Author : Sushant Sareen

Published on Feb 11, 2024 Updated 0 Hours ago

পাকিস্তানের এই নির্বাচনে জনগণের শক্তি সব প্রত্যাশা ও ভবিষ্যদ্বাণীকে নস্যাৎ করে দিয়েছে

পাকিস্তান জেনারেল(দের) নির্বাচন: আতঙ্ক, ভয় এবং চিরাচরিত প্রতারণা

ভোটগ্রহণ বন্ধ এবং গণনা শুরু হওয়ার ২৪ ণ্টারও বেশি সময় পরে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন (ইসিপি) ২৬৫টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে মাত্র অর্ধেক আসনে ফলাফল ঘোষণা করেছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রবণতা বেশ বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। এবং তা শুধু পাকিস্তানেই নয়, সারা বিশ্বের পাকিস্তানি দর্শকদের পরও আতঙ্কের প্রভাব ফেলেছে। এ কথা বলা অবমূল্যায়ন করারই সমান হবে যে, এই ফলাফল শুধুমাত্র সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণীকেই (যার অধিকাংশই প্রচলিত প্রজ্ঞা অতীত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে) সম্পূর্ণ রূপে নস্যাৎ করে দেয়নি, বরং পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার পছন্দের রাজনৈতিক অংশীদার, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও প্রতিনিধিদের সতর্কতার সঙ্গে সাজানো রাজনৈতিক পরিকল্পনাকেও বানচাল করে দিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে ক্রমশ ভাঙনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা দেশটির কাছে ২০২৪ সালের নির্বাচন আর কটি এমন সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি করেছে, যা নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের ভবিষ্য নির্ধারণ করবে। পাকিস্তানের জনগণের প্রেরিত বার্তাটিকে যদি সামরিক সংস্থা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা ভুল বোঝেন, ভুল ভাবে তা ব্যবহার করেন এবং যদি নির্লজ্জ ভাবে উপেক্ষা করেন, তা হলে তা দেশটিকে নিয়ন্ত্রণহীন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। কিন্তু ফলাফল মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নিতে গেলেও তা কী ভাবে করা হবে, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট পথনির্দেশিকা নেই৷

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে ক্রমশ ভাঙনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা দেশটির কাছে ২০২৪ সালের নির্বাচন আর কটি এমন সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি করেছে, যা নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের ভবিষ্য নির্ধারণ করবে।

যে নির্বাচনের পাকিস্তানে কিছুটা স্থিতিশীলতা এবং নিশ্চতা এনে দেওয়ার কথা ছিল - যাতে দেশটির অস্তিত্বগত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায় - তা ইতিমধ্যেই কেবল মাত্র একটি অস্থিতিশীল অনিশ্চিত পরিস্থিতিরই দিকে দেশটিকে ঠেলে দিয়েছে। পরবর্তী সরকার কে গঠন করবে তা নিয়েই যে শুধু প্রশ্ন আছে, তা নয়; বরং বর্তমান সরকার দাঁড়ানোর জন্য ন্যূনতম জমিটুকু থাকবে কি না, তা-ই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। পরবর্তী সরকারের কি রাজনৈতিক পুঁজি ও ক্ষমতা আদৌ থাকবে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, যা অপেক্ষারত? ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ-এর (পিটিআই) রাজনৈতিক বিরোধীরা কি সরকারকে আদৌ কাজ করতে দেবে? পাকিস্তান সেনাবাহিনী কি সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনী এবং তাঁরাজনৈতিক আঁতাতকেই সমর্থন করবে? না কি তারা চাইবে যে, এই জেনারেলরা পদত্যাগ করুন এবং একটি নতুন নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেওয়া হবে? দুই পক্ষের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণে সংঘাত প্রকাশ্যে আসার পরে এবং বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব কোনও মতেই রাজনীতির মঞ্চে আর ইমরানকে দেখতে ইচ্ছুক নয়, এ কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার পরেও কি অসীম মুনীর আদৌ ইমরান খানের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারবে? খুব সহজ কথায় বললে, পাকিস্তানের নির্বাচনের ফলাফল এক প্রকার বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাদশা খান

নির্বাচনের ফলাফলে এখনও অবধি যিনি এগিয়ে, তা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, বিজয়ী হতে চলেছেন কারাবন্দি ইমরান খান। তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে সরাসরি নির্বাচিত আসনের তিন অঙ্কের সীমা অতিক্রম করে যেতে পারে্ন। সবচেয়ে বড় পরাজয় হল জেনারেল অসীম মুনিরের, যিনি ইমরান খানকে রাজনৈতিক ভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য সর্বান্তঃকরণে চেষ্টা  করেছিলেন। ইমরান খানকে শেষ করে দেওয়ার জন্য তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা পিটিআই-সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অসাধার জনসমর্থনের মুখে ভেস্তে গিয়েছে। কোনও নির্বাচনী সমীক্ষাতেই কেউ পিটিআই-কে ৪০-৫০-এর বেশি আসন প্রদান করেনি এবং কেউ কেউ তো এই সন্দেহ করেছিলেন যে, পিটিআই আদৌ এই সংখ্যায় পৌঁছতে পারবে কি না। প্রকৃতপক্ষে, পিটিআই-এর জন্য ৪০টি আসন জেতা প্রায় অলৌকিক ঘটনারই নামান্তর ছিল, যেখানে দলের নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল; দলের শীর্ষ নেতারা হয় আত্মগোপনে বা কারাগারে বন্দি ছিলেন; সামরিক বাহিনী প্রায় সব নির্বাচনী প্রার্থীকে দলত্যাগ করানোর কৌশল গ্রহণ করেছিল এবং তাদের ইস্তেকাম-ই-পাকিস্তান পার্টি (আইপিপি) পিটিআই-পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে যুক্ত করেছিল (ইমরানের এই দুই লকেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়); প্রার্থীরা ছিলেন বেশির ভাগই অচেনা অনভিজ্ঞদলটিকে তার নির্বাচনী প্রতীক থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইমরানের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েছিলেন এবং পাকিস্তানের ভোটারদের প্রার্থীদের প্রতীক চিহ্নিত করতে সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনাকে নগণ্য বলে মনে করা হয়েছিলদল সমর্থিত প্রার্থীদের সঙ্গে সমর্থকদের পরিচিত করার প্রচেষ্টা দলের ওয়েবসাইট সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল হ্যাক করে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিলদলীয় কর্মীদের প্রবল মারধর করে প্রায়ই জেলে পাঠানো হত। প্রার্থীদের বাড়ি ও অফিসে অভিযান চালানো হত। প্রার্থীদের বেশির ভাগকেই ভোটের জন্য প্রচার করার কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নিপ্রশাসন এ ক্ষেত্রে ভীষণ বৈরিতা প্রদর্শন করেছে। নির্বাচকদের কাছে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে, পিটিআই প্রার্থীদের দেওয়া ভোট যেন নষ্ট করে দেওয়া হয়। এবং এ সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অজুহাত দর্শিয়ে নির্বাচনের দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনটা আসলে করা হয়েছিল পিটিআই ভোটারদের কোনও প্রকার সঙ্ঘবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য সংগঠনকে বাধা দেওয়ার জন্য। এত সব কিছুর পরও পিটিআই যদি একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়, তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, ঠিক মতো লড়ার সুযোগ পেলে ইমরান খান-এর পিটিআই কমপক্ষে তিন চতুর্থাংশ সনে জয়লাভ করত।

দলীয় কর্মীদের প্রবল মারধর করে প্রায়ই জেলে পাঠানো হত। প্রার্থীদের বাড়ি ও অফিসে অভিযান চালানো হত। প্রার্থীদের বেশির ভাগকেই ভোটের জন্য প্রচার করার কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি

পিটিআই জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদ দুই জায়গাতেই খাইবার পাখতুনখোয়াকে (কে-পি) নস্যাৎ করে দিয়েছে। পঞ্জাবে পিটিআই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ফলাফল করেছে। প্রকৃতপক্ষে, নির্বাচনের পর সেনাবাহিনীর নির্দেশে রিটার্নিং অফিসারদের দ্বারা ফলাফল বদলে দিয়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ যদি না উঠত, তা হলে পঞ্জাবেও পিটিআই জয়ী হত। এই অভিযোগ যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য যে, ইসিপি এক সময়ে ফলাফল ঘোষণা করা বন্ধ করে দিয়েছিল। কোনও নির্বাচনকে স্রেফ বদলে দেওয়ার জন্য এটি আসলে ‘প্রতিষ্ঠান’-এর এক পুরনো কৌশল কারণ প্রাথমিক ফলাফল দর্শিয়েছে যে ইমরান নিরঙ্কুশ ভাবেই এগিয়ে রয়েছেন এবং যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, তাতে সম্ভবত সেনাবাহিনী বা তার অনুসারীদের জন্য একটা আসনও অবশিষ্ট থাকবে না। কিন্তু মনে করা হচ্ছে যে, ফলাফলগুলিকে ন্যায্যতা দিতে এবং পাওয়ার হাউস বা ক্ষমতাধর প্রদেশ অর্থাৎ পঞ্জাবে পিটিআইকে অপ্রতিরোধ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা থেকে রোধ করার জন্য ভোটের ফলাফল অনেক রকম ভাবেই বদলে দেওয়া হয়েছে।

পুরোপুরি ফিরে আসা নয়

রাজনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে, সবচেয়ে বড় পরাজয় অবশ্যই নওয়াজ শরিফ এবং তাঁর পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন), যারা প্রায় ৮০টি আসনে জয়ী হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। নির্বাচনের প্রাক্কালে পিএমএল-এন নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করে সমস্ত প্রধান দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একটা গোটা পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাঁকে পাকিস্তানের কামব্যাক কিড হিসেবে তুলে ধরছিল। দলটি পঞ্জাবের ১৪১টি আসনের মধ্যে ১০০টিরও বেশি আসনে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল। প্রকৃত পক্ষে, কিছু দলীয় অনুগতরা এমনকি ১১৫-১২০টি সনে পিএমএল-এন জয় লাভ করবে, এমনটাও অনুমান করেছিলেন। পিএমএল-এন অন্য তিনটি প্রদেশ থেকে আরও ১০-১৫টি আসনে জয়ী হবে বলে আশা করেছিল এবং সংরক্ষিত আসনগুলি দিয়ে পরবর্তী সরকার গঠন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল। ‘জঙ্গ’ পত্রিকার  একজন সংবাদবিভাগীয় লেখক এমনকি এ-ও দাবি করেন যে, পরবর্তী সরকার (পিএমএল-এন) অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং তথাকথিত বাংলাদেশ মডেল অনুকরণ করতে কমপক্ষে ১০ বছর ক্ষমতায় থাকবে।

পিএমএল-এন সরকার গঠনের প্রচেষ্টা এখনও কার্যকর হতে পারলেও তা রাজনৈতিক ভাবে স্থিতিশীল হবে না বা স্থিতিশীল ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে না।

কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীকে (বেশির ভাগই অর্থাৎ ৯০ শতাংশের বেশি পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থী) অনুগত বানিয়ে (প্রলুব্ধ করে) এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে একত্র করে পরবর্তী সরকারে নেতৃত্ব দেওয়ার আশা অবশ্য পিএমএল-এন এখনও ছেড়ে দেয়নি। এই প্রলুব্ধ করার কাজটি সহজ হবে না কারণ হেরে যাওয়া দলের বিজয়ী প্রার্থীদের প্রলোভন দেখানো এক জিনিস এবং বিজয়ী দল থেকে এমনটা করা আবার সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। আরও খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, পিটিআই-এর বিজয়ী প্রার্থীরা ইমরান খানকে প্রতারণা করলে ইমরানকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের হাতে গণপিটুনি খেতে পারেন। পিএমএল-এন সরকার গঠনের প্রচেষ্টা এখনও কার্যকর হতে পারলেও  তা রাজনৈতিক ভাবে স্থিতিশীল হবে না বা স্থিতিশীল ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে না। এ কথাও পরিষ্কার নয় যে, নওয়াজ শরি আদৌ এমন কোনও জোটের নেতৃত্ব দিতে রাজি হবেন কি না, যা রাজনৈতিক আত্মহত্যার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। অন্য দিকে, পিএমএল-এন সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা একটি দল। এদের নতুন কোন ধারণা নেই, নতুন প্রজন্ম বা নতুন বার্তা নেই। এমনকি নতুন পরিকল্পনা বা আখ্যান নেই। আবার নতুন ভোটারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কোন ক্ষমতা নেই। এটি একগুচ্ছ বিহ্বল ‘বর্ষীয়ান’দের (পড়ুন কাকা-জ্যাঠাদের) দল, যাঁরা গত শতাব্দীতে বসবাস করছেন। যেমন সরকারে থাকার ব্যাপারে এটি তাঁদের আক্ষরিক অর্থেই শেষ সুযোগ ও সময় হতে পারেতাই দলের সদস্যরা সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

ন্যান্য শক্তি

পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভাল ফল করেছে, বিশেষ করে সিন্ধ অঞ্চলে, যেটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এবং প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে জয়লাভ করেছে। টানা চতুর্থ বারের মতো দলটি সিন্ধ অঞ্চলে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তবে এটি ইসলামাবাদ লাহোরের জন্য এমন একটি শক্তি হয়ে উঠবে, যেখানে এই দলের সমর্থন ছাড়া কোন সরকার গঠন করা যাবে না। বেলুচিস্তানেও পিপিপি সম্ভবত জোটের অংশ হয়ে উঠবে, যা সরকার গঠন করবে এবং এমনকি নেতৃত্বও দিতে পারে।

তবে ইসলামাবাদে সরকার গঠনের জন্য পিপিপি পিটিআই-এর সমর্থন পায় কি না, তা দেখার বিষয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে, পিপিপি বরং নওয়াজ শরিফের সঙ্গ নেবে। কারণ ইমরান খানের সঙ্গ দিলে তা সেনাবাহিনীর চক্ষুশূল হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আসিফ জারদারি মোটেও চান না। দলের উত্তরাধিকারী বিলাওয়াল ভুট্টো বিরোধী দলে ক্ষমতায় আসায় জন্য ঝুঁকতে পারেন, কিন্তু তাঁর বাবা জারদারি এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি ক্ষমতার রাজনীতি বেশি পছন্দ করেন এবং এ হেন পরিস্থিতিতে যা কিছু মুনাফা কুড়িয়ে নেওয়া সম্ভব, তা মোটেও হাতছাড়া করতে চান না। এমন গুঞ্জনও উঠেছে যে, জারদারি রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য একটি জমি তৈরি করতে পারেন (যা তাঁকে পুরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেবে) এবং পিএমএল-এনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ নেওয়ার জায়গা দিতে পারে, যার মেয়াদ এক বা দুবছরের বেশি স্থায়ী হবে বলে আশা করা যায় না। সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে আবার এমন কিছু গুঞ্জনও শোনা গিয়েছে যে, পিপিপি পিএমএল-এন বা পিটিআই-এর সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য একটি শক্ত জমি তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে, পিপিপি বরং  নওয়াজ শরিফের সঙ্গ নেবে। কারণ ইমরান খানের সঙ্গ দিলে তা সেনাবাহিনীর চক্ষুশূল হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আসিফ জারদারি মোটেও চান না।

মূলত পিটিআই-কে হারানোই উদ্দেশ্য স্থির করার দরুন এবং নিজের দলের উন্নতি সাধনকে লক্ষ্য না করায় মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) করাচিতে মাত্র কয়েকটি আসন পেতে সমর্থ হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে এগোনোর লক্ষ্যে নিজের সামনে যা সুযোগ আসবে, সেটুকু মাত্র অর্জন করলে এবং সম্ভবত সিন্ধ অঞ্চলে কয়েকটি আসন পেলেও এমকিউএম-এর ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল নয়। অন্য যে শক্তি বেশ বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন, তিনি হলেন মওলানা ফজলুর রহমান এবং তাঁর জমিয়ত উলেমা ইসলাম (জেইউআই-এফ)মওলানার যথেষ্ট পরিমাণ আসন জয়ের বৈধ প্রত্যাশা ছিল কারণ পিটিআই কে-পি এবং বেলুচিস্তানে বেশ খানিকটা পিছিয়েও ছিল। তবে জেইউআই-এফ বেলুচিস্তান বিধানসভায় কয়েকটি আসন দখল করতে পারলেও এবং প্রাদেশিক সরকারের অংশ হয়ে উঠলেও দেওবন্দি মোল্লাদের জন্য এ নির্বাচন বেশ হতাশাজনক পাকিস্তানের রাজনীতিতে জামাত ইসলামি এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নয়। প্রতিষ্ঠাপন্থী বেলুচিস্তান আওয়ামি পার্টি (বিএপি) মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কট্টরপন্থী সুন্নি বরেলভি দল টিএলপি খুব বেশি আসন জিতেছে বলে মনে হ না তবে ২০১৮ সালের তুলনায় এই দলের ভোটসংখ্যা বেড়েছে কি না, তা দেখার। কারণ এটি পাকিস্তানের বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দল এবং দেশটিতে পঞ্চম বৃহত্তম দল হিসেবে এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিল

পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন যুগ?

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রচুর মরীচিকাময় প্রত্যূষের সাক্ষী থেকেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন - যেটিতে জনগণের শক্তি রাজনীতিবিদ সামরিক শক্তিদের সতর্কতার সঙ্গে সাজানো পরিকল্পনাকে বানচাল করে দিয়েছে - সেটিও এমন মরীচিকাময়ই প্রত্যূষ? না কি তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই এক দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনের সূচনা এবং এর ফলে প্রায় বোঝা হয়ে দাঁড়ানো ও দেশের রাজনৈতিক উন্নয়নকে স্তিমিত করে দেওয়া বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ককে ফের দিশা দেখাবে? একটি অনিবার্য পর্যবেক্ষণ হল এই, যে দলগুলি সামরিক বাহিনী সঙ্গে স্বচ্ছন্দ ছিল বা যে দলগুলিকে সেনাবাহিনীর সহযোগী বলে মনে করা হত (আইপিপি, পিটিআই-পি, বিএপি ইত্যাদি), সেই দলগুলিকে নির্বাচকরা স্রেফ অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর কটি বিষয় হল এই যে, সামরিক স্থাপনা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে সমর্থনকারী দুই প্রদেশ অর্থাৎ পঞ্জাব এবং কে- পি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছে এবং সেনাবাহিনীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সেনাবাহিনী যে এখন গুরুতর ধাক্কা খেয়েছে, তা যে কেউ বুঝতে পারবে। এই সেনাবাহিনী সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, এ এমন বাহিনী যারা কখনও কোনও যুদ্ধে জেতেনি এবং কখনও কোনও নির্বাচনে পরাজিত হয়নি। কিন্তু এ বার তারাই নির্বাচনেও পরাজিত হয়েছে।

একটি অনিবার্য পর্যবেক্ষণ হল এই, যে দলগুলি সামরিক বাহিনী সঙ্গে স্বচ্ছন্দ ছিল বা যে দলগুলিকে সেনাবাহিনীর সহযোগী বলে মনে করা হত (আইপিপি, পিটিআই-পি, বিএপি ইত্যাদি), সেই দলগুলিকে নির্বাচকরা স্রেফ অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

পাকিস্তানে রায়ের একটি তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যে, সময় বদলে গিয়েছে এবং অতীতের ছকবাঁধা হিসেব ও অঙ্ক আর কাজ করে না বা মানুষের স্বর  বদলে দিতে পারবে না। বিশ্বের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এ বার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকেও বুঝতে হবে যে, অতীতের মতো তথ্যকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলি এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না এবং পুরনো অঙ্ক মেনেই এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে, তাদের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। একই ভাবে, প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের নতুন ভাবে উদ্ভাবন করতে হবে। অতীতের নজির এবং অনুশীলনের উপর কাজ করা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অপ্রাসঙ্গিকতাকে ত্বরান্বিত করবে।

মোদ্দা কথা হল, জনগণের রায়ের মাত্রা ও তাৎপর্যকে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং অতীতে যা ঘটেছে তার ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা আসলে পাহাড়প্রমাণ বোকামিরই নামান্তর। পাকিস্তান এই মুহূর্তে এক ধারালো তরবারির কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছে এবং বিপজ্জনক রকমের বোকা’ - জেনারেলদের এই বলেই অভিহিত করেছিলেন প্রয়াত আসমা জাহাঙ্গীর – ঠিক কেমন সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে এই মুহূর্তে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তান, সেখান থেকে নেমে একটা শক্ত মাটি খুঁজে পাবে না কি তরবারির মুখে পড়ে একেবারে রক্তাক্তই হতে থাকবে?

 


সুশান্ত সারিন অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.