শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক মধ্যস্থতাকারী পর্যন্ত… বেজিং এ বার পার্টি ও সামরিক বাহিনীর সংযোগস্থলে দুর্নীতি দমনে নজরদারি জোরদার করছে।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) বরিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউঝিয়া এবং লিউ ঝেনলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে প্রথমজন সিএমসি-র ভাইস-চেয়ারম্যান ও পলিটব্যুরোর সদস্য এবং দ্বিতীয়জন জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন সিএমসি ভাইস-চেয়ারম্যান হে ওয়েইদং এবং সিএমসি সদস্য মিয়াও হুয়াকে দুর্নীতির তদন্তের কারণে সংস্থাটি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
চিনা গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে যে, তাঁদের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের’ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, এই দু’জন সিএমসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করছেন এবং ‘নিয়মের মারাত্মক লঙ্ঘন করছেন’, যা ‘রাজনৈতিক ও দুর্নীতিমূলক সমস্যা’ তৈরি করছে। এই সমস্যা সেনাবাহিনীর উপর পার্টির নিরঙ্কুশ নেতৃত্বকে প্রভাবিত করে এবং পার্টির শাসনতান্ত্রিক ভিত্তিকে বিপন্ন করে তোলে। তাঁদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক কাঠামো এবং যুদ্ধ সক্ষমতা নির্মাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করারও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা থেকে এমন ধারণাও পাওয়া যায় যে, তাঁরা সামরিক বাহিনীর মধ্যে শি-কে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, ঝাং নাকি চিনের পরমাণু সংক্রান্ত গোপন তথ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ফাঁস করেছেন।
দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ অর্থ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ (এসওই), জ্বালানি, শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমিতি, উন্নয়ন অঞ্চল এবং দরপত্র ও টেন্ডারিংয়ের মতো খাতগুলিতে দুর্নীতির তদন্ত করার অঙ্গীকার করেছে।
২০২৬ সালটি শুরু হয়েছিল সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশনের (সিসিডিআই) বার্ষিক সম্মেলনের মাধ্যমে, যা চিনের রাজনৈতিক খতিয়ানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই সম্মেলন শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে এবং এর ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করে। দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ অর্থ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ (এসওই), জ্বালানি, শিক্ষা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও সমিতি, উন্নয়ন অঞ্চল এবং দরপত্র ও টেন্ডারিংয়ের মতো খাতগুলিতে দুর্নীতির তদন্ত করার অঙ্গীকার করেছে। অনেক দলীয় কর্মকর্তাও উপহার ও নগদ অর্থ গ্রহণ এবং ‘অধ্যয়নমূলক সফর’ বা ‘কর্মকর্তা-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’র আড়ালে বিদেশ ভ্রমণের জন্য নজরদারিতে রয়েছেন।
‘আড়ম্বরপূর্ণ’ প্রকল্প, সরকারি ভবন ও কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘অনিয়ম’-এর বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা, আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আর্থিক লাভের জন্য নীতি পরিবর্তন করার মতো অসদাচরণও অর্থাৎ ‘ফান শোবিং’ 翻烧饼 অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকার ও বড় ব্যবসার মধ্যে আঁতাত, কর্মকর্তাদের দ্বারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং অনুকূল নীতির সন্ধানে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ঘটনাগুলিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তদন্তকারীরা ‘বেনামি অংশীদার’ এবং সরকার ও ব্যবসার মধ্যে ‘ঘূর্ণায়মান দরজা’র অর্থাৎ জুয়ান ঝুয়ান মেন 旋转门 মতো দুর্নীতির গোপন ধরনগুলিও খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন।
এই সম্মেলনের পর শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ধরা পড়া উচ্চপদস্থ ‘বাঘ’দের ভাগ্য ও কার্যপ্রণালীর উপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক প্রচার অভিযান চালানো হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় তথ্যচিত্র প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে প্রাক্তন এগ্রিকালচার মিনিস্টার তাং রেনজিয়ানের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যাঁকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় দু’দশক ধরে ২৬৮ মিলিয়ন ইউয়ানের (৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি ঘুষ নেওয়ার জন্য স্থগিত থাকা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। এই কলঙ্কিত রাজনীতিবিদ টেলিভিশনে স্বীকার করেছেন যে, তিনি অবৈধ লেনদেনের জন্য এক ‘হোয়াইট-গ্লাভ’ বেনামি ব্যবসায়ীকে ব্যবহার করতেন, যিনি ছিলেন বেজিং-ভিত্তিক একজন প্রত্নবস্তু ব্যবসায়ী। সুবিধা প্রত্যাশী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া দামে জিনিসপত্র কেনার জন্য ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা ছিল। তবে এ ক্ষেত্রে মূর্তিগুলি প্রত্নবস্তু ছিল না, বরং তা ছিল নকল। বলা হয়, তাং মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরের কাছে একটি সদস্য-ভিত্তিক ক্লাব (মেম্বারস ওনলি) খোলার জন্য নিজের পরিজনদের সাহায্য করেছিলেন। শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট নির্বাহীদের সেই ক্লাবে এমন সদস্যপদ কিনতে হত, যার মূল্য ছিল ১,০০,০০০ ইউয়ান (১৪,৩০০ মার্কিন ডলার) থেকে ৫,০০,০০০ ইউয়ান (৭১,৬৮০ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত। জানা গিয়েছে, তাং ওই ক্লাবে বৈঠকের আয়োজন করতেন, যেখানে ব্যবসায়িক নির্বাহীরা ১০,০০০ ইউয়ানের বেশি দামের ওয়াইনের বোতল-সহ ব্যয়বহুল মধ্যাহ্নভোজের খরচ বহন করতেন।
একটি রাষ্ট্রীয় তথ্যচিত্র প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে প্রাক্তন এগ্রিকালচার মিনিস্টার তাং রেনজিয়ানের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যাঁকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় দু’দশক ধরে ২৬৮ মিলিয়ন ইউয়ানের (৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি ঘুষ নেওয়ার জন্য স্থগিত থাকা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল।
আর একটি তথ্যচিত্রে প্রাক্তন ব্যাঙ্কার এবং হুবেই প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান জিয়াং চাওলিয়াং-এর ঘটনাটি তুলে ধরা হয়েছে, যাঁকে হুবেইয়ের রাজধানী উহানে উদ্ভূত কোভিড-১৯ অতিমারি মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট জনগণের ক্ষোভের দরুন বরখাস্ত করা হয়েছিল। জিয়াং চিনের আর্থিক ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ব্যাঙ্ক অফ কমিউনিকেশনসের চেয়ারম্যান ও পার্টি সেক্রেটারি, চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের ভাইস-চেয়ার ও প্রেসিডেন্ট এবং এগ্রিকালচারাল ব্যাঙ্ক অফ চায়নার চেয়ারম্যান ও পার্টি সেক্রেটারি ছিলেন। বলা হয়, লি ইউয়ানগুয়াং নামে একজন ব্যবসায়ী জিয়াং-এর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং জিয়াং-এর সন্তানদের শিক্ষা ও তাঁর বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করতেন।
লি ইউয়ানগুয়াং-এর এই বিনিয়োগ সফল হয়েছিল, যখন ২০১১ সালে জিয়াং এগ্রিকালচারাল ব্যাঙ্ক অফ চায়নার প্রধান হিসেবে তাঁর সংস্থাকে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) সংগ্রহের জন্য একটি বড় চুক্তি পেতে সাহায্য করেন। জিয়াং চাওলিয়াং-এর দুই ভাই জিয়াং বিনলিয়াং এবং জিয়াং ঝংলিয়াং এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন, যাঁরা ছদ্মবেশী হিসেবে কাজ করতেন এবং এই অবৈধ অর্থ থেকে লাভবান হতেন।
সিপিসি-র আখ্যানে এমন ঘুষের বিষয়টিও উঠে এসেছে, যেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়েছিল এবং যা শনাক্ত করা কঠিন। চিনের একটি তথ্যচিত্রে পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চায়নার ডিজিটাল কারেন্সি ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ডিরেক্টর ইয়াও কিয়ানের তদন্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁর বিরুদ্ধে একজন পরিবারের সদস্যের নামে বেজিংয়ে ২০ মিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি (প্রায় ২.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি ভিলা কেনার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে দেখা গিয়েছে যে, ইয়াওকে একটি ই-কারেন্সি ফার্মের ডিরেক্টর ২,০০০ ইথার কয়েন দিয়েছিলেন, যে ফার্মটিকে তিনি একটি এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করতে সাহায্য করেছিলেন। ইয়াও একটি অভিজাত দলের প্রধান ছিলেন, যারা ডিজিটাল রেনমিনবি তৈরি করেছিল এবং তিনি চিনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রযুক্তি তদারকির দায়িত্বেও ছিলেন। এ ভাবে দুর্নীতি দমন তদন্তকারীরা ক্রমবর্ধমান ভাবে অর্থ পাচারের নতুন রূপ এবং সিপিসি কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক কার্যকলাপ খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তে দেখা গিয়েছে যে, ইয়াওকে একটি ই-কারেন্সি ফার্মের ডিরেক্টর ২,০০০ ইথার কয়েন দিয়েছিলেন, যে ফার্মটিকে তিনি একটি এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করতে সাহায্য করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, চিনা পর্যবেক্ষকদের মধ্যে চিনের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বর্তমান বিশৃঙ্খলাকে দেখে এক ধরনের পরশ্রীকাতরতা অনুভূত হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে যদি পথপ্রদর্শক বলে মনে করা হয়, তা হলে বলা যায় যে, চিন পার্টি-রাষ্ট্রের বিভিন্ন উপাদানকে একত্রিত করার জন্য অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকেই বাহ্যিক আগ্রাসনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন সংস্থাটি দুর্নীতি নির্মূলের প্রচেষ্টায় একটি আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতি দমন আইনের মাধ্যমে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা… উভয়েরই বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলছে। এই ঘটনাপ্রবাহ বিদেশি ব্যবসাগুলির জন্য নিঃসন্দেহে অশুভ ইঙ্গিত বহন করবে। কারণ এটি বেজিংয়ের আইনকে দেশের সীমানার বাইরেও প্রয়োগ করার সম্ভাবনা উস্কে দেবে।
কল্পিত এ মানকিকর অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Kalpit A Mankikar is a Fellow with Strategic Studies programme and is based out of ORFs Delhi centre. His research focusses on China specifically looking ...
Read More +