Expert Speak Raisina Debates
Published on Jan 30, 2026 Updated 0 Hours ago

মালাক্কা প্রণালী টহলে ভারতের অংশগ্রহণের প্রস্তাবে সিঙ্গাপুরের সম্মতি আঞ্চলিক আস্থায় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত সংবেদনশীলতা এখনও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নয়াদিল্লির প্রবেশে বাধা হয়ে আছে।

কেন ভারতকে মালাক্কা প্রণালী টহলে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত

সিঙ্গাপুরের প্রাইম মিনিস্টার লরেন্স ওং-এর ২০২৫ সালের  থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গভীর আস্থা বৃদ্ধির মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে। এই সফরে উভয় পক্ষ ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বের জন্য একটি পথনির্দেশিকা উন্মোচন করে এবং পাঁচটি সমঝোতাপত্র (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল মালাক্কা স্ট্রেট প্যাট্রোল- (এমএসপি) যোগদানের বিষয়ে ভারতের আগ্রহকে সিঙ্গাপুরের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

ভারত ২০০৪ সাল থেকে এই প্রণালীতে নিরাপত্তা প্রদানের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তবে ভারতকে অন্য টহলদার দেশগুলির প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই প্রথম কোনও এমএসপি সদস্য ভারতের আগ্রহকে স্বীকৃতি দিল। যদিও সিঙ্গাপুর নয়াদিল্লির আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করেছেতবুও ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রণালীটিতে টহল দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। 

অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ: সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক উদ্বেগ

এমএসপি হল মালাক্কা প্রণালী এবং সিঙ্গাপুরের (এসওএমএস) চারটি উপকূলবর্তী দেশ অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ামালয়েশিয়াসিঙ্গাপুর এবং তাইল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত একটি কাঠামো। জলদস্যুতা সমুদ্রে ডাকাতি দমনের জন্য গঠিত এই কাঠামোটি সন্ত্রাসবাদ থেকে শুরু করে পাচার পর্যন্ত একাধিক সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলা করে। এতে তিনটি মূল উপাদান রয়েছে: মালাক্কা প্রণালী সমুদ্র টহল (এমএসএসপি), ‘আইজ-ইন-দ্য-স্কাই’ (ইআইএস) সম্মিলিত সামুদ্রিক বিমান টহল এবং গোয়েন্দা বিনিময় গোষ্ঠী (আইইজি) যৌথ টহলের জন্য বা পঞ্চম কোনও অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করার যে কোনও ব্যবস্থার জন্য চারটি দেশেরই সম্মতি প্রয়োজন হবে।

এমএসপি প্রতিষ্ঠার মূল কারণ বা বলা ভাল, তড়িঘড়ি করে এটি প্রতিষ্ঠার কারণই ছিল ক্রমবর্ধমান জলদস্যুতা দমনের জন্য প্রণালীটিতে টহল দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে প্রতিহত করা।

এমএসপিভুক্ত দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরে প্রণালীটি টহল দেওয়ার কাজে কোনও -উপকূলবর্তী দেশের অংশগ্রহণকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এমএসপি প্রতিষ্ঠার মূল কারণ বা বলা ভালতড়িঘড়ি করে এটি প্রতিষ্ঠার কারণই ছিল ক্রমবর্ধমান জলদস্যুতা দমনের জন্য প্রণালীটিতে টহল দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে প্রতিহত করা। ২০০৫ সালের মার্চ মাসে জাপানি মালিকানাধীন টাগবোট ইদাতেনের উপর হামলার পর টোকিয়োও প্রণালীটিতে টহল দিতে সাহায্য করার জন্য জাপান কোস্ট গার্ড পাঠানোর প্রস্তাব করেছিল। তবে মালয়েশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করে।

এমএসপি-তে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার পূর্ববর্তী নজিরও রয়েছে। ২০০৫ সালের জুলাই লয়েডস জয়েন্ট ওয়ার রিস্কস কমিটি কর্তৃক প্রণালীটিকে একটি ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার পরসামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক একটি নতুন ত্রিপাক্ষিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দল গঠিত হয়। এখানে উভয় প্রণালীতে প্রবেশকারী ‘সঙ্কীর্ণ পথগুলি সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলিকেযার মধ্যে তাইল্যান্ড এবং ভারতের মতো দেশও অন্তর্ভুক্ত - যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তাইল্যান্ডকে পরে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ভারতকে বাদ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে টহল কার্যক্রমে যোগদানের জন্য ভারত সর্বশেষ প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হয়যখন ইন্দোনেশিয়া এটিকে ‘অসম্ভব’ বলে ঘোষণা করে।

এসওএমএস-এর উপকূলবর্তী দেশগুলিবিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া - প্রণালীটিতে তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার বিষয়ে সংবেদনশীল। তারা যৌথ টহলের প্রাথমিক পরিকল্পনাটি সংক্ষিপ্ত করে সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি সমন্বিত টহল বিন্যাসে সীমাবদ্ধ রাখে। এমনকি ইআইএস সম্মিলিত সামুদ্রিক বিমান টহলেও সংশ্লিষ্ট বিমানগুলি প্রণালীর পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে টহল দেয় না। এর পরিবর্তে সদস্য দেশগুলির কর্মকর্তারা একই বিমানে চড়ে টহল দেন। ১৯৭০-এর দশকে তারা একটি আইনি নীতি প্রতিষ্ঠা করেযা তাদের এসওএমএস-এর উপর একচেটিয়া এক্তিয়ার প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে শাংরি-লা সংলাপে এমএসপি- প্রাথমিক সদস্য ইন্দোনেশিয়ামালয়েশিয়া  সিঙ্গাপুর এই বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছায় যেপ্রণালীটির নিরাপত্তা বিধানে উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলির প্রাথমিক দায়িত্ব রয়েছে এবং ব্যবহারকারী রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ভিত্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সিঙ্গাপুর সবসময়ই এই ধারণার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল যেএই জলপথটি সংশ্লিষ্ট সকল অংশীদারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

এসওএমএস-এর উপকূলবর্তী দেশগুলি - বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া - প্রণালীটিতে তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার বিষয়ে সংবেদনশীল।

ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকি 

এমএসপি শুধুমাত্র এর সদস্য দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এই ধারণা প্রণালীটি যে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেতা উপেক্ষা করে। ২০২৫ সালের প্রথম মাসে এসওএমএস- ইতিমধ্যেই ৭২টি সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এটি ২০২৪ সালের পুরো বছরে রেকর্ড করা ৬২টি ঘটনাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এশিয়ায় জাহাজের বিরুদ্ধে জলদস্যুতা সশস্ত্র ডাকাতি প্রতিরোধের আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি (রিক্যাপমালাক্কা প্রণালীর দক্ষিণে জলদস্যুতার কার্যকলাপ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। যদিও পূর্বে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ জলদস্যুতার ঘটনা অহিংস ছিল এবং অনুপ্রবেশকারীরা ধরা পড়ার আগেই পালিয়ে যেতসাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দর্শায় যেজলদস্যুদের কাছে অস্ত্র থাকার সম্ভাবনা বেশি।

ভারতের এমএসপি-তে যোগদানের প্রচেষ্টা কৌশলগত বিচক্ষণতাআঞ্চলিক বাড়াবাড়ি নয়

এমএসপি-তে যোগদানের জন্য ভারতের প্রচেষ্টা উপকারী এবং স্বাভাবিক উভয়ই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের মতো নয়ভারত একটি সংলগ্ন রাষ্ট্র। ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজগুলো আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখেযা প্রণালীটি থেকে মাত্র ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভারতের সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং এর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি মালাক্কা প্রণালীর মধ্য দিয়ে হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ভারত মহাসাগর অঞ্চলে (আইওআর) ‘প্রথম সাড়াদানকারী এবং পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। ২০০৪ সালের সুনামি থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা পর্যন্ত… ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচালিত মানবিক অভিযানে ভারতই প্রথম নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এডেন উপসাগর এবং পশ্চিম আরব সাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় মোতায়েন রয়েছে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরের পূর্বে তাদের ১০০ দিনের জলদস্যুতা বিরোধী অভিযানে ৩৫ জন সোমালি জলদস্যুকে আটক করা হয়েছিল। ভারতের ‘মিশন-ভিত্তিক মোতায়েন’ – অর্থাৎ বন্দরে অবস্থান না করে যেখানে ‘কার্যক্রম চলছে’ সেখানে অবস্থান করা ভারতীয় নৌবাহিনীকে ভারতের নিকটবর্তী অঞ্চলের বাইরেও অন্যান্য আঞ্চলিক নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে সক্ষম করেছে।

এমএসপি-তে ভারতের অংশগ্রহণ উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব হারানোর কারণ হবে এই ধারণা মালাক্কা প্রণালীর যৌথ কাঠামোর পরিবর্তে সমন্বিত কাঠামোকে ভুল ভাবে বোঝে। এমএসপি- বর্তমান সদস্য ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলিও একে অপরের আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করে না এবং ভারতও এই নীতি মেনে চলবে। ভারত আঞ্চলিক সীমানা লঙ্ঘন না করেই সমন্বিত টহল পরিচালনা করতে পারে। ছাড়াও এটি গোয়েন্দা তথ্য নজরদারি বিনিময়ে সহায়তা করতে পারে এবং সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা (মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস) প্রদান করতে পারে। এটি দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য আন্দামান নিকোবর কমান্ডকে একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।

এমএসপি-তে ভারতের অংশগ্রহণ উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব হারানোর কারণ হবে এই ধারণা মালাক্কা প্রণালীর যৌথ কাঠামোর পরিবর্তে ‘সমন্বিত’ কাঠামোকে ভুল ভাবে বোঝে।

ছাড়াও ভারত পূর্বে এমএসপি-তে তার ভূমিকা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হলেওবিশেষ করে ২০১৮ সালে ভারতীয় নৌবাহিনী প্রণালীর অভ্যন্তরে টহল দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলতবে এর পর থেকে তারা তাদের অবস্থানকে পরিমার্জন করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব বিভাগের সচিব পি. কুমারন আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের পরিবর্তে ‘সমন্বয়’ এবং ‘সমন্বিত প্রচেষ্টা কথা বলেছেন। এই নমনীয় ভাষা আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ভারতের বোঝাপড়া এবং আধিপত্য জাহির না করে আস্থা তৈরির লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে। বহুপাক্ষিক মহড়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নৌ কূটনীতি পর্যন্ত ভারতের ধারাবাহিক সদিচ্ছার পদক্ষেপগুলি আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রতি তার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারকে তুলে ধরে। ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরভিয়েতনামমালয়েশিয়াফিলিপিন্স এবং ব্রুনাইয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ফ্লিটের শুভেচ্ছা সফরগুলি সামুদ্রিক অংশীদারিত্বের ক্রমবর্ধমান শৃঙ্খলগুলিকে আরও গভীর করার জন্য তাদের উদ্দেশ্য প্রচেষ্টার প্রমাণ দেয়।

এমএসপি-তে অন্তর্ভুক্তির অর্থ হস্তক্ষেপ নয় এবং সমন্বয় প্রণালীর উপকূলবর্তী দেশগুলির সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য মালাক্কা প্রণালীতে ভারতকে আরও গভীর ভাবে যুক্ত করা কেবল বাঞ্ছনীয়ই নয়বরং প্রয়োজনীয়ও হতে পারে।

 


প্রিসি এল পট্টনায়ক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজের গবেষক

 

নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.