Author : Sushant Sareen

Published on Nov 19, 2021 Updated 0 Hours ago

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কি তাঁর প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মাঝে নিজের মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হবেন?

পাকিস্তানে প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক ভাঙ্গনের মুখে

পাকিস্তানে ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স-এর (আই এস আই) ডিরেক্টর জেনারেল (ডি জি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে পেশোয়ারে কোর কম্যান্ডার অফ ইলেভেন কোর পদে নিযুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁর জায়গায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আঞ্জুমকে ডি জি-আই এস আই হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আই এস পি আর) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ স্তরে এই রদবদলের ঘোষণা করার দু’সপ্তাহ পরেও নতুন নিয়োগ নিয়ে সামরিক বাহিনী ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চাপানউতোর শেষ হয়নি।

যদিও মন্ত্রীরা দাবি করেছেন যে, বিষয়টির ইতিমধ্যেই সমাধান হয়ে গিয়েছে, তবে বাস্তব চিত্রটা অন্য রকম। সেনা প্রধান জেনারেল কামার বাজওয়ার পছন্দের ব্যক্তিকেই পরবর্তী আই এস আই প্রধান হিসেবে ‘বেছে নেওয়ার’ সুযোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাময়িক ভাবে ‘মুখরক্ষা’ করা হলেও যা ক্ষতি হওয়ার ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সংহতির সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার এবং সামরিক প্রধানদের মধ্যেকার সম্পর্কের ফাটল প্রকাশ্যে এসেছে। এই নাটকীয় পরিস্থিতির প্রধান কুশীলব ইমরান খান, জেনারেল কামার বাজওয়া অথবা ফয়েজ হামিদ… কেউই এই ঘটনা থেকে অক্ষত বেরিয়ে আসতে পারবেন না। আগামিদিনে ইমরানের দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় আসা, বাজওয়ার কাজের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো এবং বাজওয়ার উত্তরসূরি হিসেবে আগামী বছর হামিদের নির্বাচনের মতো তিন জনেরই উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।ল ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের বেশ কিছু মন্ত্রী এ বিষয়ে।

ক্ষমতাসীন দলের বেশ কিছু মন্ত্রী এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন এবং ইমরান খান শুধু মাত্র সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল হয়ে থাকতে রাজি নন, এমনটা বললেও বেশির ভাগ মন্ত্রীই ইমরানের নিজের তৈরি করা এই সঙ্কটকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আপাতত প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্কের ফাট মুখ খুলেছেন এবং ইমরান খান শুধু মাত্র সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল হয়ে থাকতে রাজি নন, এমনটা বললেও বেশির ভাগ মন্ত্রীই ইমরানের নিজের তৈরি করা এই সঙ্কটকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য দিকে একজন প্রাক্তন আই এস পি আর প্রধানের বলা ‘নীরবতাও এক ধরনের অভিব্যক্তি’: যেন এই কথা মাথায় রেখেই এবং সমগ্র পরিস্থিতি ভাল ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেনাবাহিনীর তরফে নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। এটাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, এই জগাখিচুড়ি শাসনের দিন ঘনিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে নির্ধারিত পরবর্তী নির্বাচনে ইমরান খানের জেতা তো দূরের কথা, এই অনিশ্চয়তার আলোকে তিনি তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েই এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।

ইমরান খানের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ দেখতে চাওয়ার মতো অনেক কারণ সেনাবাহিনীর কাছে আছে। ইমরানের শাসনকাল রীতিমতো এক সর্বাত্মক বিপর্যয়ের ছবি তুলে ধরে। দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বসে পড়েছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাটিকে বিতর্কিত করে তুলেছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সমাজের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির সঙ্গে কার্যত সমার্থক হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক ভাবে ইমরান আমেরিকাকে রাগিয়ে দিয়েছেন, আরবকে বিচ্ছিন্ন করেছেন এবং চিনের বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বকালীন তলানিতে এসে ঠেকেছে। এবং রাজনীতির অন্দরমহলে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার একাধিক চেষ্টা করা হলেও ইমরান খান তাতে জল ঢেলে দিয়েছেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর তরফে এই সব কিছুই উপেক্ষা করা যেত যদি ইমরান খান তাঁর ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে সামরিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করা এবং সামরিক প্রধানদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার মতো কাজ না করতেন। এটি এমন এক অপরাধ যা পাকিস্তান সেনার পক্ষে ক্ষমা করা বা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এক জন আই এস আই প্রধানের নিয়মমাফিক বদলির মতো একটি আপাত সাধারণ বিষয় নিয়ে সেনাবাহিনীকে প্ররোচিত করা এবং নেতিবাচক অবস্থান নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ঠিক কোন কারণে ইমরান নিয়েছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি কি এক সাময়িক মতিভ্রম যা অনভিপ্রেত ভাবে একটি তীব্র প্রশাসনিক-সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে? না কি যে শক্তির ভিত্তিতে তাঁর সরকার ‘নির্বাচিত’ হয়েছিল, সেটিকে প্ররোচিত করার (বা সেটি দ্বারা প্ররোচিত হওয়ার) উন্মাদনার পিছনে অন্য কোনও পরিকল্পনা ছিল? নিজের পায়ে কুড়ুল মারার মতো এই অত্যাশ্চর্য ঘটনার পিছনে প্রায় অর্ধ ডজন কারণ আছে, যার প্রত্যেকটিই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এবং যেগুলির উপাদান এই সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছে।

ভুল বোঝাবুঝি: এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি যা মুখোমুখি সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। আপাত ভাবে অন্তত গত বছরের গ্রীষ্মকাল থেকেই সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া ইমরান খানের সঙ্গে ফয়েজ হামিদের বদলির ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন। আই এস পি আর-এর তরফে নতুন আই এস আই প্রধান নিয়োগের ঘোষণাটি ইমরান খানের সঙ্গে পরামর্শের পরেই করা হয়েছিল এবং তিনি হামিদের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে কোনও আপত্তি তোলেননি। কিন্তু এই ঘোষণার পরেই সেনাপ্রধানকে অস্বস্তিতে ফেলে ইমরান তাঁর মত পরিবর্তন করেন। সেই মুহূর্ত থেকেই প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান নিজেদের জায়গায় অনড় থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং উভয় পক্ষের সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করে। অবশেষে ইমরান খান দ্বারা পরবর্তী আই এস আই প্রধান হিসেবে জেনারেল আঞ্জুমের নির্বাচিত হওয়ার শর্তে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা হলেও কেউই সেই সিদ্ধান্ত মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।

কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এক জন আই এস আই প্রধানের নিয়মমাফিক বদলির মতো একটি আপাত সাধারণ বিষয় নিয়ে সেনাবাহিনীকে প্ররোচিত করা এবং নেতিবাচক অবস্থান নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ঠিক কোন কারণে ইমরান নিয়েছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সরকারি আধিপত্য জাহির করা: ইমরান খান প্রশাসনিক আধিপত্য সুনিশ্চিত করতে চাইছিলেন। যাঁদের ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সামরিক প্রধানদের উপরে আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা কিছুটা হাস্যকরই বটে। প্রকৃত পক্ষে তিনি কেবল সামরিক বাহিনীর সমর্থনের কারণেই পদে টিকে থাকতে পেরেছেন এবং ২০২৩ সালে নিজের পুনর্নির্বাচন সুনিশ্চিত করার জন্য সামরিক বাহিনীর অবলম্বন করা অসৎ কৌশলের উপরেই নির্ভরশীল। তবুও সেনাবাহিনীর সঙ্গে এই দ্বৈরথ শুরু হওয়ার পর থেকে ইমরান অন্তত দু’দফায় ইসলামিক ইতিহাস থেকে এমন মন্তব্য করেছেন, যাতে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছে এবং তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে আরও বেশি করে প্রশ্ন উঠে এসেছে। এই বিতর্ক শুরু হওয়ার কিছু দিন পরে ইমরান খলিফা উমরের প্রসঙ্গ তোলেন এই বলে যে খলিফা একবার তাঁর শীর্ষ সেনাপতি খালিদকে অন্য কারও হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে বলেছিলেন। এক জন সামরিক কমান্ডারকে (জেনারেল বাজওয়া?) চাইলেই যে দেশের শাসক অপসারণ করতে পারেন, এটি সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। পরবর্তী কালে ইমরান মদিনায় এক জন সামরিক প্রধানের ভাল কাজ করার সুবাদে পদোন্নতি হওয়ার উদাহরণ টেনে এনে আফগানিস্তানের ‘জয়ের’ প্রেক্ষিতে হামিদকে সামরিক প্রধানের পদে মনোনীত করার বিষয়টির ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইমরানের যদি বাস্তবতার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন না হয়ে গিয়ে থাকে এবং তিনি যদি পাকিস্তানকে রিয়াসত-ই-মদিনা হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়ে ভাবেন যে, দেশের সামরিক প্রধানরা তাঁর আদেশ মেনে চলবেন, তা হলে তিনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। তিনি জানেন না যে, তাঁর এই ঔদ্ধত্যের ফলে নিজেই সামরিক প্রধানদের চক্ষুশূল হয়ে উঠছেন যা আগামিদিনে তাঁর নিজের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না।

রাজনৈতিক অনুচর: এ কথা সকলেই জানেন যে, ইমরান খান চেয়েছিলেন ফয়েজ হামিদই আই এস আই-এর ডি জি পদে থাকুন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে, আফগানিস্তানে অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত হামিদের পদে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু হামিদকে পদে রাখার ব্যাপারে তাঁর নাছোড়বান্দা মনোভাব প্রতিফলিত হয় যখন তিনি আই এস আইকে একটি ‘কোর’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও দেন; যার ফলে হামিদ আগামী নভেম্বরে জেনারেল বাজওয়ার ক্ষমতার দ্বিতীয় দফা শেষ হওয়ার পরেই সেই পদে আসীন হওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারেন। হামিদকে ক্ষমতায় আনার জন্য ইমরানের মরিয়া প্রচেষ্টার পিছনে জাতীয় স্বার্থ প্রায় নেই বললেই চলে এবং তা সম্পূর্ণ ভাবে ইমরানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ প্রণোদিত, এ কথা বললে ভুল হবে না। ইমরানকে ক্ষমতায় আনতে এবং তাঁকে ক্ষমতায় বহাল রাখতে গত পাঁচ বছর যাবৎ প্রথমে আই এস আই-এর দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধারী ব্যক্তি এবং পরবর্তী কালে প্রধান হিসেবে হামিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি কার্যত ইমরান খানের ‘হেঞ্চম্যান অ্যান্ড হিটম্যান’ অর্থাৎ রাজনৈতিক অনুচর এবং ডান হাতের ভূমিকা পালন করেছিলেন। হামিদের পূর্বসূরি লেফটেন্যান্ট জেনারেল অসীম মুনিরকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় যখন তিনি ইমরান খানের রাজনৈতিক ডামাডোল সামলানোর কাজে অসম্মত হন। হামিদের এ বিষয়ে কোনও অনুযোগ ছিল না। প্রকৃত পক্ষে ইমরান খানের এখন তাঁকে আগের চেয়েও অনেক বেশি করে প্রয়োজন যাতে নতুন নির্বাচনী আইনের বলপূর্বক বাস্তবায়ন, পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের পছন্দের আধিকারিকদের বহাল, তাঁর নীতির বিরোধী বিচারকদের অপসারণ এবং প্রতিপক্ষকে কালিমালিপ্ত করে পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করার মতো অভিসন্ধি চরিতার্থ করা যায়।

এ কথা সকলেই জানেন যে, ইমরান খান চেয়েছিলেন ফয়েজ হামিদই আই এস আই-এর ডি জি পদে থাকুন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে, আফগানিস্তানে অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত হামিদের পদে থাকা প্রয়োজন।

এই গুজব শোনা যাচ্ছিল যে, পরের বছর বাজওয়ার মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে অগ্রাধিকারের তালিকায় হামিদ চতুর্থ স্থানে থাকলেও ইমরান খান তাঁকেই শীর্ষ ক্ষমতায় বহাল করতে চান। হামিদের উপর ইমরান খানের এই নির্ভরতা সামরিক বাহিনী ভাল চোখে দেখছে না এবং তাঁর এই প্রচেষ্টা সামরিক পদগুলির এমন এক রাজনীতিকরণ যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চরম অপছন্দের কারণ। বাজওয়া এটা জানতেন; হামিদকে আই এস আই থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি ‘কোর’ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া তাৎক্ষণিক সমস্যার একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান হিসেবে দেখা যেতে পারে। শুধু মাত্র ইমরান খানের নিরাপত্তাহীনতার ভাবনা ব্যাপারগুলিকে এমন এক পর্যায়ে এনে জটিল করে তুলেছে যেখানে তিনি এখন হামিদকে আগের চেয়ে আরও বেশি বিতর্কিত করে তুলেছেন এবং পরবর্তী প্রধান হিসেবে সহকর্মীদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছেন। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি সেনাবাহিনীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আগামিদিনে সঙ্গত কারণেই কৌশল ও কারসাজির সাহায্যে প্রবীণ সামরিক প্রধানরা ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার পন্থা অবলম্বন করতে পারেন এবং এর ফলে তাঁরা যে শুধু পরস্পরের ক্ষমতা খর্ব করারই চেষ্টা করবেন তা নয়, বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেও সমস্যা তৈরি করবেন। যদি এই আশঙ্কাকে অঙ্কুরে না বিনষ্ট করা হয়, এটি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যেখানে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতি নষ্ট হতে শুরু করবে এবং পাক সেনাবাহিনীর দশা অনেকটা পঞ্জাব পুলিশের মতো হবে। ইতিমধ্যেই খবর আসতে শুরু করেছে যে, বিতর্কিত প্রাক্তন আই এস পি আর প্রধান আসিফ গফুর পরবর্তী আই এস আই প্রধান হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। গফুর এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই ইমরান খানের স্ত্রীর একনিষ্ঠ অনুগামী হয়ে উঠেছেন এবং গফুর হামিদের পদ দখলের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন।

গার্হস্থ্য দৈবাদেশ: ইমরান খানের বাড়িতে ওঝা — বাস্তবে তাঁর স্ত্রী বাশরা ওরফে পিঙ্কি পিরনি — নিয়মিত জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জাদুবিদ্যা চর্চা করেন এবং রাষ্ট্র সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পিছনে তাঁর প্রভাব নাকি সুস্পষ্ট। এমনটাও শোনা যায়, পিরনি কাচের গোলক দেখে ভবিষ্যদ্বাণী বা ক্রিস্টাল বল গেজিং করার পরেই পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এবং পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের ‘প্রধানমন্ত্রী’ নির্বাচিত হন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই ভদ্রমহিলা ইমরানকে সতর্ক করেছিলেন যে, হামিদকে আই এস আই-এর শীর্ষ পদে বহাল রাখতে হবে অন্তত ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখ পর্যন্ত, যে দিন একটি সূর্যগ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইমরানের দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মীদের স্থানান্তর এবং বদলির কার্যক্রম জ্যোতিষ গণনা মেনে চলে না, অন্তত এখনও অবধি নয়। এমনও গুজব উঠেছে যে, হামিদের উত্তরসূরির নামের আদ্যাক্ষর ইতিমধ্যেই ইমরানকে জানানো হয়েছে।

খামখেয়ালিপনাকে প্রশ্রয় দেওয়া: ইমরানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তারা দুধে-ভাতে বলে মনে করেন। এখনও পর্যন্ত তিনি সাংঘাতিক আপত্তিকর সব কথা বলেছেন এবং একাধিক গুরুতর ভুল করেছেন। এগুলির মধ্যে ওসামা বিন লাদেনকে শহিদ বলা, মার্কিন বিদেশমন্ত্রীর মন্তব্যকে ‘অজ্ঞ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া, সেনাবাহিনী এবং আই এস আই-তে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসবাদীদের থাকার কথা স্বীকার করা, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তবুও সামরিক শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর অবিবেচকের মতো আচরণ এবং সীমা লঙ্ঘনের কীর্তিকে কখনও বাধা দেননি। সেনাপ্রধানের তরফে তাঁকে পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ইমরান তেমনটা করতে রাজি হননি। এত কিছুর পরেও যদি ইমরান আরও এক বার সামরিক শীর্ষ নেতৃত্বের কথা অবমাননা করে পার পেয়ে যাওয়ার কথা ভেবে থাকেন, তা হলে কিছু বলার থাকে কি?

গফুর এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই ইমরান খানের স্ত্রীর একনিষ্ঠ অনুগামী হয়ে উঠেছেন এবং গফুর হামিদের পদ দখলের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন।

টি আই এন  ফ্যাক্টর: ইমরান তাঁর কয়েক জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এমনটাই বলেছিলেন যে, তাঁকে ছাড়া সেনাবাহিনীর কাছে কোনও উপযুক্ত রাজনৈতিক বিকল্প নেই। কারণ, তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া কোনও বড় ব্যাপার না হলেও তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনও যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া কার্যত অসম্ভব। নওয়াজ শরিফকে অন্তর্ভুক্ত না করে মন্ত্রিসভায় কোনও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন করা দুষ্কর। বিশেষ করে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ নিয়ে নওয়াজ এবং তাঁর মেয়ে মরিয়মের তীব্র ধিক্কারের পরে। এমনটা মুখে বলার চেয়ে কাজে করা অনেকটাই কঠিন বলে মনে হয়। যদিও নওয়াজ এবং মরিয়মের সঙ্গে তলে তলে ইমরানের সন্ধির সম্ভাবনা থাকলেও সেনাবাহিনী তাঁদের অপমানের প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর থাকবে। ইমরান যা ভুলে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে তা হল, সেনাবাহিনী যখন এক জন রাজনৈতিক নেতাকে শূলে চড়াতে উদ্যত হয়, তখন সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক সৌজন্য কোনওটাই কাজে লাগে না। এবং তাঁরা আইনি, রাজনৈতিক এবং বিচার বিভাগীয়… যে কোনও সূত্র ধরেই রাজনৈতিক দায়কে বর্জন করতে পারে। ইমরানের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না, তা তিনি যেমনটাই ভেবে থাকুন না কেন। এবং যদি সব পন্থাই ব্যর্থ হয়, তা হলেও ‘ওয়ান জিপ অ্যান্ড টু ট্রাকস’ সমাধান বা অভ্যুত্থানের পথ খোলাই থাকছে।

আগামী কয়েক সপ্তাহেই এ বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যাবে যে, পাকিস্তানে রাজনীতির জল কোন দিকে গড়াচ্ছে। রক্তের গন্ধ পাওয়া শিকারী পশুর মতোই ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতা করা পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন হঠাৎ করেই আবার সর্ব স্তরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির খবর ও নির্বাচন কমিশনে বৈদেশিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলাগুলি পুনরায় শুরু করা হতে পারে। এত দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা তেহরিক-এ-লাব্বাইক পাকিস্তান আরও এক বার লাহোরে ধর্নায় বসেছে। বেলুচিস্তানে ইতিমধ্যেই একটি অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। পার্লামেন্টে এবং পঞ্জাবে অসন্তোষের কারণগুলি আড়াল থেকে প্রকাশ্যে আসতে পারে এবং বর্তমান রাজনৈতিক শাসনের মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারে। কারণ প্রতি বারের মতো এ বারও সরকারকে বাঁচাতে আইএসআই কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।

আগামিদিনে কী ঘটতে চলেছে, এগুলি সে সম্পর্কে বলা কিছু লক্ষণ মাত্র। বিপক্ষ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তলে তলে কথাবার্তা শুরু করে, এবং আইনসভায় সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটিয়ে তার পর সামনের বছরের শুরুতে নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করে সেনাবাহিনী একটি মসৃণ রূপান্তর সুনিশ্চিত করতে চাইছে। তা হলে ভবিতব্য কী? ইমরান খানের পক্ষে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের আনুষ্ঠানিক মেয়াদের অবশিষ্ট ২২ মাস টিকে থাকতে পারা খুবই কঠিন।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.