-
CENTRES
Progammes & Centres
Location
একতরফা শুল্ক আরোপ এবং অন্যান্য প্রাক–অতিমারি বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছিল, আর এখন নজর ঘুরে গিয়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির দিকে।
২০১৮ সাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ ছিল। সেই সময় আপাতভাবে যা তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’কে বিপদের মুখে ফেলছে সেই ধরনের চিনা পণ্য আমদানি কম করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চিনের বিভিন্ন পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে এর প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ‘বিদেশি দেশগুলির ভর্তুকিপ্রাপ্ত সস্তা ধাতু’, যা নিয়ে ডাম্পিং–এর অভিযোগ উঠেছিল, তা থেকে প্রতিযোগিতা সীমিত করা।
চিন প্রতিশোধ নেয় ২০১৭ সালে চিনে রপ্তানিকৃত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ১২৮টি মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করে। এর থেকে অবশেষে এই দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অন্যান্য বাণিজ্য দ্বন্দ্ব, যেমন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে, এর পরে শুরু হয়েছিল। যেহেতু শুল্ক আরোপ ছিল পণ্যনির্দিষ্ট, দেশনির্দিষ্ট নয়, অন্য দেশগুলিও শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে যোগ দেয়। ভারতও, সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে, এই বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে ২৯টি প্রধান মার্কিন আমদানির উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে।
আপাতভাবে যা তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’কে বিপদের মুখে ফেলছে সেই ধরনের চিনা পণ্য আমদানি কম করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চিনের বিভিন্ন পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করে।
মূলত ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডবলিউ টি ও) পরিচালিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এই ঘটনা পরম্পরায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে অতিমারি ছড়িয়ে পড়ার পরে ইতিমধ্যেই আঘাতপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে শুরু করে, কারণ লকডাউনগুলি পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করেছিল।
২০০৮–০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের (চিত্র ১) পরবর্তী সময়ের তুলনায় ২০২১ সালে পণ্যদ্রব্য ও বাণিজ্যের পরিমাণ উভয়েরই যথেষ্ট ভাল পুনরুজ্জীবন হয়েছে। যাই হোক, এই পুনরুজ্জীবন প্রধানত পণ্য বাণিজ্য দ্বারা চালিত হয়েছে, আর পরিষেবাগুলি দমিত থেকে গিয়েছে।
চিত্র ১: ২০০৮–০৯ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের তুলনায় কোভিড–১৯ অতিমারির সময় বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য অনেক বেশি উজ্জীবিত
সামগ্রিক বাণিজ্য পুনরুজ্জীবনের ছবি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নতা প্রদর্শন করে। যেখানে এশিয়া রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যাবর্তন বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছে, পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা রপ্তানিতে সবচেয়ে কম পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। আমদানির দিক থেকে পশ্চিম এশিয়া, কমনওয়েলথ অফ ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস (সি আই এস) দেশগুলি ও আফ্রিকার পুনরুদ্ধার সবচেয়ে ধীরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেলনির্ভর রপ্তানিকারীরা সহ এই অঞ্চলগুলি ২০২০ অতিমারি প্ররোচিত মন্দার সময় পণ্যদ্রব্য রপ্তানি এবং আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই বিশাল পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এই অঞ্চলগুলি এখনও সেই ঘাটতিগুলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার তুলনামূলকভাবে আমদানির ভাল পুনরুজ্জীবন আংশিকভাবে নিম্ন ভিত্তি প্রভাবের ফলাফল, কারণ কিছু বড় অর্থনীতি ইতিমধ্যেই ২০১৯–এ মন্দার মধ্যে ছিল।
চিত্র ২: অতিমারির পর বিশ্ব বাণিজ্য বাড়লেও ২০২২–এ তার গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।
২০২১ সালের প্রথমার্ধে পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যের পরিমাণ একটি শক্তিশালী বৃদ্ধি দেখায়, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে তা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংক্রান্ত রাষ্ট্রপুঞ্জ সম্মেলন (ইউ এন সি টি এ ডি বা আঙ্কট্যাড)-এর অনুমান সেই দিকে ইঙ্গিত দেয় (চিত্র ২)।
২০২১ সালে চিনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি পেলেও মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। বেশিরভাগ স্বল্পোন্নত দেশ (এল ডি সি) এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিও ২০২১ সালে বাণিজ্য ঘাটতির ক্ষেত্রে আরও খারাপ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে (চিত্র ৩)। এটি স্পষ্টভাবে বিশ্ব বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের অসমতা দেখায়।
চিত্র ৩: বিশ্ব বাণিজ্য বাড়ছে, বাণিজ্য অসমতাও বাড়ছে
অতিমারির আগে একতরফা শুল্ক আরোপ এবং অন্য বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাগুলি শুধু বাণিজ্য উত্তেজনা তৈরি করেনি, বরং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার লালিত বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকেও ক্ষুণ্ণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সূচনা থেকে সমস্ত ধরনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে অসাধারণ বৃদ্ধি হয়েছে। সংস্থাটি বিভিন্ন দেশে শুল্ক হ্রাস ও বাণিজ্য স্বাচ্ছন্দ্য আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে চ্যুতি রেখা বা ফল্ট লাইনগুলো দেখা দিতে শুরু করে কিছুদিন পর থেকে। একটি মুখ্য উদাহরণ হল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া। বছরের পর বছর মার্কিন চাপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আপিল–ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার জায়গায় নিয়ে এসেছে। ২০১৬ সালে বারাক ওবামা প্রশাসন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অ্যাপিলেট বডিতে দক্ষিণ কোরিয়ার এক বিচারকের পুনর্নিয়োগ আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওবামার উত্তরাধিকারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারও এই অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল, এবং বিচারক নিয়োগে বাধা আরও জোরদার করেছিল। ফলস্বরূপ, অ্যাপিলেট বডিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে, যেহেতু আরও দুইজন বিচারকের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং ডিসেম্বর ২০১৯–এর মধ্যে শুধু একজন সক্রিয় বিচারক থেকে গিয়েছেন। এর সূচনা থেকে সাত জন বিচারক এই সংস্থায় কাজ করতেন, এবং নতুন আপিল পর্যালোচনা করার জন্য ন্যূনতম তিনজন বিচারকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। জো বাইডেন প্রশাসনও নতুন নিয়োগ আটকে রেখেছে, এবং অ্যাপিলেট বডি পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে ।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে এই ধরনের বৃহত্তর বৈশ্বিক অনুভূতিগুলিকে জায়গা করে দেওয়ার প্রচেষ্টা স্পষ্ট, কিন্তু তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্তর্নিহিত বহুপাক্ষিক চরিত্রকে বিপদে ফেলতে পারে।
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–সহ বড় অর্থনীতিগুলি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধ এবং শুল্ক ও অ–শুল্ক বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকাকে দুর্বল করেছে। কৃষি ভর্তুকি ও তথ্য প্রযুক্তি পণ্য সম্পর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের অভাবের কারণে দোহা রাউন্ডের আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দেওয়ার ঘটনা এর আগেই ঘটেছিল।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির নতুন প্রবণতা সম্পর্কেও সচেতন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে এই ধরনের বৃহত্তর বৈশ্বিক অনুভূতিগুলিকে জায়গা করে দেওয়ার প্রচেষ্টা স্পষ্ট, কিন্তু তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্তর্নিহিত বহুপাক্ষিক চরিত্রকে বিপদে ফেলতে পারে।
অতিমারির আগে কিছু মেগা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফ টি এ) সংবাদে এসেছিল। এর মধ্যে ছিল ট্রান্স–প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টি পি পি) ও রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আর সি ই পি)। প্রাথমিক আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সম্মিলিত জিডিপি এবং বাজারের বিশাল আয়তন অনেককে এই দুটি মেগা এফ টি এ–কে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ হিসাবে বিবেচনা করতে প্রণোদিত করেছিল।
কিন্তু ২০১৭ সালে টি পি পি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৯ সালে আর সি ই পি থেকে ভারতের সরে আসা এই উভয় এফ টি এ–র সম্মিলিত বাজারের আকারকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে। যদিও সি পি টি পি পি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে (প্রথম ছয়টি অনুমোদনকারী দেশের জন্য) কার্যকর হয়েছিল এবং আর সি ই পি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে (প্রথম দশটি অনুমোদনকারী দেশের জন্য), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সরে যাওয়া প্রস্তাবিত এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিতে যথেষ্ট পরিমাণে ভাটার টান নিয়ে এসেছিল।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি সম্ভাব্য মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে, চলতি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে, আর কোভিড–১৯ এর প্রতি চিনের জিরো টলারেন্স নীতি ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে এবং দেশটিও বর্তমানে অর্থনৈতিক শ্লথতার মধ্যে পড়েছে।
অতএব, অতিমারির পরে, নজর মূলত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ চুক্তির দিকে সরে গেছে। এদিকে, গত দুই বছরে ব্যাপক ভূ–রাজনৈতিক এবং তারপর অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি সম্ভাব্য মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে, চলতি রাশিয়া– ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে, আর কোভিড–১৯ এর প্রতি চিনের জিরো টলারেন্স নীতি ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে এবং দেশটিও বর্তমানে অর্থনৈতিক শ্লথতার মধ্যে পড়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলির প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল হবে। সুতরাং, ভারত সহ উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলিকে অবিলম্বে জোর দিতে হবে সতর্ক ও নমনীয় থাকায়, এবং সেই সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা করায়। স্বতন্ত্র বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা করাটা অবশ্য মূলত যতটা সম্ভব লাভজনক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপর নির্ভর করবে।
মতামত লেখকের নিজস্ব।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Abhijit was Senior Fellow with ORFs Economy and Growth Programme. His main areas of research include macroeconomics and public policy with core research areas in ...
Read More +