Author : Harsh V. Pant

Published on Jan 02, 2023 Updated 0 Hours ago

শূন্য-কোভিড নীতি সহ একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর ব্যর্থতা এ কথাই তুলে ধরে যে, সকল ভনিতা সত্ত্বেও চিনের ব্যবস্থা তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই

চিনের জন্য শি জিনপিংয়ের চ্যালেঞ্জ

ঐতিহাসিক হলেও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের তৃতীয় মেয়াদের সূচনা বিপর্যয়কর। শি-র গৃহীত নীতিগুলিকে যে গোটা বিশ্ব প্রত্যাখ্যান করেছিল, তা বেজিং বেশ ভালই বুঝেছিল এবং চিনা নেতার গ্রহণযোগ্যতর অবতারের প্রয়োজনীয়তার ধারণাটিও সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু শি-র গৃহীত কোভিড-নীতির প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ যে এমন একটি নাটকীয় মোড় নেবে, তার  জন্য চিনের মতো একটি রক্ষণশীল কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা সত্যিই প্রস্তুত ছিল না। চিনা কমিউনিস্ট পার্টি শিক্ষা গ্রহণ এবং মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে আত্মগর্ব বোধ করে। চিনা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সফল হয়েছে, তা চাপানউতোর সামাল দেওয়ার নিরিখে তাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। কিন্তু শি-র ক্ষমতার অভূতপূর্ব কেন্দ্রীকরণ গত তিন দশকের সমস্ত অগ্রগতির অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

কোভিড সংক্রান্ত লকডাউনে ইতি টানার জন্য চিনের একাধিক শহরে হওয়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলিতে যখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন, এমনকি যাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ শি জিনপিংয়ের পদত্যাগের দাবিতেও সরব হন, তা তখন আর শুধু মাত্র তাঁদের সাহসিকতাকেই দর্শায় না, একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদের মনোভাবকেও তুলে ধরে। পশ্চিম চিনের উরুমচিতে একটি বহুতলে আগুন লেগে ১০ জনের মৃত্যু হওয়ার পরে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ কঠোর কোভিড বিধিনিষেধকে এই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই স্ফুলিঙ্গ এমন একটি দেশে ব্যাপক বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ির দরুন গণবিক্ষোভের প্রদর্শন প্রায় অসম্ভব।

শূন্য কোভিড নীতির ‘পরিবর্তন এবং সংশোধন’-এর প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃত দেওয়া চিনা আমলাতন্ত্রের জন্য এক গুরুতর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের মুখপাত্র এই পরামর্শ দিয়ে বিক্ষোভ শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে, সরকার ‘মানুষের জীবিকা ও জীবনে (কোভিডের) নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে চলেছে।’ এ কথা বলাই বাহুল্য, এই মন্তব্য করার পাশাপাশি চিনের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমন করে এবং এমনকি যাঁরা বিক্ষোভে অংশগ্রহণ নিয়েছিলেন, তাঁদের ধরপাকড় শুরু করে।

বর্তমানে চিনই একমাত্র প্রধান অর্থনীতিযারা একটি কঠোর শূন্য-কোভিড নীতি অনুসরণ করছে। সে দেশে সামান্যতম সংক্রমণ হলেও ব্যাপক গণ পরীক্ষাকোয়ারেন্টাইন এবং আকস্মিক লকডাউন আরোপ করা হচ্ছে, যা মানবিক সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক দুর্দশাকে বাড়িয়ে তুলছে

তবে চিনা কমিউনিস্ট পার্টিকে যে তার শূন্য-কোভিড নীতির খুঁটিনাটি থেকে পিছিয়ে যেতে হচ্ছে, যে নীতির প্রশংসায় শি জিনপিং এই সবে অক্টোবর মাসে ২০তম পার্টি কংগ্রেসে নিজের ভাষণে সরব হয়েছিলেন, তা শি জিনপিংয়ের অতি এককেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক মডেলের অন্তর্নিহিত মৌলিক ঘাটতিগুলিকেই সূচিত করে। এ কথা দর্শায় যে, একটি প্রধান শক্তি হিসেবে চিনা উত্থান সম্পর্কিত সকল ধরনের প্রচার সত্ত্বেও সে দেশের নীতিনির্ধারণ সব স্তরেই ধাক্কা খেয়ে চলেছে।

বর্তমানে চিনই একমাত্র প্রধান অর্থনীতি, যারা একটি কঠোর শূন্য-কোভিড নীতি অনুসরণ করছে। সে দেশে সামান্যতম সংক্রমণ হলেও ব্যাপক গণপরীক্ষা, কোয়ারেন্টাইন এবং আকস্মিক লকডাউন আরোপ করা হচ্ছে, যা মানবিক সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক দুর্দশাকে বাড়িয়ে তুলছে। এক দিকে যখন বাকি বিশ্ব একে অপরের কাছ থেকে আদর্শ ব্যবহারিক জীবনের পন্থা শিখছে, তখন চিন প্রাথমিক ভাবে তার স্বতন্ত্র ‘শি মডেল’ প্রমাণ করার জন্য বহির্বিশ্ব থেকে কোনও শিক্ষা গ্রহণ করতে রাজি নয়। এর পাশাপাশি চিন দ্বারা নির্মিত কোভিড টিকার কার্যকারিতা অন্য টিকার তুলনায় অনেক কম। টিকাকরণের হার কম, ফলে বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য কোভিড সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং সব মিলিয়ে এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা হাজারো ভনিতা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নয়। এবং ফলস্বরূপ পাশবিক বলপ্রয়োগ এবং জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করাই অতিমারি পরিচালনার একমাত্র পথ হয়ে উঠছে।

প্রায় তিন বছর ব্যাপী অর্থনৈতিক দুরবস্থা পরিস্থিতি এখন অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং দৈনন্দিন জীবনে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। জনসাধারণ তাঁদের দুর্দশার দরুন রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। অতীতে প্রতিবাদ হলেও সেগুলির উদ্দেশ্য ও অনুপ্রেরণার উৎস ছিল স্থানীয়। এ বারের বিক্ষোভের প্রধান কারণ হল শীর্ষতম নেতার বহু প্রচারিত কোভিড নীতির বিরুদ্ধে এবং সমস্যা সেখানেই। চিনা কমিউনিস্ট পার্টি এ কথা মেনে নেবে যে, তাদের জন্য নীতির পুনর্বিবেচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু নীতিগুলির সঙ্গে যুক্ত শি-র ব্যক্তিগত মর্যাদার দরুন সম্পূর্ণ পথ পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব, অথচ যা বাস্তবে করা প্রয়োজন ছিল।

অনেক দিক থেকে দেখলেই, এ ঘটনা নতুন কিছু নয়। শি জিনপিংয়ের ইতিহাসের একটি বড় অংশ তেমন সফল নয়। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধুঁকছে এবং তার কোভিড নীতির ব্যর্থতা গণবিক্ষোভের মোড়কে প্রতিফলিত হয়েছে। শূন্য কোভিড নীতিই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতাগুলিকে ত্বরান্বিত করেছে, যেখানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি প্রায় থমকে গিয়েছে এবং যুব বেকারত্বের সরকারি হার ১৯ শতাংশের আশপাশে হলেও গৃহনির্মাণের বাজার ভেঙে পড়েছে। বিদেশনীতির ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রাসী মনোভাব বন্ধুর চেয়ে বেশি শত্রু তৈরি করেছে। ফলে বিশ্বের একটি বড় অংশ একটি অনানুষ্ঠানিক চিন-বিরোধী জোটে সামিল হয়েছে।

শূন্য কোভিড নীতিই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতাগুলিকে ত্বরান্বিত করেছেযেখানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি প্রায় থমকে গিয়েছে এবং যুব বেকারত্বের সরকারি হার ১৯ শতাংশের আশপাশে হলেও গৃহনির্মাণের বাজার ভেঙে পড়েছে

বিক্ষোভ অনেক বেশি প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়েছে। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসে শি নিজের তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার এবং কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসাবে নিজের স্থান সুনিশ্চিত করার কয়েক দিন আগে, বেজিংয়ের উত্তর-পশ্চিমে একটি প্রধান সড়কের একটি ওভারপাসে দু’টি ব্যানার দেখা যায়, যেগুলিতে শি-র কোভিড নীতি ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। বিচ্ছিন্ন হলেও এটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী দৃষ্টান্ত, যা চিনের অভ্যন্তরে অসন্তোষের চোরা স্রোতকেই তুলে ধরে।

এবং বর্তমানে বিক্ষোভের সাম্প্রতিকতম নিদর্শনগুলিতে শি-এর প্রশাসনের মডেল চিনা ব্যবস্থার সামনে যে বাধা সৃষ্টি করছে, সে কথাই প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। চিনা নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যেই ‘বিক্ষোভকারীদের’ নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হয়েছে। চিনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ‘শত্রু শক্তির অনুপ্রবেশ এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপের পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলাকে ব্যাহত করে এমন বেআইনি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে আঘাত করার জন্য’ আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এ সব থেকে যা স্পষ্ট, তা হল শি জিনপিংয়ের ব্যর্থতা একাধিক ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে এবং এমনকি সীমাবদ্ধতা থাকলেও চিনা জনসাধারণ তাঁদের অসন্তোষকে দমিয়ে না রেখে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Harsh V. Pant

Harsh V. Pant

Professor Harsh V. Pant is Vice President – Studies and Foreign Policy at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations ...

Read More +