Author : Harsh V. Pant

Published on Oct 10, 2023 Updated 0 Hours ago
ইজরায়েল-গাজা যুদ্ধ – একটি বড় ধাক্কা এবং কয়েকটি শিক্ষা

বিশ্ব যখন যথেষ্ট অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তখন ইজরায়েল এবং প্যালেস্তাইনের মধ্যে নতুন সংঘাত সেই অস্থিতিশীলতায় আরও একটি ভয়ঙ্কর মাত্রা যোগ করেছে। এবং এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের মানদণ্ডেও এই পরিস্থিতি খুব একটা সাধারণ ব্যাপার নয়। এটিকে ইজরায়েলের ৯/১১ মুহূর্ত হিসাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এটি এমন একটি মুহূর্ত যা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করবে যে, কী ভাবে ইজরায়েল আগামী দিনে তার নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করে এবং কী ভাবে বিভিন্ন আঞ্চলিক অংশীদাররা নিজেদের কৌশলগুলির পুনর্নির্মাণ করে। গোয়েন্দা সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে এটি এমন একটি দেশের জন্য ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছে, যে দেশটি এত দিন পর্যন্ত শক্তিশালী নিরাপত্তা পরিসর বজায় রাখার গর্ব করত। কিন্তু এর ঊর্ধ্বে উঠেও এই মুহূর্তটি তাঁদের ভিতও নাড়িয়ে দিয়েছে, যাঁরা বিশ্বাস করতেন, তাঁরা এমন এক নিরাপত্তা বলয় নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যেটি প্রতিপক্ষের তরফে লঙ্ঘন করা অসম্ভব না হলেও দুরূহ তো বটেই।

গোয়েন্দা সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে এটি এমন একটি দেশের জন্য ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছে, যে দেশটি এত দিন পর্যন্ত শক্তিশালী নিরাপত্তা পরিসর বজায় রাখার গর্ব করত।

তাই যখন ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে আকস্মিক আক্রমণের ৫০ বছর পরে ব্যারেজ অব রকেটস বা গুচ্ছাকারে বারংবার রকেট ছোড়ার মাধ্যমে আর একটি আক্রমণ চালানো হয় এবং তার সাহায্যে প্যালেস্তাইনের যোদ্ধারা সমুদ্রপথ, স্থলপথ এবং আকাশপথে দক্ষিণ ইজরায়েলে প্রবেশ করে, তখন অশান্ত প্রতিবেশে মানিয়ে চলতে শেখা সেখানকার জনসাধারণের বিশ্বাসের ভিত সমূলে নড়ে গিয়েছে। এ হেন আক্রমণের মাত্রা ও ব্যাপকতা অপ্রত্যাশিত ছিল এবং ইজরায়েলি মানসিকতার উপর এর প্রভাব ছিল অভূতপূর্ব। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন যে, দেশটি একটি ‘দীর্ঘ এবং কঠিন যুদ্ধে’র মধ্যে প্রবেশ করছে এবং দেশটির উপর ‘হামাসের তরফে এ হেন হত্যাকারী আক্রমণ এক প্রকার যুদ্ধ পরিস্থিতি চাপিয়ে দিয়েছে।’

আক্রমণের সূচনা গাজা থেকেই হয়েছিল, যেটি ২০০৫ সালে ইজরায়েলি অধিকার প্রত্যাহারের পর থেকে হামাসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। হামাস যোদ্ধারা ইজরায়েলের সীমান্ত ঘাঁটি ও সামরিক ঘাঁটিগুলিতে অনুপ্রবেশ করে, নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করার মাধ্যমে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর ধ্বংসলীলা বিশ্বব্যাপী প্রকাশ্যে আনার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সন্ত্রাসবাদীরা সামরিক যান আটক করে এবং মানুষজনকে অপহরণ করে ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তার ২৪ ঘণ্টারও পরে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধে রত থেকেছে… এখনও হামাসের কাছ থেকে ইজরায়েলি অঞ্চল এবং সম্প্রদায়গুলিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’ এক দিকে যখন ইজরায়েলে ৩০০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক ডজনের বেশি ইজরায়েলিকে অপহরণ করা হয়েছে, তখন পালটা ইজরায়েলি বিমান হামলার ফলে গাজা উপত্যকায় কমপক্ষে ৩১৩ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২০০০ জন আহত হয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই অঞ্চল এবং বিশ্বের জন্য এই হত্যালীলা সবে একটি সূচনা মাত্র।

স্থানীয় পর্যায়ে এই হামলা ইজরায়েলকে নিঃসন্দেহে তার সামরিক কৌশলের ভিত্তিগুলিকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে। হামলার নেপথ্যে থাকা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে ইজরায়েলের তরফে কেমন প্রত্যুত্তর আসতে পারে, সে সম্পর্কে হামাস সম্পূর্ণ সচেতন। প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হামাস প্যালেস্তাইন এবং অন্য আরব দেশগুলিকে ‘[ইজরায়েলের] দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করা’র কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী সৈন্যদের একটি সুবিশাল শক্তিবৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছে, কারণ একাধিক পরিসর শত্রুপক্ষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে রূপান্তরিত হতে পারে। হামাসের কাছ থেকে অপহৃতদের উদ্ধার করতে এবং ইজরায়েলি আধিকারিকদের পরামর্শ অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করতে গাজায় স্থলাভিযানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এর অপর একটি প্রেক্ষিতও বর্তমান। এই ধরনের পদক্ষেপ ইজরায়েলি সেনাকে শহুরে যুদ্ধের একটি অত্যন্ত কঠিন পরিসরে প্রবেশ করতে বাধ্য করবে, যেখানে হামাস যোদ্ধারা সহজেই জনসাধারণের ভিড়ে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হবে। এটি এমন এক ধরনের কোয়্যাগমায়ার বা প্রতিবন্ধকতা (যেখানে বিপরীত পক্ষের সেনাবাহিনী আটকা পড়ে পর্যুদস্ত হতে পারে), যেটিকে ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘ দিন যাবৎ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে এবং হামাস ঠিক সেটিকেই লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।

নেতানিয়াহু গাজায় একটি বড় হামলা শুরু করার জন্য অভ্যন্তরীণ ভাবে চাপের মধ্যে থাকবেন এবং হামাস সেই চাপই বৃদ্ধির জন্য অপেক্ষা করবে।

তবে এটি এখন আর স্থানীয় সংঘাত নয়। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গটি এখন সম্প্রসারিত আঞ্চলিক চ্যুতিরেখায় পরিণত হয়েছে। হামাসের কাছে ইরানের সমর্থন রয়েছে এবং লেবাননের জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল্লা (এই দলটিও ইরান দ্বারা সমর্থিত) ইতিমধ্যে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। ইজরায়েল, লেবানন এবং সিরিয়ার দাবিকৃত অঞ্চলের একাংশ মাউন্ট ডোভ-এ হামলার দায় স্বীকার করে নেওয়ার পাশাপাশি হিজবুল্লা এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ‘প্যালেস্তাইনের প্রতিরোধের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখার জন্যই এই আক্রমণ’ চালানো হয়েছে। জাবালরুস এলাকায় হিজবুল্লার উপর আবার পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। মিশরে ইজরায়েলি পর্যটকদের নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছে এবং কাতার ‘প্যালেস্তাইনের জনসাধারণের অধিকার লঙ্ঘনের কারণে বিদ্যমান উত্তেজনার জন্য ইজরায়েলকে সম্পূর্ণ ভাবে দায়ী করেছে।’

আন্তর্জাতিক স্তরে এই পরিস্থিতি ও তার প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে  পারে। এই বিধ্বংসী হামলার মাধ্যমে হামাস ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালানোর জন্য উদ্যোগীর ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাই কেবল করছে না, তার পাশাপাশি গোষ্ঠীটি এই অঞ্চলের প্রতি উদীয়মান মার্কিন কৌশলকে ব্যর্থ করার চেষ্টায় রত হয়েছে। রিয়াধকে নিরাপত্তা সুরক্ষা প্রদান ও বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি বিনিময় করার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ও ইজরায়েলের মধ্যে একটি সমঝোতার জন্য বাইডেন প্রশাসন চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত ব্যবস্থার সূচনা হতে শুরু করেছিল। এই চুক্তি চূড়ান্ত হলে অঞ্চলটিতে ইরান ও হামাসকে কোণঠাসা করে ফেলা যেত। তাই ইজরায়েলের উপর একটি বড় সন্ত্রাসবাদী হামলার মাধ্যমে সেই প্রয়াসকে বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এখন যেহেতু ইজরায়েল হামাস এবং অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সৌদি আরব নিদেনপক্ষে জনসাধারণের আপত্তির ভয়ে অদূর ভবিষ্যতে ইজরায়েলের সঙ্গে তেমন কোনও চুক্তিতে আবদ্ধ হতে আগ্রহ প্রদর্শন করবে না।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভারতের মতো রাষ্ট্র এই ঘটনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এমনকি বিশ্ব যখন বৃহৎ শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে মনোনিবেশ করেছে, তখন ক্ষতিকর অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিদের হুমকি প্রদর্শনের ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ক্ষমতার পরিসরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলিকে সমান ক্ষমতা প্রদান করেছে, বিশেষ করে অবশ্যই সেই গোষ্ঠীগুলিকে, যেগুলি ইরান ও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে চলেছে। নিরাপত্তা পরিসরকে প্রতিপক্ষের প্রতি তাদের পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তাদের প্রতিপক্ষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হলে সব সময়ে এমনটা ভাবতে হবে, যা প্রতিপক্ষ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে না।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ক্ষমতার পরিসরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলিকে সমান ক্ষমতা প্রদান করেছে, বিশেষ করে অবশ্যই সেই গোষ্ঠীগুলিকে, যেগুলি ইরান ও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে চলেছে।

আইডিএফ একটি শক্তিশালী সামরিক যন্ত্র এবং ইজরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তা সত্ত্বেও সর্বশেষ হামলাটি এমন একটি দেশের দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছে, যে দেশটিকে এ বার বিরামহীন যুদ্ধ পর্যায়ে প্রবেশ করতে হবে। প্রতিটি যুদ্ধের লক্ষ্য যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনই হয়, তা হলে ইজরায়েলের তরফে কেবল মাত্র নিজের সামরিক ব্যবস্থাকেই পুনর্বিন্যস্ত করা এবং তার প্রতিরোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সময়ই আসেনি, বরং শক্তির উপকরণের মাধ্যমে দেশটি যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলি অর্জন করতে চায়, তা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।


এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় এনডিটিভি-তে।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Harsh V. Pant

Harsh V. Pant

Professor Harsh V. Pant is Vice President – Studies and Foreign Policy at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations ...

Read More +