Published on Mar 17, 2024 Updated 1 Days ago

নির্ভরশীল হিসাবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ করে নিম্ন আয়ক্ষম পরিবারের বয়স্ক মহিলারা কোন স্বীকৃতি ছাড়াই অবৈতনিক বেতনভুক্ত কাজের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ভাবে অবদান রেখে চলেছেন।

বয়স্ক মহিলাগণ: ‘নেপথ্যে থাকা কর্মশক্তি’ এবং আদপেই নির্ভরশীল নন

এই নিবন্ধটি ইন্টারন্যাশনাল উইমেন’স ডে সিরিজের অংশ।


এটি বছরের ঠিক সেই সময় যখন নানা ধরনের প্রসাধনী সংস্থা মহিলা শ্রমিকদের বছরভর শোষণ করার পর বার্ষিক শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। অসংখ্য প্রসাধনী সংস্থার নেতৃত্বের পদে আসীন নারীর সংখ্যা নগণ্য। অথচ মহিলা ও ছোট শিশুরা অনিশ্চিত শর্তে, নিতান্তই সামান্য মজুরির বিনিময়ে ঝাড়খণ্ডের অবৈধ খনি থেকে অভ্র (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের একটি অপরিহার্য উপাদান) খননের কাজ করে থাকে। যে সমস্ত নারী ব্যয়বহুল সৌন্দর্য পণ্য ক্রয় করার ক্ষমতা রাখেন, তাঁদের তরফে খনির মহিলা শ্রমিকদের প্রতি দর্শানো উদ্বেগ নিতান্তই তুচ্ছ। এ কথা বলা বাহুল্য যে, ভুয়ো নারীবাদের এই সংস্করণটি ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে সেই সব দরিদ্র বয়স্ক মহিলার কাঠামোগত নিপীড়নের বিষয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নয়, যাঁরা ব্যয়বহুল সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যগুলি কেনার ক্ষমতা রাখেন না। দুঃখের বিষয়, লিঙ্গ সমতার আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও বয়স্ক মহিলাদের উদ্বেগ উপেক্ষিতই থেকেছে। বেশির ভাগ মনোযোগ কমবয়সি মেয়েদের শিক্ষিত করার দিকে এবং বয়ঃসন্ধি কালের গর্ভবতী মহিলাদের জন্য পুষ্টি স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দিকে পরিচালিত হয়। আর বৃদ্ধ মহিলাদের উদ্বেগগুলি নীতি বিতর্কে খুব কমই উঠে আসে। লিঙ্গ সমতা তখনই বাস্তব হবে, যখন সব বয়সের নারীদের ক্ষমতায়ন ঘটবে এবং সকলেই মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবেন।

 

বিশ্ব জুড়ে বয়স্ক মহিলারা নিজেদের পরিবার, সম্প্রদায় অর্থনীতিতে নিজেদের বৈতনিক অবৈতনিক কাজের মাধ্যমে কোনও স্বীকৃতি বা সমর্থন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে

 

এই নিবন্ধটি সেই সব বয়স্ক নারীর উপর আলোকপাত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে পুনরুদ্ধার করার একটি ছোট প্রয়াস, যাঁরা ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান এলসনের কথা অনুযায়ী বয়স এবং লিঙ্গ উভয়ের কারণেই সুবিধাবঞ্চিত রয়ে যান। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের বয়স্ক মহিলারা প্রায়শই পরিবার রাষ্ট্রের জন্য একটি সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হন। কারণ মনে করা হয়, তাঁরা অনেকখানি যত্নের প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীলযাই হোক, বিশ্ব জুড়ে বয়স্ক মহিলারা নিজেদের পরিবার, সম্প্রদায় অর্থনীতিতে নিজেদের বৈতনিক অবৈতনিক কাজের মাধ্যমে কোনও স্বীকৃতি বা সমর্থন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে বয়স্ক মহিলারা নিজেদের নাতি-নাতনিদের যত্ন নেওয়া, রান্না করা, বাসন মাজা, জামাকাপড় কাচা, বাড়ি পরিষ্কার করা, জল আনা ইত্যাদির মতো ঘরোয়া কাজ এবং এমনকি অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে চাকরি স্বল্প উৎপাদন থেকে অর্থ উপার্জন করে প্রায়ই গুরুতর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করার সময় নিজেদের পরিবারের সকলের ভরণপোষণ করে থাকেন

এজ ইন্টারন্যাশনালের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বয়স্ক মহিলাদের ‘হিডেন ওয়ার্কফোর্স’ বা ‘নেপথ্যে থাকা কর্মশক্তি বলে অভিহিত করা হয়েছেবয়স্ক মহিলারা গড়ে ৪.৩ ণ্টা প্রয়োজনীয় ঘরোয়া কাজ অবৈতনিক যত্নের কাজে ব্যয় করেন। যেহেতু আরও অল্পবয়সি নারীরা শ্রমশক্তিতে প্রবেশ করছেন, তাই দিদা-ঠাকুমারা বৃহত্তর ক্ষেত্রে শিশু দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করছে। অনেক দরিদ্র পরিবারে বয়স্ক মহিলারা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজের মাধ্যমে যে সামান্য অর্থ উপার্জন করে থাকেন, তা পরিবারের জন্য খাদ্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স্ক মহিলারা কৃষির মতো অধিকাংশ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুবক-যুবতীরা গ্রাম থেকে বড় শহরে পাড়ি জমাতে শুরু করলে বয়স্ক নারীরা কৃষিকাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য হন। এজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ অতিমারির আগে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি প্রতি ৭ জন নারীর মধ্যে ১ জন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বেতনভুক্ত কাজে নিযুক্ত ছিলেন, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ১ জন বেতনভুক্ত কাজে নিযুক্ত ছিলেন। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেশি সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি জনের মধ্যে জন মহিলা বেতনভুক্ত কাজে নিযুক্ত ছিলেন।

 

যুবক-যুবতীরা গ্রাম থেকে বড় শহরে পাড়ি জমাতে শুরু করলে বয়স্ক নারীরা কৃষিকাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য হন।

 

বয়স্ক মহিলারা নিজেদের অবৈতনিক যত্নের কাজ এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বেতনভুক্ত কাজের মাধ্যমে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, তা নীতিনির্ধারকরা সম্পূর্ণ রূপে উপেক্ষা করেছেন কারণ সরকারি পরিসংখ্যানগুলি এই সকল বয়স্ক নারীর অর্থনৈতিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতই হয়নি। সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই নারীদের দ্বারা সম্পাদিত অবৈতনিক পরিচর্যামূলক কাজের গুরুত্ব স্বীকার করে থাকেসর্বোপরি, কর্মজীবী জনসাধারণকে সাধারণত ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর ফল স্বরূপ, বেশির ভাগ সরকারি প্রতিবেদন সমীক্ষাগুলিতে অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রকে অবমূল্যায়ন করা হয় এবং সেই সব ক্ষেত্রেই বেশির ভাগ বয়স্ক মহিলারা কাজ করে থাকেন

ভারতে জনসাধারণ সংক্রান্ত আলোচনা জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের উপর মনোযোগ প্রদান করে কারণ দেশটিতে এই মুহূর্তে যুব জনসংখ্যার পরিমাণ সুবিশাল। যাই হোক, এর পাশাপাশি দেশে বয়স্ক ব্যক্তিদের একটি বড় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা রয়েছেতবে বয়স্করা অনেক কম নীতি সামাজিক মনোযোগ পেয়ে থাকেন। বয়স্ক মহিলারা নিজের পরিবার সম্প্রদায়ের সদস্যদের দ্বারা যত্ন পাবেন… এই ধারণাটি আর সঠিক না-ও হতে পারে কারণ আধুনিক বিশ্বের জটিলতার কারণে চিরাচরিত পারিবারিক সম্প্রদায়ের বন্ধন পরিবর্তিত হচ্ছে। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে নারীদের জন্য মর্যাদা ও সুস্থতাকে সুনিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ হল মানসিকতার পরিবর্তন। প্রথমত, বয়স্ক নারীদের নির্ভরশীল না ভেবে তাঁদের সমাজের অবদানকারী সদস্য হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, যখন অবৈতনিক যত্নের কাজ, বিশেষ করে নাতি-নাতনিদের যত্ন নেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে, বেশির ভাগ বয়স্ক মহিলার অবদানের কথা মাথায় রেখে তাঁদের অর্থনৈতিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। তৃতীয়ত, এ বার বয়স্ক মহিলাদের বেতনভুক্ত কাজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করার সময়ও এসেছে।

 

বয়স্ক মহিলারা নিজের পরিবার সম্প্রদায়ের সদস্যদের দ্বারা যত্ন পাবেন… এই ধারণাটি আর সঠিক না-ও হতে পারে কারণ আধুনিক বিশ্বের জটিলতার কারণে চিরাচরিত পারিবারিক সম্প্রদায়ের বন্ধন পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

বয়স্ক মহিলারা যে বেতনভুক্ত কাজ করেন, তার মূল্য কতখানি, সে বিষয়ে একটি যথার্থ অনুমানে পৌঁছনোর জন্য কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় সংজ্ঞাগত পরিবর্তন করতে হবে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রায়শই বয়স্ক মহিলাদের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হলেও এ কথাও অস্বীকার করা যায় না, বয়স্ক মহিলারা যে কাজগুলি করে থাকেন, তার বেশির ভাগ কাজই শালীন নয় এবং প্রায়শই তা নিছক বাধ্যবাধ্যকতার দরুন হয়ে থাকে। তাই কর্মক্ষেত্রে বয়স্ক নারীদের শোষণ থেকে রক্ষা করাও জরুরি। পরিশেষে, সরকারকে বয়স্কদের সেবা প্রদানের গুণমান উন্নত করতে হবে এবং বয়স্ক মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের জন্য আরও সুব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে।

 


মালঞ্চ চক্রবর্তী অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর (রিসার্চ) এবং সিনিয়র ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.