Published on Nov 06, 2021 Updated 0 Hours ago

যে অনিশ্চিত এবং অরক্ষিত অবস্থার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকেরা ভারতের শহরগুলিতে বেঁচে আছেন, কোভিড-১৯ অতিমারি সেই পরিস্থিতিকে আরও প্রকট এবং জটিলতর করে তুলেছে।

ভারতে পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা মেটাতে প্রয়োজন সর্বাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি

কোভিড-১৯ অতিমারি মূলত ভারতের অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিককে অকল্পনীয় কষ্টের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত বছর কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রুখতে যখন সারা দেশ জুড়ে আকস্মিক লকডাউনের ঘোষণা করা হয়, এই সব পরিযায়ী শ্রমিক কোনও রকম আর্থ-সামাজিক এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুরক্ষা ছাড়াই কর্মসূত্রে থাকা বিভিন্ন শহরে আটকে পড়েন। নিজেদের বাস্তুভিটেয় তাঁদের ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। যানবাহনের অপ্রতুলতা, চরম দারিদ্র্য এবং অনাহার, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়, সামাজিক কুসংস্কার এবং প্রশাসনিক বৈরিতার মতো একাধিক প্রতিকূলতার মধ্যেও পায়ে হেঁটে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার চেষ্টার নিদারুণ ছবি তাঁদের সুরক্ষাহীনতার দিকটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

পরবর্তী সময়ে কিছুটা দেরিতে হলেও বিনামূল্যে খাবারের যোগান, অস্থায়ী বিশ্রামাগার, যানবাহনের বন্দোবস্ত ইত্যাদি ত্রাণ ব্যবস্থার আয়োজন কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের তরফে করা হয়। যদিও যেমনটা একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে এই সকল জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলির অভিপ্রায় সৎ হলেও এগুলি রূপায়ণে ব্যাপক ত্রুটি এবং গাফিলতি রয়ে গেছে। ফলে দুঃস্থ পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই ত্রাণ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

অতিমারির দ্বিতীয় প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা

এ বছরের শুরুতে ভারতে কোভিড-১৯ অতিমারির দ্বিতীয় প্রবাহ আছড়ে পড়ার ফলে অধিকাংশ রাজ্যই আবারও লকডাউন জারি করতে বাধ্য হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক ভাবে ধুঁকতে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকেরা, যাঁদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অতিমারির প্রথম প্রবাহের ধাক্কা কাটিয়ে সদ্য শহরাঞ্চলে কাজে যোগ দিয়েছিলেন, আবারও একবার তাঁরা জীবিকা এবং স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে বাধ্য হন।

যেহেতু পরিযায়ী শ্রমিকেরা অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করে, হঠাৎ করে কাজ হারিয়ে মাসের পর মাস তাঁদের পরিবারের দেখাশোনা করা করা এবং সুদূর কর্মস্থান থেকে বাড়ি ফেরার খরচ সামলাতে গিয়ে দ্বিতীয় প্রবাহ আসার আগেই তাঁদের সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে।

অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের ফলে গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। প্রথমত, যেহেতু পরিযায়ী শ্রমিকেরা অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করেন, হঠাৎ করে কাজ হারিয়ে মাসের পর মাস তাঁদের পরিবারের দেখাশোনা করা এবং সুদূর কর্মস্থান থেকে বাড়ি ফেরার খরচ সামলাতে গিয়ে দ্বিতীয় প্রবাহ আসার আগেই তাঁদের সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, প্রথম প্রবাহের সময়ে চলা দেশব্যাপী লকডাউন তাঁদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রবাহের সময়ে এ রকম কোনও দেশব্যাপী লকডাউন না থাকার ফলে এ বার তাঁদের দুর্দশার কথা তেমন ভাবে জনসমক্ষে উঠে আসেনি। যদিও দ্বিতীয় ঢেউয়ের শীর্ষ অবস্থায় দেশের একাধিক রাজ্য দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন জারি করে, যার ফলে আবারও বহু সংখ্যক মানুষ তাঁদের জীবিকা হারান এবং আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের পক্ষে বাড়ি ফেরা দুষ্কর হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, অতিমারির দ্বিতীয় প্রবাহের সময়ে ভারতের গ্রামাঞ্চলে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হারে এক সুতীব্র বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে, যেমনটা প্রথম প্রবাহের সময়ে ঘটতে দেখা যায়নি। ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজের নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। চতুর্থত, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা বহু গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অর্থনৈতিক সংকট ছাড়াও অরক্ষিত পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন সামনে উঠে আসে। সরকারি সাহায্যের আশ্বাস, আইনি বিধান এবং জনসেবামূলক প্রকল্পের ঘোষণা করা হলেও সেগুলির বাস্তবায়নের দিকটি দ্বিতীয় প্রবাহের সময়ে এবং তার পরবর্তীকালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধোঁয়াশাময় থেকেছে।

বহুবিধ সমস্যা

রাজ্য সরকারগুলির তরফে অবিলম্বে ত্রাণের বন্দোবস্ত করা হলেও পরিযায়ী শ্রমিকদের সংকট একই রকম থেকে যাওয়ার কারণগুলি বুঝতে গেলে সেই সকল অভাবগুলির কথা তুলে ধরতে হবে যেগুলি এক দিকে এই শ্রমিকদের নাগরিকত্বের সাধারণ অধিকারগুলিকে দীর্ঘ সময় যাবৎ দুর্বল করেছে, যখন অন্য দিকে ভারতের অন্যতম বড় শহরগুলিতে এই শ্রমিকরাই কর্মপ্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এই পরিযায়ী শ্রমিকেরা তাঁদের বাস্তুভিটে ছেড়ে উন্নততর জীবিকার সন্ধানে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, আমেদাবাদ এবং চেন্নাই-সহ অন্য বড় শহরগুলিতে পাড়ি দেন। প্রায়শই যৎসামান্য টাকার বিনিময়ে এবং কোনও রকম সামাজিক সুরক্ষা ছাড়াই অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁরা দিনমজুর, গৃহস্থ বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে দেখভাল করার কাজ, রিকশা টানা এবং অন্যান্য ছোটখাট কাজে নিযুক্ত হন। পরিযায়ী শ্রমিকদের বহুবিধ সংকটের মুখে পড়ার মুখ্য কারণগুলি হল- অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংক্রান্ত নিরাপত্তার অভাব, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনযাপন, শারীরিক সমস্যা, সামাজিক কুসংস্কার এবং রাজনৈতিক বৈষম্য। ফলে বরাবরই এক অনিশ্চয়তার আবহ বিদ্যমান ছিল যা কোভিড-১৯ অতিমারির ফলে আরও বেড়ে গেছে।

এই পরিয়ায়ী শ্রমিকদের রেশন কার্ড গ্রামে তাঁদের পরিবারের কাছে রয়ে যাওয়ার ফলে যে শহরগুলিতে তাঁরা কাজ করেন, সেখানে সরকারি ভর্তুকির স্বল্পমূল্যের খাবারের যোগান থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। কোনও এক জায়গায় নথিভুক্ত রেশনকার্ড অন্যত্র ব্যবহার করার নিয়ম না থাকার ফলে শহরগুলিতে এই সকল শ্রমিকেরা ‘বহিরাগত’ বলে বিবেচিত হন।

অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা

অসংগঠিত এবং অরক্ষিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকেরা অত্যন্ত কম মজুরিতে এবং অত্যন্ত কঠোর পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিযায়ী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান আইনি চুক্তি ভিত্তিক না হওয়ার ফলে তাঁরা জীবিকা সংক্রান্ত সব রকম সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা সময়মতো প্রাপ্য মজুরি পান না। অনিয়মিত বেতনের জন্য তাঁদের নিয়োগকর্তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। একটি সি এম আই ই বা সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি-র রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অতিমারির দ্বিতীয় প্রবাহের শীর্ষে ‘২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে যে ২ কোটি ২৫ লক্ষ মানুষ তাঁদের কাজ হারিয়েছেন, তার মধ্যে ১ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষই দিনমজুর।’ এহেন পরিস্থিতিতে সরকারের তরফ থেকে নগদ টাকা সাহায্য না পাওয়ার ফলে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা

এই সকল মানুষদের অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতার দিকটি। এই পরিযায়ী শ্রমিকদের রেশন কার্ড গ্রামে তাঁদের পরিবারের কাছে রয়ে যাওয়ার ফলে যে শহরগুলিতে তাঁরা কাজ করেন, সেখানে সরকারি ভর্তুকির স্বল্পমূল্যের খাবারের যোগান থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। কোনও এক জায়গায় নথিভুক্ত রেশনকার্ড অন্যত্র ব্যবহার করার নিয়ম না থাকার ফলে শহরগুলিতে এই শ্রমিকেরা ‘বহিরাগত’ বলে বিবেচিত হন। ফলে শহরে বসবাসকারী গরিব মানুষেরা যে সুযোগ পান, তাঁরা সেটুকুও পান না। এবং খাবারের ব্যবস্থা করতে এই শ্রমিকদের নিজেদের উপার্জনের একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খরচ করতে হয়। ২০২০ সালে আমেদাবাদে আজীবিকা ব্যুরোর করা সমীক্ষার গ্রাউন্ড রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় অঞ্চলে বসবাসের আইনি কাগজপত্র না থাকার ফলে তাঁরা গ্যাস কানেকশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে তাঁরা ভর্তুকিব্যতীত গ্যাস সিলিন্ডার অনেক বেশি দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা রান্নার জন্য কাঠ ব্যবহার করছেন। যেহেতু এই শ্রমিকদের নিজেদের গ্রামে অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে হয়, শহরে বেঁচে থাকার খরচ যোগাতে দেনার জালে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা। স্ট্র্যান্ডেড ওয়ার্কার্স অ্যাকশন কমিটি (এস ডব্লিউ এ এন)-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, অতিমারি চলাকালীন যে সব শ্রমিক সমীক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে ৭৬% শ্রমিকের কাছেই জীবনধারণের জন্য ২০০ টাকা বা তারও কম পরিমাণ অর্থ ছিল। কাজ হারানো, ন্যূনতম পরিমাণ সঞ্চয়ের অভাব এবং বিনামূল্যে খাবার পাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার ফলে অসহায় পরিযায়ী শ্রমিকদের শহরগুলিতে অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে।

জীবন যাপনের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি

যেহেতু পরিযায়ী শ্রমিকেরা তাঁদের বাস্তুভিটে ছেড়ে দূরবর্তী গ্রাম, এমনকি অন্য রাজ্য থেকেও দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে শহরগুলিতে পৌঁছন, সেখানে তাঁদের নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারের থাকার জন্য (যদি পরিবার তাঁদের সঙ্গে থাকে) জায়গার বন্দোবস্ত করতে হয়। বসবাসের জন্য স্থানটি তাঁদের কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি খুঁজতে হয় যাতে বাসা থেকে কাজে যাওয়ার দৈনিক যাতায়াতের খরচটি এড়ানো যায়। আজীবিকা ব্যুরো তাদের সমীক্ষা চালানোর সময়ে দেখেছে যে, নির্মাণকর্মী, মোট বহনকারী শ্রমিক এবং রেস্তরাঁ/ হোটেলে কর্মরত মানুষেরা কাজের জায়গাতেই থাকার অনুমতি চেয়ে নিয়োগকর্তাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। বিনিময়ে অনেক সময়েই এই কর্মীরা তাঁদের প্রাপ্য বেতনের একটা অংশ কাটাতেও রাজি থেকেছেন। অন্য শ্রমিকেরা সাধারণত তাঁদের কাজের জায়গার কাছাকাছি শস্তায় কোনও বস্তি, মেসবাড়ি অথবা শ্রমিক কলোনিতে থাকার জন্য জায়গা খোঁজেন। এই সব থাকার জায়গাগুলির চাহিদা অত্যন্ত বেশি হওয়ার ফলে ন্যূনতম শৌচব্যবস্থা এবং জলের সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে এবং অনেক জন মিলে একটি ঘর ভাগ করে নিয়ে থাকার জন্য শ্রমিকেরা অনেক বেশি ভাড়া দিতে বাধ্য হন। যে সব শ্রমিক থাকার জন্য জায়গার বন্দোবস্ত করতে পারেন না, তাঁরা সকলে ফুটপাত, স্টেশন এবং বাস ডিপোগুলিতে রাত কাটান। কোভিড-১৯ লকডাউন চলাকালীন করা একটি এস ডব্লিউ এ এন বা সোয়ান সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, কাজ হারানোর পরে পরিযায়ী শ্রমিকদের পক্ষে শহরে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বাড়ি ভাড়া জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাঁদের বের করে দেওয়া হয় এবং এই শ্রমিকেরা তাঁদের যৎসামান্য সঞ্চয়ের সবটা খরচ করে নিজেদের বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন।

পরিযায়ী শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন রাজ্য থেকে আসার ফলে কর্মক্ষেত্রে বসবাসকারী শহরগুলির সরকারি হাসপাতালে রাজ্য সরকারের ভর্তুকিযুক্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা পান না।

অপ্রতুল স্বাস্থ্য পরিষেবা

পরিযায়ী শ্রমিকেরা শহরগুলিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন যা অতিমারির সময়ে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের মে মাসে আজীবিকা ব্যুরোর একটি সমীক্ষায় যে পরিযায়ী শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০% শ্রমিকই স্বাস্থ্য পরিষেবা পাননি। ‘আনলকিং দি আরবান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে পরিযায়ী শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন রাজ্য থেকে আসার ফলে কর্মক্ষেত্রে বসবাসকারী শহরগুলির সরকারি হাসপাতালে রাজ্য সরকারের ভর্তুকিযুক্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা পান না। পাশাপাশি এই শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই দিনমজুর হওয়ার ফলে দীর্ঘ লাইন, সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি এবং সরকারি হাসপাতালগুলিতে ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি’-সহ পরিষেবা সংক্রান্ত বিবিধ বাধা তাঁদের দৈনন্দিন কর্মজীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় নিয়ে নেয়। ফলে চিকিৎসার জন্য তাঁরা বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার জায়গাগুলিতে যেতে বাধ্য হন। সেখানে চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ সামলানোর সামর্থ্য না থাকার ফলে তাঁরা ঋণ নিতে বাধ্য হন এবং ক্রমশ এক বিরাট দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়েন। এই ঋণের পরিমাণ কোভিড-১৯ সংক্রান্ত অসুস্থতার ফলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত অতিমারির দ্বিতীয় প্রবাহের সময়ে ‘নো কান্ট্রি ফর ওয়ার্কার্স’ (শ্রমিকদের কোনও দেশ নেই) এবং ‘পেশেন্টস নট পাসপোর্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনগুলিতে এমন ছবিই উঠে এসেছে। মহিলা পরিযায়ী শ্রমিকেরা, বিশেষত গর্ভবতী মহিলা, স্তন্যদায়িনী মা এবং শিশুরা অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান ও শৌচের বন্দোবস্ত, অপ্রতুল পুষ্টি এবং দারিদ্র্যের ফলে অধিকতর কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন এবং তাঁরা আরও বেশি করে রোগের প্রকোপে পড়েছেন। লকডাউন চলাকালীন মহিলাদের উপরে পারিবারিক হিংসার পরিমাণ বৃদ্ধি তাঁদের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে। কোভিড-১৯ টিকাকরণের ক্ষেত্রে টিকাকেন্দ্র সংক্রান্ত যথাযথ তথ্যের অভাব, স্মার্ট ফোনের অভাবে টিকার জন্য অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধীকরণের স্লট বুক করার অসুবিধা, প্রশাসনিক ঝামেলা এবং উপযুক্ত যোগাযোগের অভাব ইত্যাদি কারণে অসহায় পরিযায়ী শ্রমিকদের টিকাকরণের প্রক্রিয়াটি অযথা বিলম্বিত হয়েছে।

কুসংস্কার এবং বহিষ্করণের শিকার

শহরগুলিতে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষেরা পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বহিরাগত’ ভাবার কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকার ফলে শহরে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা পরিষেবার মতো চাহিদাগুলিও শ্রমিকদের পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কোভিড-১৯ অতিমারি চলাকালীন পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘নোংরা’, ‘কাজের ক্ষেত্রে দখলদার’, ‘অপরাধী’ এবং ‘অসামাজিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। এই শ্রমিকদের সংক্রমণের ‘বাহক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে শহরগুলিতে তাঁদের থাকতে দেওয়া হয়নি এবং নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁরা একই রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার ফলে নগর প্রশাসন এবং পুলিশের দ্বারা এই শ্রমিকেরা যারপরনাই অত্যাচারিত হয়েছেন। যেহেতু শহরগুলিতে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা সেই শহরের নির্বাচনে মতদাতা হিসেবে বিবেচিত হন না, শহরের রাজনৈতিক শ্রেণির ক্ষমতাবান মানুষেরা তাঁদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন মনোভাব পোষণ করেন।

নিরাপত্তার সর্বাত্মক ভাবনার পথে

এই সকল প্রতিকূলতা পরিযায়ী শ্রমিকদের সমাজের এক প্রান্তে সরে যেতে বাধ্য করেছে। সমাজে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার এবং এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাতায়াত করার স্বাধীনতা এই মানুষদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যত দিন না আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার প্রেক্ষিতে অধিকার ভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের বহুস্তরীয় সমস্যাগুলিকে দেখা হচ্ছে, তত দিন ভারতে এই জটিল মানবিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কোভিড-১৯ অতিমারির প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক ভাবে এককালীন ত্রাণ পরিষেবা দেওয়া হলেও তা সমস্যা দূরীকরণে যথেষ্ট কার্যকর নয়। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে, কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিক সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, শ্রমিকরা শহরগুলিতে যাতে সহজেই সরকারি অনুদান পেতে সক্ষম হন এবং কাগজপত্র সংক্রান্ত ঝামেলায় আটকে না পড়ে্ন, সেটি দেখার জন্য নতুন নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামোর সংস্কার করে সেগুলিকে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি আরও মানবিক করে তোলার মতো বিষয়গুলি ভারতে তাঁদের অবস্থার উন্নতির পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।


আরলিন নোরোনহা  আর এফ কলকাতার এক জন ইন্টার্ন।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Anasua Basu Ray Chaudhury

Anasua Basu Ray Chaudhury

Anasua Basu Ray Chaudhury is Senior Fellow with ORF’s Neighbourhood Initiative. She is the Editor, ORF Bangla. She specialises in regional and sub-regional cooperation in ...

Read More +
Ambar Kumar Ghosh

Ambar Kumar Ghosh

Ambar Kumar Ghosh is an Associate Fellow under the Political Reforms and Governance Initiative at ORF Kolkata. His primary areas of research interest include studying ...

Read More +