Published on Dec 17, 2021 Updated 0 Hours ago

ভারতের জন্য নেট–জিরোয় পৌঁছনোর চ্যালেঞ্জটা মোটেই সহজ নয়। ভারত সবচেয়ে দ্রুত গতিতে প্রসারমান অর্থনীতিগুলোর একটা, আর সেই সঙ্গে তার কাছে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা। আরও আছে শীঘ্রই ৫ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনীতি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। এই অবস্থায় ভারত কি পারবে পরিবেশ আর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে?‌

ভারতের জন্য নেট–জিরোয় পৌঁছনোর সময়সীমা হিসেবে ২০৭০ কেন যথাযথ

‘নেট–জিরো’‌ মানচিত্রে ২০৭০–এর মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার জন্য ভারতের অঙ্গীকার উন্নত বিশ্বের কিছু কিছু কোণ থেকে সমালোচিত হলেও সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে উন্নতিশীল ও অনুন্নত বিশ্বের কাছে একটা দৃষ্টান্তস্বরূপ লক্ষ্যমাত্রা হয়ে থাকল। সমালোচনার কারণ হল ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছনোর বহুলস্বীকৃত সময়সীমা ২০৫০–এর থেকে ভারতের বিচ্যুতি।

ভারতের জন্য নেট–জিরোয় পৌঁছনোর চ্যালেঞ্জটা মোটেই সহজ নয়। ভারত সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়ে চলা অর্থনীতিগুলোর একটা, আর সেই সঙ্গে তার কাছে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা। আরও আছে শীঘ্রই ৫ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনীতি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। এই অবস্থায় ভারত কি পারবে পরিবেশ আর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে?‌

এখানে আমরা নিয়ে আসব ‘‌সবুজ বৃদ্ধি’‌ (‌গ্রিন গ্রোথ)‌ ও ‘‌অ–বৃদ্ধি’‌(‌ডিগ্রোথ)‌–র পরিপ্রেক্ষিত।

পশ্চিমী বিদ্বজ্জন ও নীতি–নির্ধারকেরা, বিশেষ করে যাঁরা নর্ডিক অঞ্চলের, তাঁরা স্বীকার করেন যে এখনকার মাত্রায় বৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়াসের জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবনমন ও অবক্ষয়ের কারণে। এর ফলে শুধু বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবার ক্ষতি হচ্ছে না, সেই সঙ্গেই তা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চিরাচরিত সংস্কৃতির মূল ভিত্তির, যা পৃথিবীর বুকে বিকশিত সব ধরনের প্রাণকে সম্মান জানায়।

অন্য দিকে, জলবায়ু বিতর্কের মূল সমস্যা হল এটা প্রায় পুরোটাই গ্লোবাল নর্থ বা উন্নত বিশ্বের নির্দেশিত পথে গিয়ে কার্বন–কেন্দ্রীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের কার্বন–কেন্দ্রীক আলোচনা কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে গ্লোবাল সাউথ (‌অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর)–এর‌ ন্যায্যতা ও বণ্টন সংক্রান্ত গভীর উদ্বেগকে গ্রাহ্য করে না।

পশ্চিমী বিদ্বজ্জন ও নীতি–নির্ধারকেরা, বিশেষ করে যাঁরা নর্ডিক অঞ্চলের, তাঁরা স্বীকার করেন যে এখনকার মাত্রায় বৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়াসের জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবনমন ও অবক্ষয়ের কারণে।

তা হলে কি যে রকম অনেক সময়েই বলা হচ্ছে সেই ভাবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণকে বিযুক্ত করার মধ্যেই সমাধান নিহিত আছে?‌

বৃদ্ধি সংক্রান্ত মজ্জাগত অতিরিক্ত আকর্ষণের কারণে চতুষ্পার্শ্ববর্তী পরিবেশের অবক্ষয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষের বেঁচে থাকা ও ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য গ্রহের যে সীমাগুলো মেনে চলা প্রয়োজন তা এখন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে গিয়েছে, আর জলবায়ু পরিবর্তন সহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে।

এই লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর পর বৃদ্ধি ‘‌সবুজ’‌ হতে পারে যদি অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণকে পুরোপুরি বিযুক্ত করা যায়। সেই জন্যই ‘‌সবুজ বৃদ্ধি’‌ এখন সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে।

আমরা এখানে বলতে চাই,বৃদ্ধি ও পরিবেশগত অবক্ষয়কে এ ভাবে বিযুক্ত করা বাস্তবে ও প্রামাণ্য পর্যায়ে অসম্ভব।

২০১৬ সালের একটি পেপারে একটি বিশ্লেষণাত্মক ম্যাক্রো মডেলের ভিত্তিতে ওয়ার্ড ও অন্যরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, ‘‌জিডিপি (‌মোট আভ্যন্তর উৎপাদন)‌–র বৃদ্ধিকে শেষ পর্যন্ত সম্ভবত বস্তুগত ও শক্তি ব্যবহারের বৃদ্ধি থেকে বিযুক্ত করা যায় না, আর তা স্পষ্ট ভাবে দেখিয়ে দেয় যে জিডিপি–র বৃদ্ধি অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখা যায় না। এই কারণেই বিযুক্তিকরণ সম্ভবপর হবে এমন প্রত্যাশার ভিত্তিতে কোনও বৃদ্ধিনির্ভর কর্মপন্থা তৈরি করা বিভ্রান্তিকর।’‌

এর প্রভাব পড়বে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের উপর, কারণ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অভীষ্ট পূরণ করতে গিয়ে জঙ্গল, কৃষি–বাস্তুতন্ত্র ও জলাভূমির ক্ষতি কিন্তু কার্বন শোষণের ব্যবস্থাটাকেই ধ্বংস করার পথে নিয়ে যায়। কাজেই ‘‌সবুজ বৃদ্ধি’র মধ্যেই নিহিত আছে স্পষ্ট বিরোধাভাস। বৃদ্ধি সব সময়েই পিঙ্গলবর্ণ, আর তার মধ্যে নিহিত থাকে আনুষঙ্গিক মূল্য।

অন্য দিকে অ–বৃদ্ধির প্রবক্তারা উপরে উল্লেখিত কারণে সবুজ বৃদ্ধির ধারণাটিকে খারিজ করে গ্লোবাল নর্থ–এ অর্থনৈতিক কাজকর্মের সঙ্কোচন ঘটিয়ে বর্তমান জীবনধারা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কথা বলে থাকেন। একথাও বিশ্বাস করা হয় যে এর ফলে গ্লোবাল সাউথ–এ সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে আরও বেশি করে নিজের–বেছে–নেওয়া পথে চলার জায়গা তৈরি হবে।

সাধারণ ভাবে যদিও মনে করা হয় যে অ–বৃদ্ধি হল পৃথিবীর যে অংশগুলো ইতিমধ্যেই উন্নত হয়ে গেছে (‌অর্থাৎ গ্লোবাল নর্থ)‌ সেখানকার ফ্যাশনেব্‌ল স্টেটমেন্ট, আদতে কিন্তু এই বক্তব্য উঠে আসছে এমন এক পৃথিবী থেকে যা আরও ন্যায়সঙ্গত, যেখানে সঙ্কটের সময় রক্ষা করার মতো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত, যেখানে নীতিসমূহ বণ্টনগত ন্যায়বিচার কার্যকর করে, এবং যেখানে সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে বাজারের শক্তির উপর নির্ভরতা কম।

ভারতের এবং অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগ মূলত গ্লোবাল নর্থ–এর তৈরি পশ্চিমী ধারণা ‘‌নেট–জিরো’‌র চশমা দিয়ে দেখা সম্ভব নয়।

কাজেই পশ্চিমের কাছে জলবায়ু সংক্রান্ত আলোচনার টেবিলে একমাত্র আলোচ্য হিসেবে ‘নেট–জিরো’‌ তুলে ধরার তাগিদ স্বাভাবিক, কারণ তারা মোটের উপর ন্যায়সঙ্গতির লক্ষ্যগুলো পূরণ করে ফেলেছে। এই কারণেই ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন মনে করে ইওরোপিয়ান গ্রিন ডিল ২০৫০–এর মধ্যেই হয়ে উঠবে পৃথিবীর প্রথম ‘‌জলবায়ু–নিরপেক্ষ ব্লক’‌।

ভারতের ভাবনা ও অগ্রাধিকার

ভারতের উন্নয়নের ভাবনা কিন্তু অনেকটাই এর বিপরীতধর্মী। ভারতের এখনকার  উন্নয়নের যা অবস্থা, তাতে পূর্ণ বিযুক্তির পথে ঝাঁপ দিলে তা ন্যায়সঙ্গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভারতের বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপি এখনও মাত্র ১৯০১ মার্কিন ডলার, আর এইচডিআই (মানব উন্নয়ন সূচক)‌–এ ক্রম হল ১৩১ (‌১৮৯ দেশের মধ্যে)‌। কাজেই পূর্ণ বিযুক্তির অর্থ দাঁড়াবে সীমিত আর্থিক সম্পদ নিয়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতার হার বৃদ্ধির প্রয়াস ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা। এখনকার অবস্থায় ভারতের পক্ষে অ–বৃদ্ধির পথে জলবায়ু সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

ভারতের এবং অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগ মূলত গ্লোবাল নর্থ–এর তৈরি পশ্চিমী ধারণা ‘‌নেট–জিরো’‌র চশমা দিয়ে দেখাও সম্ভব নয়।

আলোচনার টেবিলে সম্পূর্ণ অবহেলিত থাকছে বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবা (‌সেই সব পরিষেবা যা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বিনামূল্যে দিয়ে থাকে মানব সম্প্রদায়কে)‌-র উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ২০০৯ সালে ‘নেচার’ পত্রিকায় পবন সুখদেবের পেপারে বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবার আর্থিক মূল্যায়ন করা হয়েছিল এই ভাবে যে তা হল ‘‌গরিবের জিডিপি’‌। এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল যে ভারতের গরিব মানুষের ৫৭ শতাংশ উপার্জনের উৎস হল প্রকৃতি।

কাজেই, যা–ই সমালোচনা করা হোক না কেন, সময়সীমা হিসেবে ২০৭০–এর মধ্যে ভারতের ‘‌নেট–জিরো’‌য় পৌঁছনোর স্বপ্ন যুক্তিসঙ্গত, কারণ উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বণ্টনগত সমস্যার সমাধান করার যে দায় আছে তা বহুবিধ এবং উন্নত দেশগুলোর থেকে অনেক জটিল।

ভারতের এখন আশু প্রয়োজন হল একটা সামগ্রিক উন্নয়নের প্রকরণ যা উন্নয়নের বণ্টনগত উদ্বেগের দিকটির সঙ্গে যুক্ত করবে বাস্তুতন্ত্রকে। স্ববিরোধী ‘‌সবুজ বৃদ্ধি’‌র ভাবনা বা পশ্চিমী ‘অ–বৃদ্ধি’‌র কাঠামো, এর কোনওটাই এই অগ্রাধিকারগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়।


এই ভাষ্যটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ইন্ডিয়া টুডে–তে।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Nilanjan Ghosh

Nilanjan Ghosh

Dr. Nilanjan Ghosh is a Director at the Observer Research Foundation (ORF), India. In that capacity, he heads two centres at the Foundation, namely, the ...

Read More +
Renita Dsouza

Renita Dsouza

Renita DSouza is a PhD in Economics and a Fellow at Observer Research Foundation Mumbai under the Inclusive Growth and SDGs programme. Her research focus ...

Read More +