Author : Sarthak Shukla

Published on Nov 11, 2021 Updated 0 Hours ago

বর্তমানে যখন সারা পৃথিবী ‘দূষণমুক্ত শক্তির রূপান্তর’-এর লক্ষ্যে ছুটছে, তখন ভারতের উচিত সাধারণ মানুষ, গোষ্ঠী এবং সামাজিক পরিকাঠামোর উপরে এর প্রভাব খতিয়ে দেখা।

একটি ‘ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’: ভারতের দূষণমুক্ত শক্তির রূপান্তর কি আদৌ সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে?

পৃথিবীব্যাপী জীবাশ্মভিত্তিক শক্তি উৎপাদন থেকে সরে এসে দূষণমুক্ত পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মতো অজীবাশ্মভিত্তিক উৎসগুলির ব্যবহার শুরু হয়েছে অনেক দিন আগেই। ভারতও এই যাত্রায় পিছিয়ে নেই। ব্যবহারিক শক্তির উৎসের রূপান্তরের পথে দ্রুতগতিতে ভারতের এগিয়ে চলার উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রমাণ যথেষ্ট রয়েছে।

১২ আগস্ট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের ইনস্টলড ক্যাপাসিটির ক্ষেত্রে ভারত ১০০ গিগাওয়াটের সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইনস্টলড ক্যাপাসিটির প্রায় ২৬% আসছে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎসগুলি থেকে। এর সঙ্গে যদি জীবাশ্ম নির্ভর নয় এমন শক্তির উৎসগুলিকে, যেমন- পরমাণু এবং জলবিদ্যুৎ শক্তি ধরা হয়, তা হলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ইনস্টলড ক্যাপাসিটির প্রায় ৩৯% হয়ে দাঁড়ায়, যা ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন বা এন ডি সি-এর ৪০% লক্ষ্যমাত্রার অত্যন্ত কাছাকাছি।

যদিও ভারত অভূতপূর্ব ভাবে তার লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তবুও সাধারণ মানুষকে ‘স্থিতিশীল ও মানবিক রূপান্তর’-এর কেন্দ্রে রেখে রূপান্তরটিকে সহজতর করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব এখনও সুস্পষ্ট।

যদিও ভারত অভূতপূর্ব ভাবে তার লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তবুও সাধারণ মানুষকে ‘স্থিতিশীল ও মানবিক রূপান্তর’-এর কেন্দ্রে রেখে রূপান্তরটিকে সহজতর করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব এখনও সুস্পষ্ট। দুর্ভাগ্যবশত নীতি নির্ধারক, পরিবেশকর্মী, বিশেষজ্ঞ এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারেরা শক্তি রূপান্তরের এই প্রচেষ্টার সফলতার সূচক হিসেবে শুধু মাত্র তথ্য ও পরিসংখ্যানের দিকটি নিয়েই ডুবে আছেন।

নিম্নলিখিত তালিকাটি শক্তি রূপান্তরের ক্ষেত্রে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিসংখ্যানকে তুলে ধরছে।

বিভাগ বিশদে আনুমানিক হিসেব/তথ্য
ভারতের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে জি ডি পি-র নির্গমন তীব্রতা কমিয়ে ২০০৫ স্তরে নিয়ে আসা ৩৩%-৩৫% নির্গমন তীব্রতা
বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট শক্তি উৎপাদনের মধ্যে অজীবাশ্ম শক্তি উৎসের ভাগ ৪০%
পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস করতে গাছ তথা অরণ্যের পরিমাণ বাড়ানো ২৫০-৩০০ কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড
২০৩০ সালের মধ্যে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা ৪৫০ গিগাওয়াট
বিনিয়োগ জি ডি পি-র নির্গমন তীব্রতা ৩৩%-৩৫%-এ কমিয়ে আনার ভারতে এন ডি সি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে মূলধনের ব্যবহার ২.৫ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার
আগামী দুই দশকে দূষণমুক্ত শক্তি ভিত্তিক প্রযুক্তিগুলিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ আগামী দুই দশকের জন্য ১.৪ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার
২০৩০ সালে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎসের ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার
৩৫ গিগাওয়াট শক্তি সমৃদ্ধ ২৫ বছরের বেশি পুরনো কয়লা ভিত্তিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলি বন্ধ করে সঞ্চয়ের পরিমাণ ৩৭,৭৫০ কোটি টাকা
আনুমানিক কর্মসংস্থান জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতি গ্রহণ করার জন্য জীবাশ্ম ভিত্তিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল সংস্থাগুলিতে ২০৩০ সালের মধ্যে হওয়া ছাঁটাইয়ের সংখ্যা ৬০ লক্ষ
সঠিক জলবায়ু সংক্রান্ত নীতি গ্রহণ করে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তৈরি হওয়া কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লক্ষ (এর মধ্যে ২৫ লক্ষ কর্মসংস্থান পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রগুলির সঙ্গে যুক্ত)
ভারতব্যাপী কয়লাক্ষেত্রগুলিতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লক্ষ
ভারতব্যাপী পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রগুলিতে (২০১৭ সাল পর্যন্ত শুধু মাত্র পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত) কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৪ লক্ষ ৩০ হাজার
২০৩০ সালের মধ্যে যদি ভারত ৪৫০ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন করে, তা হলে কর্মসংস্থানের পরিমাণ হবে ৫ লক্ষ
২০৪২ সালের মধ্যে আশাবাদী কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রে তৈরি হওয়া নতুন কর্মসংস্থানের পরিমাণ ৪৫ লক্ষ

যদিও মুখ্য প্রতিবন্ধকতাগুলি এবং দৈনন্দিন জীবনে তাদের প্রভাব এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, যে কোনও রকম রূপান্তর বা স্থায়ী পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বা অংশীদারদের ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ও পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রশ্ন হল:

১) সমষ্টিগত ক্ষেত্রে এই রূপান্তরের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কী?

২) প্রত্যাশিত ফলাফলের সঙ্গে শক্তি রূপান্তরের পথে বাস্তবে ভারতের অগ্রগতির তুলনামূলক বিচারের ক্ষেত্রে যথার্থ নির্দেশক কোনগুলি?

৩) এই সমস্ত নির্দেশকের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া, লক্ষ্যমাত্রা এবং অংশীদারদের অবস্থান ঠিক কী রকম?

৪) শক্তি রূপান্তরের বর্তমান পরিকাঠামোর সীমার মধ্যেই কী ভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হওয়া সম্ভব এবং পাশাপাশি এই রূপান্তরের ইতিবাচক দিকগুলিকেই বা কী ভাবে কাজে লাগানো সম্ভব?

৫) ঠিক কোন কোন সাংগঠনিক এবং পদ্ধতিগত ব্যবস্থা অবলম্বন করলে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করা যাবে এবং অবাঞ্ছিত দিকগুলির সুরাহা করা সম্ভব হবে?

ভারতে শক্তি রূপান্তরের আবশ্যকীয় কৌশলবিধির একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই সমস্যা লক্ষ করা যায়। জাতীয় স্তরে শক্তির রূপান্তরের আকার, পদ্ধতি এবং প্রকৃতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষজনের মধ্যে বিস্তর মতবিরোধ ও বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে। পরিবেশকর্মী, স্থানীয় মানুষজন এবং শক্তি ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই একরোখা ভাবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির পরিমাণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ছুটে চলার ব্যাপারে তাঁদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি, কয়লা খনির ইউনিয়নগুলি, কয়লা সংস্থাগুলি এবং কয়লা ভিত্তিক শক্তি ক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা ‘কয়লার ব্যবহার খারাপ, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিই একমাত্র পথ’-এই প্রচলিত মানসিকতার বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেছে, যা বর্তমানে দেশব্যাপী দূষণমুক্ত শক্তি রূপান্তরের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সকল মানুষের কণ্ঠস্বরকে হয় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না অথবা বিনিয়োগ এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিত্যনতুন মাইলস্টোন পেরিয়ে যাওয়ার উচ্ছ্বাসের আড়ালে ইচ্ছাকৃত ভাবে তা চেপে যাওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শক্তি রূপান্তরের কর্মসূচির একেবারে প্রাথমিক স্তরে সংশ্লিষ্ট সকল সামাজিক স্তরের মানুষজনের মধ্যে মতের আদানপ্রদান এবং সকলের কাছে প্রক্রিয়াটির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্ট করে না তোলার অভাবকেই তুলে ধরেছে।

পরিবেশকর্মী, স্থানীয় মানুষজন এবং শক্তি ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই একরোখা ভাবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির পরিমাণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ছুটে চলার ব্যাপারে তাঁদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, শুধু মাত্র পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের জীবনে শক্তি রূপান্তরের প্রভাব পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, একাধিক রিপোর্টে দেখানো হচ্ছে যে, দূষণমুক্ত শক্তি রূপান্তরের ফলে যে সংখ্যক গ্রিন জব বা নতুন কর্ম সংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, তা কয়লা সংক্রান্ত কাজের সুযোগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি বড় রকমের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কারণ দূষণমুক্ত শক্তি রূপান্তরের সঙ্গে জড়িত সকল কাজের সুযোগকেই সমান মর্যাদাপূর্ণ বলে ভাবা হচ্ছে, যা আদতে ঠিক নয়। এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের প্রকল্পগুলিতে যে সব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, সেগুলি মূলত নির্মাণ কাজের আওতায় পড়ে। স্বভাবতই এই কাজগুলি মরসুমি, অত্যন্ত অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষাবিহীন, অসংগঠিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলির সঙ্গে শিশুশ্রম, শ্রমিকদের তীব্র শোষণ ও অন্যান্য অমানবিক বাস্তবতা জড়িয়ে থাকে। যদিও এর মানে এই নয় যে, কয়লাক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত সকল কাজের সুযোগগুলি অত্যন্ত মানবিক, কিন্তু কর্মসংস্থানের খারাপ সুযোগের বদলে অন্য একটি নিম্নতর সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া ‘সামাজিক ন্যায়’ বা সকলের জন্য সমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগের ধারণার পরিপন্থী। স্থিতিশীল রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত সকল বিনিয়োগকারীরই তাদের বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া কাজের সুযোগের গুণগত মানের ব্যাপারটিতে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রকল্প হওয়া মাত্রই তা সঠিক পারিশ্রমিক বিশিষ্ট কর্মসংস্থান, শ্রমিকের দক্ষতা ও উপার্জন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি এবং কর্মীদের পেশাগত বিপত্তি থেকে রক্ষা করার মতো দিকগুলি সুনিশ্চিত করে না। ফলে এই সকল কর্মীদের মধ্যে কখনওই ঐক্যের মতো ব্যাপারটিকে উৎসাহ দেওয়া হয় না। এবং শ্রমিকদের সুষ্ঠু জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষার বলয়ের অস্তিত্বও গড়ে তুলতে সাহায্য করে না প্রকল্পগুলি। অন্য দিকে পরিবেশগত কারণে কয়লাক্ষেত্রের এক ধূসর ছবি জনসমক্ষে তুলে ধরা হলেও কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং জনসমাজের ওপর এর প্রভাবকে এত সহজে নাকচ করা যাবে না। সাবেক ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত সকল প্রকার কর্মসংস্থানের পক্ষপাতহীন তুলনা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে বর্তমানে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি থেকে অতীতের নেতিবাচক দিকগুলি শুধরে নেওয়া যায়। এবং আগামী দিনে শক্তিক্ষেত্রের বাস্তুতন্ত্রের সঠিক রূপায়ণের পথে সেগুলি অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।

পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের প্রকল্পগুলিতে যে সব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, সেগুলি মূলত নির্মাণ কাজের আওতায় পড়ে। স্বভাবতই এই কাজগুলি মরসুমি, অত্যন্ত অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষাবিহীন, অসংগঠিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলির সঙ্গে শিশুশ্রম, শ্রমিকদের তীব্র শোষণ ও অন্যান্য অমানবিক বাস্তবতা জড়িয়ে থাকে।

তৃতীয়ত, শুধু মাত্র পরিসংখ্যান বা পরিমাণগত সূচকগুলির দ্বারা বিদ্যমান কয়লা ক্ষেত্রে ও কয়লার উপর নির্ভরশীল শক্তিক্ষেত্রগুলির দূষণের হার কমানো এবং দূষণমুক্ত শক্তি রূপান্তর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলির অভাবকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। একাধিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের বিভিন্ন অংশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা বায়ুপ্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য করা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াটি বহুলাংশেই স্থানীয় অধিবাসীদের মতবিরুদ্ধ এবং সেগুলিতে জনসাধারণের অংশগ্রহণের ব্যাপারটিকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। একদিকে যখন রাষ্ট্র দ্বারা জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, অন্য দিকে তখন স্থানীয় মানুষেরা সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগের পার্থক্যটুকু নিয়েও অবগত নন। অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের এই অসমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজে লাগাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং আইনের জোর খাটিয়ে জমি অধিগ্রহণ ও পরিকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত সকল ক্ষোভ এবং প্রতিরোধের কণ্ঠ রোধ করছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গোষ্ঠীগুলি।

একই রকম ভাবে, পাবলিক ইউটিলিটি ল্যান্ড বা জনসাধারণের ব্যবহার্য জমি যা ‘জনসাধারণ’ দ্বারা বাসস্থান নির্মাণ, কৃষিকাজ এবং অন্যান্য কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলি অধিগ্রহণের আগেও স্থানীয় মানুষজনকে কোনও রকম তথ্যই দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের মতামত জানারও প্রয়োজন বোধ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনেক ক্ষেত্রেই যখন এই সকল মানুষদের সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে, তা হয়েছে ব্যক্তিগত সংস্থাগুলির এবং স্থানীয় মানুষদের তরফে নির্বাচিত এমন প্রতিনিধিদের মধ্যে, যে বা যাঁরা তলে তলে বেসরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলে প্রকল্প নির্মাণে কাঁচামাল জোগানের দায়িত্ব পাওয়ার লোভে। বিনিময়ে স্থানীয় মানুষদের ভুল বুঝিয়ে তাঁদের সমর্থন ও জমি তুলে দেয় কোম্পানিগুলির হাতে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রাজস্থানের জয়সলমির জেলায় এ রকমই একটি পাবলিক ইউটিলিটি ল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু কোর্টের আদেশ অমান্য করে জোর করে নির্মাণকাজ চলছে এবং এখনও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত কোম্পানির কর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা ভয় দেখিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে মানুষের ক্ষোভের প্রেক্ষিতে এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই ঘটনাটি থেকে দূষণমুক্ত শক্তির রূপান্তরের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যা পরিসংখ্যানগত সূচকগুলির আড়ালে ঢাকা পড়েছে বার বার। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি প্রায়শই স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনও লিখিত চুক্তি ছাড়াই মৌখিক ভাবে কর্ম সংস্থানের আশ্বাস দেয়। কিন্তু পরবর্তী কালে এই প্রতিশ্রুতিগুলি রাখা হয় না এবং স্থানীয়দের নির্মম ভাবে ঠকানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্থাগুলি স্থানীয়দের পাহারাদার বা সুরক্ষাকর্মী পদে অস্থায়ী ভাবে বহাল করে। কখনও কখনও সংস্থাগুলি লিখিত চুক্তিপত্র (কর্মসংস্থানের মৌখিক চুক্তির বদলে) প্রদান করে, যাতে এক বার কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয়রা কাজের ক্ষেত্রে আর প্রাধান্য পাবে না, এ কথাটি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয়দের কাজে বহাল না করার অছিলা স্বরূপ পরিষেবা সংক্রান্ত কাজে উচ্চ গুণমান বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া (কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকতে গেলে প্রতি মাসে গাড়ির সার্ভিস করাতে হবে), ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব ও অন্যায্য নিয়ম খাটানো (কোনও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে বরখাস্ত করা), অথবা পুরো সময়ের কর্মী হিসেবে স্থায়ী নিয়োগের বদলে শুধু মাত্র ঠিকাদারের মাধ্যমেই অস্থায়ী ভাবে মানুষদের কাজে বহাল করা যাতে সহজেই তাঁদের ছাঁটাই করা যায়। এই ভাবেই যে কোনও উপায়ে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে দূষণমুক্ত শক্তি রূপান্তরের কর্মসূচিগুলিও সেই পথেই হাঁটছে যে পথে এত দিন ধরে চলে এসেছে শোষণকারী সংস্থা ও পুঁজিবাদীরা।

শ্রমিক, পরিবেশকর্মী, শক্তি রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, রাজ্যস্তরে কর্মরত কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর, নোডাল এজেন্সি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী সংস্থা, আঞ্চলিক প্রতিনিধি এবং চিন্তাবিদ সকলকেই একই ছাতার তলায় আসতে হবে এবং সমষ্টিগত ভাবে শক্তি রূপান্তরের নানা আঙ্গিকগুলিকে সুনির্দিষ্ট আকার দিতে হবে।

তাই শক্তির রূপান্তরকে প্রকৃত অর্থে ‘মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত’ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দীর্ঘ দিন যাবৎ অবদমিত মানুষের মধ্যে নিরপেক্ষ, সর্বাত্মক ও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। শ্রমিক, পরিবেশকর্মী, শক্তি রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, রাজ্যস্তরে কর্মরত কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর, নোডাল এজেন্সি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী সংস্থা, আঞ্চলিক প্রতিনিধি এবং চিন্তাবিদ সকলকেই একই ছাতার তলায় আসতে হবে এবং সমষ্টিগত ভাবে শক্তি রূপান্তরের নানা আঙ্গিকগুলিকে সুনির্দিষ্ট আকার দিতে হবে।

এবং এই সর্বস্তরীয় সামাজিক আলোচনা শুরু করার আগে রূপান্তরের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি মানুষকে আত্মবীক্ষণ করতে হবে। প্রত্যেককে পক্ষপাতিত্ব ত্যাগ করে নিজ উদ্দেশ্য সম্পর্কে খোলাখুলি ভাবে সকলের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং পাশাপাশি শুনতে হবে একে অন্যের সুবিধে-অসুবিধের কথা যাতে আলোচনাগুলি বাগযুদ্ধে পরিণত না হয়। বরং সেগুলি যেন হয়ে ওঠে আগামী দিনের এক মানবিক ও স্থিতিশীল রূপান্তরের পথের সোপান। এ রকমটা করা সম্ভব হলে তবেই মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের কাঠামোয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায়ই উপেক্ষিত স্তম্ভ ‘সামাজিক আলোচনা’র সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তি রূপান্তরের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই ধরনের রূপরেখার অবলম্বন এমন এক রূপান্তর সুনিশ্চিত করবে যার কেন্দ্রে থাকবে সামাজিক, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সাম্য।


এই প্রতিবেদনের লেখকেরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাবলিক পলিসি কনসালট্যান্ট এবং তাঁরা স্থিতিশীলতা, সর্বজনীন অর্থনীতি এবং প্রতিরোধের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করছেন

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.