Published on Jun 24, 2024 Updated 0 Hours ago

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের সাক্ষী হচ্ছে চিন। এই কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এটিতে চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে ও ‘ক্ষুদ্র বহুপাক্ষিক’ কাঠামো এই জোটকে সমর্থন জোগাচ্ছে।

দক্ষিণ চিন সাগরের বর্তমান মন্থন নিয়ে চিনের উদ্বেগ

১১ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ফিলিপিন্সের মধ্যে প্রথম ত্রিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনটি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে এপ্রিল দক্ষিণ চিন সাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপিন্স এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রথম সামরিক মহড়া হয়েছিল।

এটি খুব বেশি দিন আগেকার কথা নয়, যখন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ফিলিপিন্স প্রথম ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা নীতি সম্মেলন’-এর আয়োজন করে এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মানবিক ত্রাণ দুর্যোগ প্রতিক্রিয়ার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। আবার ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনী মেরিন কর্পোরালস, ফিলিপিন্সের সশস্ত্র বাহিনী মেরিন কর্পোরালস এবং জাপান গ্রাউন্ড সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স টোকিওতে তাদের প্রথম ত্রিপাক্ষিক বৈঠক আয়োজন করে, যা তিন দেশের স্থলবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা ভিত্তি স্থাপন করেছিল২০২৩ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ফিলিপিন্সের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানরা প্রথম ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা আলোচনার আয়োজন করেন, যা তিনটি দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রক্রিয়ার একটি নতুন স্তরকেই দর্শায়। ২০২৩ সালের জুলাই সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি দেশের বিদেশমন্ত্রীরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য প্রথম বারের মতো বৈঠকে যোগ দেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী কিশিদা ফিলিপিন্সেপ্রেসিডেন্ট মার্কোস এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারিস আরও এক বার ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার জন্য বৈঠক করেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপিন্সের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কের দ্রুত বিকাশ এবং দক্ষিণ চিন সাগর পূর্ব চিন সাগরকে সংযোগ করা সংক্রান্ত বিরোধ এবং তাইওয়ান সমস্যা’ বেজিংয়ের জন্য বিপদের ঘণ্টা বাজিয়েছে।

 

বর্তমানে চিনা ইন্টারনেটে এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই চারটি দেশ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপিন্স, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে একটি নতুন চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সমন্বিত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপিন্সের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কের দ্রুত বিকাশ এবং দক্ষিণ চিন সাগর পূর্ব চিন সাগরকে সংযোগ করা সংক্রান্ত বিরোধ এবং তাইওয়ান সমস্যা’ বেজিংয়ের জন্য বিপদের ঘণ্টা বাজিয়েছে।

চিনের মূল্যায়ন হল এই যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীভূত সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো ক্রমশ আকার নিচ্ছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যে জোটের লক্ষ্য হল চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এর পরিপূরক হিসেবে রয়েছে ‘ক্ষুদ্র-বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাপনার একগুচ্ছ বিন্যাস।

চায়না সাউথ চায়না সি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী গবেষক হু শি গুয়াঞ্চা ডট কমে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন জোট ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য, কাঠামো এবং সদস্যের পরিপ্রেক্ষিতে যথেষ্ট অভ্যন্তরীণ সমন্বিতকরণ র্জনে সফল হয়েছে।

ক. লক্ষ্যের নিরিখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা গঠিত জোট ব্যবস্থায় তুলনামূলক ভাবে শিথিল অবকাঠামো ছিল এবং একটি সমন্বিত কৌশলগত লক্ষ্যের অভাব ছিল। কিন্তু বর্তমানে চিন থেকে একটি অভিন্ন কৌশলগত হুমকির ধারণা মার্কিন জোট ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়কারী অভিন্ন সাধারণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা দিয়েছে।

খ. কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে মূল দ্বিপাক্ষিক জোট ব্যবস্থা (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স এবং তাইল্যান্ড-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে) বিন্যাসটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এর বিভিন্ন দেশের মধ্যে একটি ‘ক্ষুদ্রপাক্ষিক ব্যবস্থাবিন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার জোট ব্যবস্থার ভৌগোলিক সুযোগকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গ. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার জোট ব্যবস্থার মধ্যে আরও ভাল সমন্বিতকরণ, যোগাযোগ এবং পরিচালনার সুবিধার্থে সদস্য দেশগুলির (মিত্র/অংশীদার) মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা আলোচনা এবং সহযোগিতার প্রচার করছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপান এবং ফিলিপিন্স, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারত, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি একে অপরের বিদেশমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে একটি ‘২+২’ আলোচনা প্রক্রিয়া স্থাপন করেছে।

 

আঞ্চলিক বিষয়ে অঞ্চল-বহির্ভূত দেশগুলিকে সম্পৃক্ত করা এবং চিরাচরিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিসরের বাইরের বিষয়গুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে মার্কিন জোট ব্যবস্থাও একটি বাহ্যিক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে

 

জাপান এবং ভারত একটি বিশেষ কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ছাড়াও জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া ভিয়েতনামের সঙ্গে একটি ‘সর্বাঙ্গীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব গঠন করেছেঅস্ট্রেলিয়া এবং ভারত ২০২০ সালে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি সর্বাত্মক নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে। এর পাশাপাশি ২০২২ সালে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা সহযোগিতা সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণাপত্র-এ স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে জাপান এবং ফিলিপিন্স একটি রেসিপ্রোকাল ট্রুপস অ্যাক্সেস এগ্রিমেন্ট বা সম্পূরক বাহিনী ব্যবহার চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা চালাচ্ছে।

২. আঞ্চলিক বিষয়ে অঞ্চল-বহির্ভূত দেশগুলিকে সম্পৃক্ত করা  এবং চিরাচরিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিসরের বাইরের বিষয়গুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে মার্কিন জোট ব্যবস্থাও একটি বাহ্যিক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বেজিং এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন যে, কী ভাবে অঞ্চলস্থিত দেশগুলির মধ্যে ২+২ আলোচনাকে উৎসাহিত করা এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন বা উচ্চ-স্তরের সামরিক মহড়া ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানিকে ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতির অংশ করে তোলা হয়েছে।

তা ছাড়াও চিনের আশঙ্কা বৃদ্ধি করে মার্কিন জোট ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা প্রতিরক্ষার মতো উচ্চ-রাজনৈতিক একক বিষয়ে মনোনিবেশ করছে না, বরং অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল ও নতুন জ্বালানির মতো নিম্ন-রাজনৈতিক এবং বৈচিত্র্যময় কার্যকরী বিষয়গুলিতে মনোযোগ দিচ্ছে। যেমনটা হু শিন দর্শিয়েছেন, ক্ষুদ্রপাক্ষিকের এই ‘আন্তঃক্ষেত্রীয়’ প্রকৃতি কী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘চিন থেকে ডি-সিনিসাইজেশন বা অ-চিনকরণ/ডি-কাপলিং বা বিচ্ছিন্নকরণ’ কৌশলের তীব্রতা পরিধি আরও বাড়িয়েছে।

 

একটি প্রতীকী পদক্ষেপে বেজিং নির্বাচিত হওয়ার ঠিক ১০ দিনের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোকে আপ্যায়ন জানিয়েছে এবং চিনের প্রতি পূর্বসূরি জোকো উইডোডোর বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি অব্যাহত রাখার জন্য সুবিয়ান্তোর তরফে আশ্বাস চেয়েছে।

 

এ দিকে, এশিয়ায় মার্কিন জোট ব্যবস্থার কথিত শক্তিশালীকরণকে মোকাবিলা করার জন্য চিন তার আসিয়ান প্রসারকে আরও জোরদার করেছে। একটি প্রতীকী পদক্ষেপে বেজিং নির্বাচিত হওয়ার ঠিক ১০ দিনের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোকে আপ্যায়ণ জানিয়েছে এবং চিনের প্রতি পূর্বসূরি জোকো উইডোডোর বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি অব্যাহত রাখার জন্য সুবিয়ান্তোর তরফে আশ্বাস চেয়েছে। এর পর পরই চিনেবিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই লাও এবং তিমুর-লেস্তের বিদেশমন্ত্রীদের সঙ্গে একের পর এক আলোচনা চালান। ওয়াং ই দ্রুতই ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং পাপুয়া নিউ গিনিতে ছদিনের সফরে যাবেন। আশা করা যায়, ফিলিপিন্সের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট আসিয়ান সদস্যের উপর চিন নিজের উল্লেখযোগ্য প্রভাব খাটাবে।

অন্য দিকে, কিছু চিনা বিশ্লেষকের অভিমত এই যে, তাইওয়ানের পাশাপাশি দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সাগর প্রসঙ্গে জোরালো অবস্থান সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবে কার্যকর হয়ে ওঠা কঠিনতর হতে পারে। এর কারণগুলি হল, অভ্যন্তরীণ ভাবে রাজনৈতিক বিভাজন মার্কিন কংগ্রেসের জন্য বাধা হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে ইউক্রেন, রায়েল এবং কোরীয় উপদ্বীপের অশান্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চিনের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে বাধা দিচ্ছে। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিনা উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখতে এবং আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে অবশেষে ট্রেজারি সেক্রেটারি ইয়েলেন বা সেক্রেটারি অব স্টেট ব্লিঙ্কেনকে পাঠাতে বাধ্য হবে তৃতীয়ত, চিনা পক্ষও এ বিষয়ে আশাবাদী যে, সম্ভাব্য ট্রাম্প ২.০ প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত মার্কিন জোট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেন প্রশাসনের অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে এবং এর ফলে পরোক্ষ ভাবে চিন উপকৃত হতে পারে।

যেহেতু লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) পরিস্থিতি একটি অচলাবস্থায় আটকে রয়েছে, তাই ভারতকে অবশ্যই চিনের অন্যান্য ক্ষেত্র অর্থাৎ দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সাগর এবং তাইওয়ান প্রণালীর ঘটনাপ্রবাহের উপর নিবিড় নজর রাখতে হবে, যাতে সেই পরিস্থিতিগুলিকে ভারত নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে।

 


অন্তরা ঘোষাল সিং অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Antara Ghosal Singh

Antara Ghosal Singh

Antara Ghosal Singh is a Fellow at the Strategic Studies Programme at Observer Research Foundation, New Delhi. Her area of research includes China-India relations, China-India-US ...

Read More +