকল্পের কার্যক্রম চালু করা এবং বাংলাদেশের সর্বত্র বিদ্যুদয়নই তাঁর প্রধান সাফল্য। তবে দেশের উন্নয়নকে ব্যাহতকারী ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সঙ্কট বর্তমানে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই অনুসারে আর্থিক দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রচার সমাবেশের কর্মসূচির একটি অংশ হয়ে  উঠেছে। এহেন অবস্থায় ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের উদ্বোধন আওয়ামি লিগের নির্বাচনী প্রচারে নতুন প্রাণশক্তি যোগাতে সাহায্য করবে। কারণ ডিজেল সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর দেশের ব্যাপক নির্ভরতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুতের প্রায় ৬-১০ শতাংশ ডিজেলের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। পাইপলাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যখন অনেক দেশ জ্বালানি সঙ্কটের সম্মুখীন, তখন এই পাইপলাইনটি আমাদের জনগণের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন যে, ‘নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী ডিজেল সরবরাহ কৃষি খাতের জন্য বিশেষ উপকারী হবে। স্থানীয় শিল্পও এর দ্বারা উপকৃত হবে।’

ভারতের জন্য সুবিধা

ভারতের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই এই পাইপলাইনের সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, পাইপলাইনটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আরও সাহায্য করবে, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বের মাধ্যমে, যা এমন একটি এলাকা যে ক্ষেত্রে উভয় সরকারই সহযোগিতা করতে আগ্রহী৷ যেমন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে অসমের জন্য একটি ভাল বাজার তৈরি হয়েছে… অসমের বাসিন্দারা উপকৃত হবেন।’ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আর একটি মেয়াদের জন্য নির্বাচনী জয় উভয় দেশকে সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও অগ্রসর হতে সাহায্য করবে, যা দুই দেশ যৌথভাবে গ্রহণ করেছে।

ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এই আখ্যানে একটি নতুন মাইলফলক, বিশেষ করে যেহেতু এটি একটি স্থিতিশীল, পরিবেশ-বান্ধব এবং হাইস্পিড ডিজেল পরিবহণের জন্য সাশ্রয়ী ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে রামপাল, খুলনা, বাংলাদেশের ১৩২০ (৬৬০×২) মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের যৌথ উন্নয়ন এবং একটি বর্ধিত কয়লা সরবরাহের মতো শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সাল থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ভারত থেকে বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডের মাধ্যমে অসম থেকে ত্রিপুরায় পেট্রোলিয়াম, তেল এবং লুব্রিক্যান্ট পরিবহণের অনুমতি দেয়; বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেডকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি নিবন্ধিত জিটুজি সরবরাহকারী হিসাবে তালিকাভুক্ত করছে এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড লিমিটেডের (এপিজেএল) সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করছে, যার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে ১৪৯৬ মেগাওয়াট নেট ক্ষমতা্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। বর্তমানে ভারত ঝাড়খণ্ডের গোড্ডার এপিজেএল ইউনিট থেকে প্রতিবেশী দেশকে ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এবং দ্বিতীয় ৮০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শীঘ্রই চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করবে। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এই আখ্যানে একটি নতুন মাইলফলক, বিশেষ করে যেহেতু এটি একটি স্থিতিশীল, পরিবেশ-বান্ধব এবং উচ্চ গতির ডিজেল পরিবহণের জন্য সাশ্রয়ী ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। সর্বোপরি, জ্বালানি সংযোগ শক্তিশালী করার মাধ্যমে আইবিএফপি দুই দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি আনতে সাহায্য করবে।


সোহিনী বোস অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের জুনিয়র ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Sohini Bose

Sohini Bose

Sohini Bose is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), Kolkata with the Strategic Studies Programme. Her area of research is India’s eastern maritime ...

Read More +