এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল অবশেষে এমন একটি বিপদসীমা অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ভয় মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত পরিসরকে বেশ কিছু সময় যাবৎ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের সমন্বিত হামলা কেবল কৌশলগত অভিযান ছিল না; এগুলি ছিল প্রতিরোধ এবং বিশ্বাসযোগ্যতার একটি রাজনৈতিক বিবৃতি এবং একই সঙ্গে একটি মেরুকৃত ভূ-কৌশলগত পরিসরে কূটনীতির সীমাবদ্ধতাকে দর্শানো।
ইজরায়েলের ‘রোরিং লায়ন’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপিক ফিউরি’… দু’টিকে এমন বলপূর্বক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে ধ্বংস করা এবং একটি ভঙ্গুর আঞ্চলিক শৃঙ্খলাকে পুনরুজ্জীবিত করা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যার ফলে উভয় পক্ষই এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে থেকে ফিরে আসা আর সম্ভব নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলাগুলিকে ‘অবশ্যম্ভাবী হুমকির বিরুদ্ধে’ ‘বড় যুদ্ধ অভিযান’ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পেশীবহুল একতরফাবাদের লক্ষ্যে মার্কিন পদক্ষেপকেই জোরদার করে। ইজরায়েলি প্রাইম মিনিস্টার নেতানিয়াহু এই আক্রমণকে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী পূর্ব-প্রতিরোধের মতবাদ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে পারমাণবিক সক্ষমতার চূড়ায় থাকা ইরান এমন একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা না, শুধু মাত্র ধ্বংস করাই জরুরি।
মার্কিন সর্বোচ্চবাদিতা এবং ইজরায়েলি নিরাপত্তাহীনতার সংমেল এক চূড়ান্ত উত্তেজনার মুহূর্ত তৈরি করেছে। এই সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক যাত্রা। ২০২৫ সালের জুন মাসে মার্কিন-ইজরায়েলি হামলায় পারমাণবিক কেন্দ্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা তেহরানের ক্ষমতার পুনঃঅর্জনকে আটকাতে পারেনি। গোপন পারমাণবিক পুনর্নির্মাণের প্রতিবেদন এবং আইএইএ-র উদ্বেগ এই সন্দেহকে আরও জোরদার করেছে যে, ইরান পারমাণবিক যাত্রায় এতটাই এগিয়েছে, যে কোনও সময়ে তারা পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হবে।
ইজরায়েলি প্রাইম মিনিস্টার নেতানিয়াহু এই আক্রমণকে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী পূর্ব-প্রতিরোধের মতবাদ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে পারমাণবিক সক্ষমতার চূড়ায় থাকা ইরান এমন একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা না, শুধু মাত্র ধ্বংস করাই জরুরি।
শক্তি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত জোর দেওয়া এবং পারমাণবিক কেন্দ্র ভেঙে ফেলার বিষয়গুলি তেহরানের বিপদরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জেনেভা আলোচনা নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম কূটনৈতিক দুর্ঘটনা, বরং অমীমাংসিত কৌশলগত লক্ষ্যের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল।
কেন্দ্রীয় হলেও পারমাণবিক মাত্রা এ ক্ষেত্রে একমাত্র পরিবর্তনশীল বিষয় নয়। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগার এবং তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক দ্বারা ইজরায়েলের নিরাপত্তা সমীকরণটি আকার পেয়েছে এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের অবনতি ঘটলেও ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন হওয়ার পরেও এমনটা ঘটেছে। ইজরায়েলের জন্য ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠা - এমনকি প্রতীকী ভাবে হলেও - আঞ্চলিক ভারসাম্যকে অপরিবর্তনীয় ভাবে বদলে দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের যৌথ পরিকল্পনা একটি অভিন্ন সাধারণ মূল্যায়নকেই দর্শায়: প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে নাটকীয় ভাবে তার পুনরুদ্ধার করতে হবে।
ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার ২.০’ নীতি বৃহত্তর বলয় প্রদান করেছে। ২০২৪ সালের বিপর্যয়ের পরে - যা ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’কে উৎসাহিত করেছিল বলে মনে হয়েছিল - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক উদ্যোগ পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সঙ্কেত মাধ্যম এবং অভিযানমূলক প্রস্তুতি… দুই পদ্ধতিতেই সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছিল।
ফলে হামলাগুলির দরুন প্রতিরোধমূলক যুক্তি, জোট ব্যবস্থাপনা ও সুনামের ঝুঁকি… সবের সমন্বয় ঘটেছিল।
আঞ্চলিক প্রভাব তাৎক্ষণিক ও জ্বলন্ত। ইজরায়েল এবং এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধ ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তেজনা আর কাল্পনিক নয়, বরং ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে অর্থনৈতিক পতন ও কঠোর দমন-পীড়নের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক বিক্ষোভ ইরানের অভ্যন্তরের ফাটলকে প্রকাশ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের তরফে ইরানিদের কাছে ‘আপনার সরকার দখল করা’র আহ্বান প্রকাশ্যে শাসন-পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে। বহিরাগত শক্তি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দেয় না। তাই শাসনের দুর্বলতার ধারণা এবং শাসন পরিবর্তনের ধারণার প্রলোভন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের তরফে পদক্ষেপ করার জন্য পরিসরকে সঙ্কুচিত করে তুলতে পারে।
আঞ্চলিক প্রভাব তাৎক্ষণিক ও জ্বলন্ত। ইজরায়েল এবং এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধ ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তেজনা আর কাল্পনিক নয়, বরং ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ইরাক ও ইয়েমেনের প্রক্সিদের ক্ষমতা হ্রাস পেলেও স্থিতিশীল অবক্ষয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল শক্তি সঙ্কোচন বিন্দু অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী এখন কৌশলগত উদ্বেগের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। মার্কিন সম্পদের আবাসস্থল উপসাগরীয় দেশগুলিকে উত্তেজনা হ্রাসের পাশাপাশি প্রতিরোধের ভারসাম্য বজায় রাখার অপ্রতিরোধ্য কাজের সম্মুখীন হতে হবে।
মানবিক ও রাজনৈতিক পরিণতিও গভীর হতে পারে। বেসামরিক হতাহত, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং স্থানচ্যুতি সামাজিক ভাঙনকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। একটি দুর্বল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তীব্র অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সম্মুখীন হতে পারে, যার ফলে সম্ভাব্য ভাবে সারিবদ্ধতা পুনর্গঠন করা যেতে পারে - সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ককে সুসংহত করা এবং শিয়া প্রভাবকে দমন করা। সৌদি আরব এই আক্রান্ত দেশগুলির প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে এবং তাদের গৃহীত যে কোনও পদক্ষেপ সমর্থন করার জন্য ‘নিজের সমস্ত সম্পদ’ এবং ‘সমস্ত ক্ষমতা’ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সৌদি আরব এমনকি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা ইরানের উপর হামলার জন্য তার আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত লেবানন ও ইরাককে সহজেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, যা ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে জটিলতর করে তুলবে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে এই ধাক্কা স্পষ্ট। তেলের দামের অস্থিরতা মুদ্রাস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভাবে ইরানে বিনিয়োগকারী রাশিয়া ও চিন উভয়ই এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু নিজেদের শক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এই পর্বটি পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির নিয়মের স্থিতিস্থাপকতাকেও পরীক্ষার মুখে ফেলবে। এই মুহূর্তটি মার্কিন রাষ্ট্রকৌশল সম্পর্কে যা প্রকাশ করে, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভাবে ইরানে বিনিয়োগকারী রাশিয়া ও চিন উভয়ই এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু নিজেদের শক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।
বহুপাক্ষিক ও কূটনৈতিক ঐকমত্যের উপর জোর দেওয়ার ইচ্ছা মার্কিন মহাকৌশলের পুনর্বিন্যাসকেই দর্শায়। অগ্রাধিকার এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে আইনি বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বার্তাটি স্পষ্ট: ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার বিচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। সর্বশেষ অগ্নিসংযোগটি পুঞ্জীভূত অবিশ্বাস, ব্যর্থ কূটনীতি এবং কৌশলগত ধৈর্যহীনতার ফসল। ইজরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সক্ষমতা হ্রাস করতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দিতে সফল হতে পারে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ইরানের তরফে যে প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে, তা জনাকীর্ণ ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে বলপূর্বক জুয়ার অন্তর্নিহিত অস্থিরতাকেই দর্শায়।
মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি গভীর অনিশ্চিত কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় – যেমনটা এখন বিদ্যমান - একটি পরিচিত অথচ ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে: কী ভাবে একটি পরিকল্পিত হামলাকে এমন একটি অগ্নিসংযোগে পরিণত হওয়া থেকে রোধ করা যায়, যার মানবিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত মূল্য কাঙ্ক্ষিত লাভের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +