এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় মিন্ট-এ।
প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের অবিচ্ছেদ্য উপাদানগুলির উপর বেজিং তার নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে। লিথিয়াম ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ, শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত কৃত্রিম হিরে এবং হোলমিয়াম, এরবিয়াম, থুলিয়াম, ইউরোপিয়াম ও ইটারবিয়ামের মতো রেয়ার আর্থ (বিরল মৃত্তিকা) উপাদানগুলিকে চিনের রফতানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই বছরের শুরুতে সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, লুটেসিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম এবং ইট্রিয়ামকে এই তালিকায় যুক্ত করার পর পরই এই ঘটনা ঘটেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপকতা এবং চিনের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাত্রা বোঝার জন্য ডিসপ্রোসিয়ামের কথা ধরা যাক, যা সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহীর জন্য ব্যবহৃত হয়। চিন এই বিরল মৃত্তিকার ৯৯ শতাংশ পরিশোধন করে এবং সাংহাইয়ের কাছে অবস্থিত দেশটির ভূমি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি অফ ল্যান্ড রিসোর্সেস) অধীন একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্বের পুরো উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। বেজিং তার অভ্যন্তরীণ আইনকে যে ভাবে দেশের সীমানার বাইরেও প্রয়োগ করছে, তাতে যে সব প্রতিষ্ঠান এই ধরনের চিনা কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে, তাদের পণ্য তৃতীয় কোনও দেশে বিক্রি করার আগে লাইসেন্স বা শংসাপত্র নিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, বেজিং নয়াদিল্লির কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি চাইছে যে, তাদের সরবরাহ করা বিরল মৃত্তিকার চুম্বকগুলি শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্যই ব্যবহার করা হবে।
চিন ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে তার রফতানি নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে রফতানি নিষেধাজ্ঞা চালু করেছিল। এই আইনটি নির্দিষ্ট সংস্থার জন্য কৌশলগত বলে বিবেচিত উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণ রফতানি নিষিদ্ধ করে এবং চিনা সরকারকে এমন দেশগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দেয়, যারা চিনের জাতীয় নিরাপত্তা বা ‘স্বার্থ’ লঙ্ঘন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলেক্ট কমিটি অন চায়নার চেয়ারম্যান জন মুলেনার বেজিংয়ের সর্বশেষ বিরল মৃত্তিকা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাকে একটি ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সংশ্লিষ্ট আর একটি ঘটনায়, কানাডীয় সংস্থা টেকইনসাইটস এবং অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিনের ‘অনির্ভরযোগ্য সত্তা’র তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে, যা ‘চিনা সংস্থাগুলির বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষতি করে এমন সত্তাগুলি’কে শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি। এই ধরনের সংস্থাগুলি বাণিজ্য বিধিনিষেধ, চিনে বিনিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের কর্মীদের দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে পারে।
হুয়াই বিদেশি চিপের দেশীয় বিকল্প তৈরির জন্য বেজিংয়ের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং টেকইনসাইটসের বিরুদ্ধে তাদের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, যারা তাদের প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে তারা প্রতিশোধ নেবে।
উন্নত প্রযুক্তি ও মেধা সম্পত্তি সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা টেকইনসাইটসকে চিনে কোনও সংস্থা বা ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, সংস্থাটি চিনা প্রযুক্তি সংস্থা হুয়াইয়ের বিদেশি অর্ধপরিবাহীর উপর নির্ভরতা উন্মোচন করেছে এবং এর গোপন সরবরাহকারীদের পরিচয় প্রকাশ করেছে।
২০১৯ সাল থেকে ওয়াশিংটন হুয়াইকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করা চিপ-নির্মাতারা সরাসরি এই সংস্থাটির সঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছে। হুয়াই বিদেশি চিপের দেশীয় বিকল্প তৈরির জন্য বেজিংয়ের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং টেকইনসাইটসের বিরুদ্ধে তাদের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, যারা তাদের প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে তারা প্রতিশোধ নেবে।
বেজিং এই ক্রমবর্ধমান রফতানি নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রমাণ করে বলেছে যে, এই পণ্যগুলির বেশ কয়েকটিকে সামরিক কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তারা কেবল তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করছে। তারা এ-ও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা তাদের নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং অন্যান্য বিনিময় প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে আগ্রহী।
অক্টোবর মাসের শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে বেজিং তার নীতি সংশোধনের ঘোষণা করে। তাদের রফতানি ও সরবরাহ সংক্রান্ত আগ্রাসন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও প্রযুক্তিগত উপকরণকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যকে দর্শায়। স্বাভাবিক ভাবেই, ট্রাম্প ইতিমধ্যেই আরোপিত ৩০ শতাংশ শুল্কের উপরে চিনা আমদানির উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
চিনের এই ধরনের আক্রমণ বেজিং-ওয়াশিংটন উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি শি এবং ট্রাম্পের মধ্যকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির অনিশ্চয়তাকেও তুলে ধরে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প চিনা পণ্যের উপর নজিরবিহীন ১৪৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করার হুমকি দিয়েছিলেন। এর জবাবে শি ১২৫ শতাংশ প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন। বেশ কয়েক দফা আলোচনার পর একটি যুদ্ধবিরতি এবং এর একাধিক মেয়াদ বৃদ্ধি ঘটে, যার ফলে চিনা পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক ৩০ শতাংশে এবং মার্কিন পণ্যের উপর চিনা শুল্ক শেষ পর্যন্ত ১০ শতাংশে স্থির হয়।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই আরোপিত ৩০ শতাংশ শুল্কের উপরে চিনা আমদানির উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
সেপ্টেম্বর মাসে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উভয় পক্ষই অগ্রগতি সাধন করেছে বলে মনে হয়েছিল এবং সোশ্যাল-মিডিয়া অ্যাপ টিকটকের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একটি ‘মৌলিক কাঠামো’তে পৌঁছেছিল, যদিও শুল্কের মতো আরও জটিল বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন টিকটককে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরও একটি সুযোগ দিয়েছে এবং এই জনপ্রিয় ভিডিয়ো-শেয়ারিং অ্যাপটির মালিক সংস্থা বাইটড্যান্স একটি মার্কিন সংস্থার কাছে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের জন্য ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাইটড্যান্সের শেয়ার বিক্রির দাবি করেছিল। কিন্তু সময়সীমা নিয়ে গড়িমসি করতে থাকে। টিকটকের প্রতি ট্রাম্পের নমনীয়তার নেপথ্যে একটি প্রধান কারণ ছিল এর ব্যবহারকারীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। এটি বেজিংকেও শেয়ার বিক্রির বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করতে এবং এটিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে থাকতে পারে।
এর আগে এনভিডিয়ার এআই চিপ বিক্রির অনুমতি দিয়ে ট্রাম্প নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করার পর চিনের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রযুক্তি রফতানি নিষেধাজ্ঞার দৃঢ়তা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, কমিউনিস্ট নেতারা ভ্লাদিমির লেনিনের নীতিতে বিশ্বাস করতেন: বেয়োনেট দিয়ে পরীক্ষা করে দেখো। যদি নরম মাটি পাও, তা হলে নিঃসন্দেহে এগিয়ে যাও; আর যদি ইস্পাতের সম্মুখীন হও, তা হলে পিছু হঠে এসো।
একটি বাণিজ্য চুক্তির সন্ধানে ট্রাম্প তাঁর চিন নীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছেন বলে মনে হচ্ছে। এই বাণিজ্য যুদ্ধ ২.০-এর জন্য শি জিনপিং প্রতিশোধমূলক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আরও ভাল ভাবে প্রস্তুত। তিনি কেবল তার প্রতিপক্ষকে ভারসাম্যহীন করে তোলার ক্ষমতাই দেখাননি, বরং নরম মাটি পেয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় মিন্ট-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +
Kalpit A Mankikar is a Fellow with Strategic Studies programme and is based out of ORFs Delhi centre. His research focusses on China specifically looking ...
Read More +