Published on May 02, 2023 Updated 0 Hours ago

শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্কট চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রদত্ত বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা এবং তার উপর নির্ভরতার মূল্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করছে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বাস্তবে ফিরে এসেছে

চিন গত ৬ মার্চ শেষ প্রধান দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা হিসাবে শ্রীলঙ্কাকে অর্থায়ন ও  ঋণ–কাঠামো পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কলম্বোর ২.৯ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট  প্যাকেজের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সম্মত হয়েছে। আইএমএফ  চিনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ধারাবাহিক আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহত্তর অগ্রগতির ইঙ্গিতবাহী। ২০২২ সালে আরও দুটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ যারা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)–এ অংশগ্রহণকারী — পাকিস্তান ও বাংলাদেশ —  আইএমএফের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল। উপমহাদেশের এই ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দেয় যে উন্নয়নশীল দেশগুলি চিনের বিরোধিতা না–করেও   আইএমএফ ও পশ্চিমের কাছে পৌঁছে গিয়ে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থিতিশীলতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

চিনের ভূ–রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বে দৃঢ় অবস্থানের অনুসন্ধান ব্রেটন উডস সিস্টেমের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সংশোধনবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা হল আইএমএফের মতো ‘‌পশ্চিমী আধিপত্যাধীন প্রতিষ্ঠান’‌গুলির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা এবং সেগুলিকে প্রতিস্থাপিত করা। ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কট এবং ২০১৩ সালে বিআরআই চালু হওয়ার ফলে চিনা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাঙ্কগুলি থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এলিটদের কব্জা করা, আর্থিক প্রণোদনা ও দুর্নীতি, সহায়তার জন্য কম শর্ত রাখা, এবং দ্রুত অর্থপ্রদান চিনকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্পে পরিণত করেছে। ২০২১ সাল নাগাদ চিনের বিতরিত ঋণের মূল্য ছিল ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাকে বিশ্বের বৃহত্তম ঋণদাতা করে তুলেছে। এই ঋণের পরিমাণ অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।

একইসঙ্গে এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক দুর্ভোগ চিনা ঋণের উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে। এখন শ্রীলঙ্কার চিনের কাছে ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ আছে, যা তার মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ। পরিমাণটি চিনকে শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতায় পরিণত করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেজিং দেশটিকে ঋণের ফাঁদে জড়ানোয় অবদান রেখেছে। ২০১৭ সালে বৈদেশিক মুদ্রা হ্রাসের লক্ষণগুলি স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেজিং শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় শক্তিশালী করার জন্য নতুন সহায়তা ঋণ দেয়। অর্থনৈতিক সংস্কার, ঋণ কমানো ও ঋণ–কাঠামোর পুনর্গঠন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত করবে বলে বিবেচনা করে বেজিং নিজের স্বার্থে শ্রীলঙ্কাকে আইএমএফের কাছে যাওয়া থেকে বিরত করতে চেয়েছিল।

২০২২ সালে সঙ্কট গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং চিনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার মতপার্থক্য তীব্রতর হওয়ায় বেজিং শ্রীলঙ্কার ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা ও ঋণ–কাঠামো পুনর্গঠনের অনুরোধের বিষয়ে উদাসীন ছিল। তারা শ্রীলঙ্কার ঋণশোধ পরিষেবা স্থগিত রাখা এবং ২.৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বেলআউট প্যাকেজের জন্য আইএমএফের কাছে যাওয়ার বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে। এদিকে আইএমএফ বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে শ্রীলঙ্কাকে বলে তার প্রধান দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা নিয়ে আসতে। ঋণ পুনর্গঠন করতে চিনের অনিচ্ছার কারণে দু’‌বার দ্বীপরাষ্ট্রটিকে দেওয়া আইএমএফের সময়সীমা উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অবশেষে, ভারত ও জাপান শ্রীলঙ্কাকে ঋণ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় চিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগিয়ে আসে। চায়না এক্সিম ব্যাঙ্ক তার ৪.১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুনর্গঠন করতে সম্মত হয়েছে, তবে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের মতো অন্য ঋণদাতারা এখনও কোনও আশ্বাস দেয়নি।

পাকিস্তানের সঙ্কটও আলাদা কিছু নয়। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই চিনের কাছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণী, যা দেশটির সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের ৩০ শতাংশ। চিন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হিসাবে থেকে গিয়েছে এবং চিন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে প্রায় ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চিনের সহায়তা কিন্তু রাজস্ব, সংস্কার বা আরও বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। চিন থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঋণ নেওয়ার পর পাকিস্তান এখন মরিয়া হয়ে আইএমএফের কাছে সাহায্যের জন্য পৌঁছচ্ছে। ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের একটি বেলআউট প্যাকেজের জন্য আইএমএফ–এর সঙ্গে অচলাবস্থার আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। আইএমএফের দাবি পূরণের জন্য পাকিস্তান কর বাড়িয়েছে, কিন্তু চিনের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণ পুনর্গঠন করাতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং চিন পাকিস্তানকে নতুন করে ঋণ দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে চিন ৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে বাণিজ্যিক ঋণ, মুদ্রা অদলবদল ও লোন রোলওভার অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত দুই মাসে চিন আরও ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ও লোন রোলওভারের প্রস্তাব দিয়েছে, যার ফলে পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ–সমস্যা আরও জটিল হবে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জন্য এই বছর ৪.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আইএমএফ স্থিতিশীলকরণ প্যাকেজ অনুমোদিত হয়েছে। আইএমএফ–এর কাছে ঢাকার যাওয়া ছিল একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ, কারণ বৈদেশিক ঋণ তার বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক, এবং দেশটি ক্রমাগত হ্রাসপ্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, শক্তির ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রপ্তানি হ্রাসের সাক্ষী। বাংলাদেশের ৭২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ আছে, যার মধ্যে আছে চিনের ৫ বিলিয়ন ডলার, যা তার মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ। চিনের কাছে ঋণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বেজিং যেহেতু দেশটির জ্বালানি ক্ষেত্র, ভৌত পরিকাঠামো, রেলপথ ও সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, তাই দেশটিকে আরও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

বেজিংয়ের বিশাল ব্যয়ের অ–সাশ্রয়ী প্রকল্পসমূহ, বাণিজ্যিক ঋণ, দুর্নীতিকে কাজে লাগানো, অস্বচ্ছ আলোচনা এবং ঋণ–কাঠামো পুনর্গঠন নিয়ে দ্বিধা, এসবই বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঋণ সমস্যা মোকাবিলার জন্য নতুন ঋণের প্রস্তাব এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে শুধু কাঠামোগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। চিনা ঋণের বৃহত্তর প্রভাব উপলব্ধি করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে এবং আইএমএফ–এর সাথে যুক্ত হতে রাজি করানোর জন্য পশ্চিমী দেশগুলি ও ভারত চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে চিনা ঋণের উপর তার অত্যধিক নির্ভরতা থেকে দূরে থাকতে বলেছে, এবং প্যারিস ক্লাব দেশগুলির সঙ্গে ভারতও শ্রীলঙ্কাকে ঋণ পুনর্গঠনের আশ্বাস দিয়েছে।

‌তা হলেও দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো চিন ও পশ্চিম উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বেজিং এই অঞ্চলে ভারত ও তার অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্য আরও স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব দেবে, এবং এর বিপরীতটিও ঘটবে। চিনের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধাও আছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য এবং আইএমএফ বেলআউট প্যাকেজগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় আখ্যানে আইএমএফ–এর কর্মসূচি, শর্তাবলি ও প্রেসক্রিপশনগুলিকে প্রায়ই ‘‌পশ্চিমী ঔপনিবেশিকতার’‌ কৌশল হিসাবে অভিহিত করা হলেও আইএমএফ এখন ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, বেজিংয়ের সহায়তা সংকীর্ণ ভূ–রাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পূরক হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি এবং ভূ–রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেজিংকে ব্রেটন উডস সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল, অতিমারি–পরবর্তী বিশ্বের বাস্তবতা কিন্তু অনেক বেশি জটিল। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্কট এই বিকল্প ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা এবং তার উপর নির্ভরতার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। চিনের বিকল্প এখন আর সর্বরোগহরা নয়, যেমনটা এক সময় মনে হয়েছিল।


এই ভাষ্যটি প্রথম ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এ প্রকাশিত হয়।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Authors

Aditya Gowdara Shivamurthy

Aditya Gowdara Shivamurthy

Aditya Gowdara Shivamurthy is an Associate Fellow with ORFs Strategic Studies Programme. He focuses on broader strategic and security related-developments throughout the South Asian region ...

Read More +
Harsh V. Pant

Harsh V. Pant

Professor Harsh V. Pant is Vice President – Studies and Foreign Policy at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations ...

Read More +