Published on Aug 16, 2023 Updated 20 Days ago

মায়ানমারে বিদ্রোহ সংক্রান্ত সমস্যাগুলির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের সমাধান না হলে সিটওয়ে বন্দরে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা কঠিন হবে

সিটওয়ে বন্দরে প্রথম ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছল: কালাদান প্রকল্পের মূল্যায়ন

মহা আড়ম্বরে প্রথম ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ এমভি-আইটিটি লায়ন (ভি-২৭৩) ২০২৩ সালের ৯ মে সুপরিচিত সিটওয়ে বন্দরে সফল ভাবে নোঙর করে। এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (কেএমএমটিটিপি) পরিকল্পিত হওয়ার দুই দশকের পর ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের একটি মাইলফলককেই স্পর্শ করেছে৷ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে চাল নিয়ে বাংলাদেশে একটি জাহাজ সফল ভাবে প্রেরণের পরে ২০২৩ সালের ৫ মে বন্দর, নৌপরিবহণ এবং জলপথ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর আনুষ্ঠানিক ভাবে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর থেকে ১০০০ মেট্রিক টন সিমেন্ট সমন্বিত ২০০০০ ব্যাগের প্রথম কার্গোটির যাত্রা উদ্বোধন করেন।

বন্দর থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম ২০১৮ সালে নৌপরিবহণ মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল এবং নেপিদৌ অনুমতিও দিয়েছিল।

মালবাহী জাহাজের সফল নোঙরব্যবস্থা বর্ধিত পরিবহণ সংযোগের পথকে প্রশস্ত করে, যার ফলে কলকাতা থেকে আইজল এবং সমগ্র উত্তর-পূর্ব অঞ্চল জুড়ে পণ্য পাঠানোর খরচ এবং সময় দুই-ই ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। এটি বাণিজ্যিক বিপ্লবের পাশাপাশি অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বন্দর, নৌপরিবহণ এবং জলপথ দফতরের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষটি কেবল কৌশলগত সম্পর্কই জোরদার করেনি, বরং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও প্রতিশ্রুতিময় হয়ে উঠেছে।

বন্দর, নৌপরিবহণ এবং জলপথ দফতরের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষটি কেবল কৌশলগত সম্পর্কই জোরদার করেনি, বরং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও প্রতিশ্রুতিময় হয়ে উঠেছে। সুতরাং ৪৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যসম্পন্ন কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট-এর (কেএমএমটিটিপি) কার্যকরী দক্ষতা প্রদর্শন যথাযথ কি না, তা বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পোর্ট অপারেশনালাইজেশন বা বন্দরের কার্যকারিতার সুবিধা

সিটওয়ে বন্দর মায়ানমারের রাখাইন স্টেটের রাজধানী সিটওয়েতে অবস্থিত একটি গভীর নাব্যতার বন্দর। ভারত দ্বারা নির্মিত এবং অর্থায়িত এই বন্দরটি কৌশলগত ভাবে বঙ্গোপসাগরের কালাদান নদীর মোহনায় অবস্থিত। এটি কেএমএমটিটিপি-র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ২০০৮ সালে অনুমোদিত হয়েছিল।

বন্দরটি বিশেষ ভাবে ২০০০০ ডেড ওয়েট টনেজ-এর (ডিডব্লিউটি) সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজগুলিকে নোঙর করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। বন্দরটির বর্তমান ব্যবহার এত বড় জাহাজের সঙ্গে জড়িত না হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই ভারী জাহাজের চাহিদা থাকবে বলে আশা করা যায়।

আপাতত ভারতে রফতানির মতো উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলির মধ্যে রয়েছে চাল, কাঠ, মাছ ও সামুদ্রিক খাবার, পেট্রোলিয়াম পণ্য, পোশাক ও কাপড়। অন্য দিকে, বন্দরটি ভারত থেকে সিমেন্ট, ইস্পাত, ইট এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যক পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করার সুবিধা প্রদান করে।

মিজোরাম এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলি এই প্রকল্প দ্বারা উপকৃত হবে। ত্রিপুরা সরকার কালাদান নদীর মাধ্যমে নিজেদের রাজ্য ও মায়ানমারের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ সংযোগ স্থাপনের সুবিধার্থে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সড়কপথে যাত্রা সম্পূর্ণ হতে সাধারণত চার দিন সময় লাগে। যাই হোক, জল ও স্থলপথ অনুসরণ করে সিটওয়ে-চট্টগ্রাম-সাব্রুম-আগরতলা রুটে পরিবহণের সময় দু’দিন কমিয়ে আনা হবে, যার ফলে খরচ ও সময় দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সাশ্রয় হবে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে। এ বিষয়ে অবশ্য একটি উপযুক্ত ডিপিআর এখনও সম্পন্ন হয়নি।

জল ও স্থলপথ অনুসরণ করে সিটওয়ে-চট্টগ্রাম-সাব্রুম-আগরতলা রুটে পরিবহণের সময় দু’দিন কমিয়ে আনা হবে, যার ফলে খরচ ও সময় দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সাশ্রয় হবে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।

এটি শুধু মাত্র ভারতের স্থলবেষ্টিত অঞ্চল এবং তার প্রতিবেশী নেপাল ও ভুটানের জন্যই উপকার সাধন করে না, পাশাপাশি রাখাইন স্টেটের উন্নয়নেও একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যা খনিজ ও সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ায় প্রায়শই আরাকান আর্মি (এএ) এবং হুনতার মতো জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। একজন সম্মানিত রাখাইন ব্যবসায়ী এবং আরইআইসি রাখাইন ইকোনমিক ইনিশিয়েটিভ পাবলিক কোং লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট য়ু খিন মাউং গি জোর দিয়ে বলেন যে, এই উন্নয়ন সামগ্রিক ভাবে মায়ানমারের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাখাইন স্টেটকে আরও ব্যবসায়িক স্বাধীনতা দেওয়া আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধা নিয়ে আসবে। এটি রাখাইন স্টেটের কৃষি উৎপাদনে তার প্রচেষ্টা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দেয়। কারণ ভারত এবং অন্যান্য দেশের জন্য নির্ধারিত কৃষি পণ্যই অঞ্চলটির প্রাথমিক রফতানি পণ্য।

কেএমএমটিটিপি-র স্থায়ী প্রেক্ষিত

কালাদান প্রকল্পের মাল্টিমোডাল উপাদান ব্যবহার করার জন্য এই পথের অংশটি সম্পূর্ণ করা অত্যাবশ্যক। প্রথমত পথের উপাদানটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মায়ানমারের পালেতোয়াকে মিজোরামের জোরিনপুইয়ের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসাবে কাজ করে। ১১০ কিমি দীর্ঘ পথটি বিভিন্ন কারণে বাধার সম্মুখীন হয়। সীমান্তের উভয় পাশে সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, কঠিন ভূখণ্ড, জমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ। কারণ সমগ্র এলাকাটি প্রবল ভাবে বিদ্রোহপ্রবণ। ২০১৯ সালে কালাদান অভ্যন্তরীণ জলপথে কাজ করার সময় ভারতীয় শ্রমিকদের এএ অপহরণ করে। অতিমারি এবং ২০২১ সালের অভ্যুত্থান কাজটিকে আরও বাধা দিয়েছে।

এএ সক্রিয় ভাবে সামরিক হুনতার বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় সংগ্রামে নিযুক্ত এবং স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করছে।

যে অংশে নির্মাণ কাজ চলছে, বর্তমানে আরাকান ও মায়ানমার সেনাবাহিনী সেই অংশেই সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এএ সক্রিয় ভাবে সামরিক হুনতার বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় সংগ্রামে নিযুক্ত এবং স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করছে। যে সমস্ত এলাকায় অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন, সেগুলি বিমান হামলা এবং যুদ্ধের ফলে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এএ এবং তাতমাদাও-এর (মায়ানমারের সেনা) মধ্যে বিদ্যমান সংঘাতের ফলে ২০২৩ সালের সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে রাখাইন স্টেটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। স্টেটের ১১টি টাউনশিপ বা শহরতলি জুড়ে মোট ৭৩৪৫৮ জন মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উপরন্তু চিন স্টেটের পালেতোয়া শহরে আরও ৪৬৩২ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সব মিলিয়ে মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮০৯০-এ।

সদিচ্ছা বাড়ানোর জন্য এবং প্রকল্পকে লক্ষ্য করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঝুঁকি কমানোর জন্য রাস্তা সংক্রান্ত উপাদানের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ ইরকন ইন্টারন্যাশনাল মায়ানমারে স্থানীয় সাব-কন্ট্রাক্টর বা উপ-ঠিকাদারদের নিযুক্ত করেছে। তবে সাব-কন্ট্রাক্টর নির্বাচনের বিষয়ে কোনও সরকারি ঘোষণা করা হয়নি। ওয়ার্কিং কন্ট্রাক্টে পথের নানা অংশ সম্পূর্ণ করার জন্য একটি ৪০ মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও অপ্রত্যাশিত পরিবেশগত, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে সম্ভাব্য বিলম্বের আশঙ্কাও রয়েছে। চুক্তিটিতে আরও বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী ঠিকাদার দ্বারা করা অগ্রগতি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, এমনকি প্রয়োজনে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া অংশ পুনর্গঠন করাও হতে পারে। বিদ্যমান হিংসা, নিরলস সামরিক অভিযান এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ক্রমাগত আক্রমণগুলি উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তারই পরিচয় দেয়, যা সমাপ্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়রেখার ভবিষ্যদ্‌বাণী করার কাজটিকে কঠিন করে তোলে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (এনইআর) পণ্য, গ্যাস বা তেলের কৌশলগত পরিবহণের মাধ্যমে মায়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য সিটওয়ে বন্দরের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এনইআর-এ একটি ব্যয় কার্যকর নিয়মিত পরিবহণ রুট হিসাবে তার কার্যকারিতা অনিশ্চিত। এটি প্রাথমিক ভাবে বারংবার বাল্ক ব্রেকিং এবং ট্রান্সশিপমেন্টের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যাশিত উচ্চ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার পালেতোয়া টার্মিনালটি সম্পন্ন করা হলেও তার কার্যকারিতা সিটওয়ে এবং পালেতোয়ার মধ্যে কালাদান নদীতে রক্ষণাবেক্ষণের ড্রেজিং সম্পূর্ণ করার উপর নির্ভরশীল। এটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কার্গো জাহাজগুলি কেবলমাত্র সিটওয়ে বন্দরেই পণ্য পরিবহণ করবে।

বিদ্যমান হিংসা, নিরলস সামরিক অভিযান এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ক্রমাগত আক্রমণগুলি উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তারই পরিচয় দেয়, যা সমাপ্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়রেখার ভবিষ্যদ্‌বাণী করার কাজটিকে কঠিন করে তোলে।

মায়ানমারে বিদ্রোহের সমস্যাগুলির পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সংঘাতের সমাধান এই পথটিকে ব্যবহার করার প্রেক্ষিতে আরও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি অভ্যুত্থান বা ক্রমবর্ধমান সংঘাতের তীব্রতা মূলধন ব্যয়ের ‘লাভ’-এর ক্ষেত্রে আরও বেশি ‘ঝুঁকি’র জন্ম দেয়। সুতরাং, যে কোনও বেসরকারি বিনিয়োগকারী এমন একটি অর্থনীতিতে অর্থ বিনিয়োগ করার বিষয়ে দ্বিতীয় বার চিন্তা করবেন, যে অর্থনীতি এ হেন ‘প্রশাসনিক ঘাটতি’র ফলে ভুগছে।

বন্দরের সফল কার্যক্রম খোলার সুযোগ থাকলেও পথের নানা অংশের কাজের সমাপ্তির জন্য বিরোধ নিষ্পত্তি অপরিহার্য থাকবে, যা সম্পূর্ণ প্রকল্পের যথাযথ কার্যকারিতা সম্পন্ন করবে এবং কেএমএমটিটিপি-এর দক্ষতাকে আরও বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রদর্শন করবে।


শ্রীপর্ণা ব্যানার্জি ওআরএফ-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রাম-এর জুনিয়র ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Sreeparna Banerjee

Sreeparna Banerjee

Sreeparna Banerjee is a Junior Fellow at the Observer Research Foundation Kolkata with the Strategic Studies Programme.

Read More +