Published on Jul 12, 2022 Updated 0 Hours ago

ভারতের আমদানিকৃত কয়লার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশের ‘‌‌স্বনির্ভর’‌ হওয়ার কৌশলকে দুর্বল করে দেয়।

আমদানিকৃত কয়লা: ভারতের জন্য শক্তি নিরাপত্তার উৎস?

চিনের পরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা উৎপাদনকারী, ভোক্তা ও আমদানিকারক দেশ। ২০২০ সালে ভারতে কয়লার মজুদ–ভান্ডার ছিল ১১১ বিলিয়ন টন (বিটি), যা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম। ভারতের ঠিক উপরে থাকা চিনের চতুর্থ বৃহত্তম ১৪৩ বিটি মজুদ ছিল। যদিও কয়লার মজুদের পরিমাণে তুলনীয়, চিন কিন্তু ২০২০ সালে ৩.৯ বিটি কয়লা উৎপাদন করেছে, যা ভারতের ৭৫৯ মিলিয়ন টন (এমটি) উৎপাদনের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। ২০২১ সালের নভেম্বরে এবং আবার এপ্রিল–মে ২০২২–এ তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে কম কয়লা মজুদের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্কট ভারত সরকারকে কয়লা আমদানি করতে বাধ্য করে। এই পরামর্শ এমন এক সময়ে এসেছে যখন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপযোগী সমুদ্রবাহিত কয়লার দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। আমদানিকৃত কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু শক্তি নিরাপত্তার জন্য ভারতের স্বনির্ভরতার কৌশলের বিরুদ্ধ পথে যাওয়াই নয়, বরং যে ধারণা যা ভারতের শক্তিক্ষেত্রে বেশিরভাগ নীতিগত পছন্দের ভিত্তি সেই সামর্থ্যের সন্ধানকেও ব্যাহত করেছে।

উৎপাদন ও আমদানি

ভারতে কাঁচা কয়লা (কোকিং ও নন-কোকিং) উৎপাদন ২০০২–৩ সালের ৩৪১.২৭২ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২১–২২ সালে ৭৭৭.৩১ মেট্রিক টন হয়েছে, যার অর্থ বার্ষিক বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ শতাংশের সামান্য বেশি। বেশিরভাগ বৃদ্ধি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপযোগী (‌থার্মাল)‌ কয়লার উৎপাদন বৃদ্ধি থেকে এসেছে। ঐতিহাসিক ভাবে এর অর্থ ছিল শুধুমাত্র কোকিং কয়লা আমদানি করা, কারণ তার মজুদ পর্যাপ্ত নয়। যাই হোক, বিদ্যুতের চাহিদা ত্বরান্বিত হওয়ায়, কয়লাকে ১৯৯৩ সালে উন্মুক্ত সাধারণ লাইসেন্সের (ও জি এল) অধীনে রাখা হয়েছিল, যা থেকে থার্মাল কয়লা আমদানি শুরু হয়েছিল। ২০০০–এর শুরুর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোকিং কয়লা আমদানির পরিমাণ থার্মাল কয়লা আমদানির পরিমাণের থেকে বেশি ছিল। এটি উল্টে যায় ২০০৫–০৬ সালে, যখন ভারত ২১.৬৯৫ মেট্রিক টন থার্মাল কয়লা আর ১৬.৮৯১ মেট্রিক টন কোকিং কয়লা আমদানি করেছিল। বলা হয়েছিল এই ঘটনার কারণ কয়লার গুণমানের জন্য ভোক্তাদের (তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) পছন্দ। আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক উপকূলীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে থার্মাল কয়লা আমদানি ত্বরান্বিত হয়েছে। ২০০২–০৩ ও ২০১৯–২০ (প্রাক–অতিমারি বছর)–র মধ্যে কোকিং কয়লা আমদানি প্রায়  ১২.৯৪৭ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৫১.৮৩৩ মেট্রিক টন হয়েছে, যেখানে থার্মাল কয়লা আমদানি একই সময়ে মাত্র ১০.৩১৩ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১৯৬.৭০৪ মেট্রিক টন হয়েছে৷

আমদানিকৃত কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু শক্তি নিরাপত্তার জন্য ভারতের স্বনির্ভরতার কৌশলের বিরুদ্ধ পথে যাওয়াই নয়, বরং যে ধারণা যা ভারতের শক্তিক্ষেত্রে বেশিরভাগ নীতিগত পছন্দের ভিত্তি সেই সামর্থ্যের সন্ধানকেও ব্যাহত করেছে।

কয়লার বাণিজ্যিক মূল্য

ভারতের কয়লা আমদানির ৮০ শতাংশের বেশি ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসে। ২০২০–২১ সালে ভারতের কয়লা আমদানির ৪২.৯৮ শতাংশ (৯২.৫৩৫ এমটি) ছিল ইন্দোনেশিয়া থেকে, তারপরে ২৫.৫৩ শতাংশ (৫৪.৯৫৩ এমটি) অস্ট্রেলিয়া থেকে, এবং তারপরে দক্ষিণ আফ্রিকা (১৪.৪৫ শতাংশ, ৩১.০৯৩ এমটি) থেকে। থার্মাল কয়লার ক্ষেত্রে বৃহত্তম উৎস ছিল ইন্দোনেশিয়া  (‌৫৫.৫৬ শতাংশ বা ৯১.১৩৭ মেট্রিক টন)‌, দক্ষিণ আফ্রিকা (১৮.৯৫ শতাংশ, ৩১.০৯৩ মেট্রিক টন) ও অস্ট্রেলিয়া (১০.৯৮ শতাংশ, ১৮.০০৮ মেট্রিক টন)। ২০২০–২১ সালে ভারতের কোকিং কয়লা আমদানির ৭০.২১ শতাংশ বা ৩৫.৯৪৫ মেট্রিক টন একা অস্ট্রেলিয়ার। যখন এই বাজারে কয়লার দাম বাড়ল, তারপর থেকে আমদানি ২০২১ সালের আগস্টে ১৩.৭ শতাংশ (বছর–থেকে–বছর হিসেবে), সেপ্টেম্বরে ৯.১ শতাংশ এবং অক্টোবরে ৩.৪ শতাংশ কমেছে। কয়লা উৎপাদন ৭১৬.০৮ মেট্রিক টন থেকে ৮.‌৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৭৭.‌৩১ মেট্রিক টন হয়েছে, কিন্তু আমদানি ২০২০–২১ সালের ২১৫.‌২৫ মেট্রিক টন থেকে ১৩.‌৩১ শতাংশ কমে ২০২১–২২ সালে ১৮৬.‌৫৮ মেট্রিক টন হয়েছে৷

‌সূত্র: কোল কন্ট্রোলার্স অরগানাইজেশন, কয়লা মন্ত্রক, ভারত সরকার

আমদানি হ্রাসের বেশিরভাগই ছিল নন–কোকিং (থার্মাল কয়লা), যা ২০২০–২১ সালের ১৬৪.‌০৫ মেট্রিক টন থেকে ২০২১–২২ সালে ১৩৪.‌৩৪ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। যখন চাহিদা মূল্য সংকেতগুলিতে সাড়া দেয়, তখন একটি ‘‌বাজারে’‌ সাধারণত এই রকমই ঘটার কথা। এই বাজার–প্রতিক্রিয়ার একটি নেতিবাচক পরিণতি হল যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, যা আমদানি করা কয়লার উপর বেশি নির্ভরশীল, তা বিরূপ ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু প্ল্যান্ট দেশীয় কয়লা ব্যবহারে ফিরে এসেছে। এতে দেশীয় কয়লা মজুদ সংকট আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক কয়লার দাম যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে তখন কেন্দ্রীয় সরকার বাজারের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কয়লা আমদানি করার পথে ঠেলে দিয়ে। এটি আর্থিক সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে নিরন্তর দাঁড়িয়ে–থাকা ভারতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর বাড়তি খরচ আরোপ করবে। এখনও পর্যন্ত এটা স্পষ্ট নয় যে এই অতিরিক্ত খরচের বোঝা কী ভাবে ভাগ করা হবে (কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী, বিতরণকারী, ভোক্তা ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে)।

চিনের কয়লা আমদানির গতিপ্রকৃতি

২০০৯ সালে চিন, ততদিন পর্যন্ত কয়লার নিট রফতানিকারক, ১২৯ মেট্রিক টন বা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিকৃত কয়লার ১৫ শতাংশ আমদানি করে। চিনের কয়লা বাণিজ্য গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের বিশদ বিশ্লেষণ অনুসারে, এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী কয়লা বাজারের কোনও কাঠামোগত পরিবর্তন চিহ্নিত করে না। চিনের কয়লা আমদানির কোনও প্রয়োজন ছিল না, কারণ চিন বছরে ২.৯ বিটি কয়লা উৎপাদন করে, যা তার চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত। যাই হোক, দক্ষিণ চিনের কয়লা ক্রেতারা অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ভাবে বাণিজ্যকৃত কয়লার মধ্যে দামের পার্থক্যের সুযোগ নিয়ে খরচ কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছিল। মূল্য সঠিক হলে চিন সহজেই বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিকৃত  কয়লার ১৫–২০ শতাংশ কেনার   সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অথবা চাইলে আন্তর্জাতিক বাজার এড়িয়ে চলতে পারে। চিনের অভ্যন্তরীণ কয়লার মূল্য এবং আন্তর্জাতিক কয়লার মূল্যের মধ্যে সম্পর্ক এখন বিশ্বব্যাপী কয়লার বাণিজ্যিক প্রবাহ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে ভারত দাম নির্বিশেষে কয়লার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে বাধ্য হয়, কারণ চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। আন্তর্জাতিক কয়লার দাম (ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) রুপিতে (ত্রৈমাসিক বিনিময় হার)  ২০২০–২১ সালের প্রায় ৪,০০০ ভারতীয় টাকা/টন থেকে বেড়ে ২০২১–২২–এর প্রথম ত্রৈমাসিকে ১১,০০০ টাকা/টনের বেশি হয়েছে। এই সময়ে গড়ে অভ্যন্তরীণ কয়লার দাম ছিল ১,৫০০টাকা/টন। চিনের কয়লা আমদানির গতিপ্রকৃতিকে ‘‌ব্যয়ের ন্যূনতমীকরণ’‌ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, আর তার বিপরীতে ভারতের আমদানির গতিপ্রকৃতিকে শুধু ‘‌ব্যয় সর্বাধিকীকরণ’‌ হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে, যদিও তা ইচ্ছাকৃত ভাবে করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক কয়লার দাম যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে তখন কেন্দ্রীয় সরকার বাজারের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কয়লা আমদানি করার জন্য চাপ দিয়ে ।

ইস্যু

স্বনির্ভরতার আখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে (আত্মনির্ভর) আমদানি করা কয়লা ভারতের শক্তি নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সরকার ২০২০ সালে ঘোষণা করেছিল যে ভারত ২০২৩–২৪ সালে থার্মাল কয়লায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে, এবং সি আই এল (কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড) একক ভাবে ১ বিটি পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধি করবে, আর রেল ও নৌপরিবহণ মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে লজিস্টিক বাধা দূর করা হবে। পরিহাসের কথা হল, ২০২১–২২ সালেও ভারতের শক্তি সুরক্ষায় যা বড় অবদান রাখে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অন্য উপায় না–থাকলে কয়লা আমদানি করাই হল শেষ উপায়। শুধু তাই নয়, আমদানি করা কয়লা চ্যালেঞ্জ করছে ‘‌সাধ্যের’‌ যুক্তিকেও, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো বিকল্পগুলির বিপরীতে দেশীয় কয়লার ব্যবহারের ন্যায্যতা দিতে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে আমদানি করা কয়লার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া এই ছবিই তুলে ধরে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে যা অসহনীয় তা হল বিদ্যুতের অভাব, আর তার বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল শক্তিও গ্রহণযোগ্য।

হাইড্রোকার্বন উৎপাদনকারী অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১১ সাল ছিল এমন একটি বছর যখন জ্বালানি সরবরাহে বাধা এসেছিল এবং দামও খুব বেশি ছিল, যার ফলে হাইড্রোকার্বন সরবরাহ হ্রাস পেয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ (সুনামি) এবং তার প্রতিধ্বনি বিশ্বের পারমাণবিক শক্তির এবং অস্ট্রেলিয়ায় বন্যা বিশ্বব্যাপী কয়লার প্রাপ্যতা হ্রাস করে। সেই সময় তেলের বার্ষিক গড় মূল্য ১০০ মার্কিন ডলার/ব্যারেল-এর উপরে ছিল। সরবরাহের ক্ষেত্রে এই একাধিক বিঘ্নের প্রতিক্রিয়া অবিলম্বে পাওয়া গেছিল, কারণ জাপানের মতো যে সব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তারা সকলেই আন্তর্জাতিক শক্তি বাজারের সঙ্গে ভাল ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। পারমাণবিক শক্তি ছিল জাপানে মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ, আর তার ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে তা পূরণ করতে হয় কয়লা ও গ্যাস  দিয়ে। অন্তর্নিহিত বার্তাটি হল, আত্মনির্ভরতার জাতীয়তাবাদী ধারণার পরিবর্তে দাম এবং লজিস্টিকাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জ্বালানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া শক্তি সুরক্ষার জন্য ভাল বিকল্প।

‌সূত্র: কোল কন্ট্রোলার্স অরগানাইজেশন, কয়লা মন্ত্রক, ভারত সরকার
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Vinod Kumar Tomar

Vinod Kumar Tomar

Vinod Kumar, Assistant Manager, Energy and Climate Change Content Development of the Energy News Monitor Energy and Climate Change. Member of the Energy News Monitor production ...

Read More +
Lydia Powell

Lydia Powell

Ms Powell has been with the ORF Centre for Resources Management for over eight years working on policy issues in Energy and Climate Change. Her ...

Read More +
Akhilesh Sati

Akhilesh Sati

Akhilesh Sati is a Programme Manager working under ORFs Energy Initiative for more than fifteen years. With Statistics as academic background his core area of ...

Read More +