Published on May 01, 2023 Updated 0 Hours ago

মায়ানমারে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও মায়ানমার ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিকাশ অব্যাহত রয়েছে।

চিনের সঙ্গে মায়ানমারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে মায়ানমার-চিন সম্পর্ককে প্রায়শই ‘পাউক ফাউ’ – একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক – হিসাবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। দুই দেশের মধ্যে ২১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বর্তমান এবং গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। অভ্যুত্থানের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য পশ্চিমী দেশগুলি নেপিদউয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ১৯৮৮ সালের পর দুই দেশের সম্পর্কে রূপান্তর ঘটেছিল। এই সময়েই বেজিং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশীর বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার হয়ে ওঠে এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে।

চিনের অভিপ্রায়ের প্রতি মায়ানমার কর্তৃপক্ষের সতর্কতার কারণে উভয় দেশের মধ্যে গতিশীল সম্পর্ক অতীতে বেশ কিছু উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে, তা সে জাতিগত গোষ্ঠীকে অস্ত্র প্রদান, ঋণের ভীতি বা অস্থিতিশীল প্রকল্প… যা-ই হোক না কেন। সকল বাধা সত্ত্বেও সম্পর্কটি সর্বদা তার দৃঢ় গতিপথ বজায় রেখেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল দুই দেশের মধ্যকার স্থির অর্থনৈতিক সম্পর্ক, যা গত দুই দশক যাবৎ গুরুত্ব পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মায়ানমারের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছে চিন। মায়ানমারের বাণিজ্য মন্ত্রকের মতে, ২০২২-২০২৩ অর্থবর্ষে ২০২২ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের অর্ধেকের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২১৫৯.৪১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

সূত্র: বাণিজ্য মন্ত্রক, এসএসি

মিউজ, লুয়েজ, চিনশেহ, কাম্পাইতি এবং অন্যান্য সীমান্ত পয়েন্ট যেমন লুয়েজ সীমান্তে অবস্থিত সীমান্ত পোস্টের মাধ্যমে মায়ানমার চিনের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য পরিচালনা করে, অপর দু’টি সীমান্ত পয়েন্ট কাম্পাইতি সীমান্তের মাধ্যমে বাণিজ্য চালায়।

উল্লেখযোগ্য অংশীদার

…উপরন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারেরা মায়ানমারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রসারে সাহায্য করেছে। চিন, লাও পিডিআর, কম্বোডিয়া, তাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং মায়ানমারকে নিয়ে গঠিত গ্রেটার মেকং সাব-রিজিয়ন ইকনমিক কোঅপারেশন একে অপরের শক্তির ভাণ্ডার এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য একটি মঞ্চ প্রদান করেছে।

মায়ানমার ১৯৮৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সে দেশে অনুমোদিত চিনা বিনিয়োগের পরিমাণ মোট এফডিআইয়ের ২৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। চিন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে চিন-মায়ানমার ইকনমিক করিডরের (সিএমইসি) মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ভৌত পরিকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। সিএমইসি-র অধীনে বেশ কয়েকটি প্রকল্প, যেমন মি লিং গিয়াং এলএনজি টার্মিনাল, কিয়াউকফিউ এসইজেড, গভীর সমুদ্র বন্দর, মিউজ-মান্দালয় রেললাইনকে সহজতর করে তোলার জন্য মান্দালয়-মিউজ রোডের সংস্কার দেশের মধ্যে চিনা অর্থনৈতিক স্বার্থের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।

চিন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে চিন-মায়ানমার ইকনমিক করিডরের (সিএমইসি) মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ভৌত পরিকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে।

মায়ানমার সাধারণত চিনে চাল, মটরশুঁটি এবং তিলের মতো কৃষিজাত পণ্য রফতানি করে থাকে। ২০১৯ সালে চিনে মায়ানমারের কৃষি রফতানি মোট রফতানির ৮৩ শতাংশ ছিল। এ ছাড়াও মায়ানমার চিনে জেড এবং তামার মতো বেশ কিছু খনিজ রফতানি করছে। এর উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে মায়ানমারে চিন থেকে প্রাথমিকভাবে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স এবং টেক্সটাইলের মতো উৎপাদিত সামগ্রী আমদানি করা হয়।

মায়ানমার ও চিনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সম্পর্ক বিভিন্ন কারণ দ্বারা চালিত হয়েছে। প্রথমত, অর্থনীতি বাড়ার দরুন মায়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি চিনের চাহিদা বেড়েছে। মায়ানমার তেল, গ্যাস, কাঠ এবং খনিজ পদার্থের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং চিন এই খাতে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছে। ২০২১ সালে মায়ানমার থেকে ১২.৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মুক্তো, মূল্যবান পাথর, ধাতু এবং মুদ্রা চিনে রফতানি করা হয়েছিল।

সূত্র: দি ইরাওয়াদি

দ্বিতীয়ত, চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চিন-মায়ানমার ইকনমিক করিডর-সহ (সিএমইসি) বিআরআই-এর অধীনে বেশ কয়েকটি পরিকাঠামো প্রকল্পের মায়ানমার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিএমইসি-র মধ্যে রয়েছে কিয়াউকফিউ-এ গভীর সমুদ্র বন্দর, একটি শিল্প পার্ক, চিনের কুনমিং এবং মায়ানমারের মান্দালয়ের মধ্যে একটি উচ্চ-গতির রেল সংযোগ। এই প্রকল্পগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুনরায় চালু করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

সংযোগ পথ ছাড়াও চিনা সংস্থাগুলি বর্তমানে একাধিক রিসোর্স শেয়ারিং লিঙ্কের বাস্তবায়ন করছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র-সহ বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে কিয়াউকফিউ স্পেশ্যাল ইকনমিক জোনে (সেজ) ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ১৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়।

প্রতিবন্ধকতা

তবে মায়ানমার ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও বিদ্যমান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলির অন্যতম হল বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার সমস্যা। কয়েক বছর ধরে চিনের সঙ্গে মায়ানমারের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি চলছে। ২০২২-২০২৩-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই বাণিজ্য-ভারসাম্যহীনতা মায়ানমারের জন্য উদ্বেগজনক ছিল। কারণ এটি দেশটিকে তার আমদানির জন্য চিনের উপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে এবং দেশটিকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

আর একটি প্রতিবন্ধকতা হল, মায়ানমারের কর্মীরা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার ধারণা এই যে, চিনা সংস্থাগুলি স্থানীয় মানুষকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা প্রদান না করে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করছে, যা জনগণের বিরোধিতার কারণে ২০১১ সালে স্থগিত করা হয়েছিল।

উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ঋণের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি জীবিকা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এবং পরিবেশগত গুণমান মেনে চলার ক্ষেত্রে খারাপ পরিসংখ্যানের জন্য চিন সমালোচিত হয়েছে।

ঋণ ভীতির দিকটি আর একটি উপাদান যা অর্থনীতিবিদদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। অন্যান্য দেশে পরিলক্ষিত হওয়া চিনের উন্নয়ন মডেল প্রায়শই রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যার জন্য ওয়ারেন্টি হিসেবে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ঋণের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি জীবিকা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এবং পরিবেশগত গুণমান মেনে চলার ক্ষেত্রে খারাপ পরিসংখ্যানের জন্য চিন সমালোচিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষক বারংবার দাবি করেছেন যে, অন্য দেশগুলিতে প্রদেয় চিনা ঋণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘গোপন’। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) বা বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতো উল্লেখযোগ্য সংস্থাগুলি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কারণ দেশের সামরিক প্রশাসন এবং এ ভাবে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরে গোপন করে রাখার জন্য চিনা জনগণ ক্ষুব্ধ। এটি চিনা নেতৃত্বাধীন ব্যবসার উপর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের দিকেই পরিচালিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরা যায় ২০২১-২০২২ সালের মধ্যে চিনা সংস্থাগুলির উপর ভাঙচুরের কথা।

এ কথা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, মায়ানমার চিনের আগ্রাসন সম্পর্কে অজ্ঞাত নয় এবং এই অঞ্চলের মধ্যে চিনা গতিবিধির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার পূর্ববর্তী অবস্থান যেমন মিতসোন বাঁধের মতো প্রকল্পের বিরুদ্ধে রায় দান করা, যথাযথ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালানোর মতো সতর্কতা অবলম্বন করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিয়াউকফিউ প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে এবং প্রকল্পটিতে মায়ানমারের অংশ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি জাপান এবং ভারতের মতো অঞ্চলস্থিত অন্যান্য দেশের সঙ্গেও অংশীদারিত্ব করেছে।

যাই হোক বর্তমান অভ্যুত্থান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত জনগণ এবং স্বদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। মায়ানমারের বর্তমান সরকারকে তার ভারসাম্যমূলক কাজ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। কারণ এটি অন্য অংশীদারদের সঙ্গে ব্যবসার সুযোগ করে দেবে এবং দেশটিকে কঠোর আবহাওয়ার মাঝে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Sreeparna Banerjee

Sreeparna Banerjee

Sreeparna Banerjee is a Junior Fellow at the Observer Research Foundation Kolkata with the Strategic Studies Programme.

Read More +