মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চতর খরচ ও কঠোর ভিসা নিয়মের মাধ্যমে তার দক্ষ অভিবাসন কাঠামোকে আরও কঠিন করায়, ইউরোপ ভারতীয় পেশাদারদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও অধিকার-ভিত্তিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক নীতিগত পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগ থেকে শুরু করে বাণিজ্য যুদ্ধ পর্যন্ত… এই পরিবর্তনগুলির অধিকাংশই মার্কিন ব্যবসা ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন এইচ-১বি ভিসার আবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত ফি বা খরচ ব্যাপক ভাবে বাড়ানোর ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তটি ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা।
ভারতীয়রা দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসাকে ‘মার্কিন স্বপ্নের’ একটি পথ হিসেবে দেখে আসছেন। ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলির সঙ্গে জড়িত অনিশ্চয়তার কারণে উল্লেখযোগ্য রকমের বর্ধিত খরচ, ভিসা সংক্রান্ত লটারিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক বিলম্ব বাড়ছে। ফলে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাদাররা আন্তর্জাতিক প্রতিভাদের পছন্দের দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। ভারতীয় কর্মকর্তারা পরিষেবা ও রেমিটেন্সের সম্ভাব্য ব্যাঘাত নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইইউ ব্লু কার্ড: একটি উদীয়মান বিকল্প?
অন্য দিকে, ইইউ ব্লু কার্ডে বাধা কম, আয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বচ্ছ এবং কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক অধিকার উন্নত, যা প্রতিভাবান পেশাদারদের জন্য ইউরোপে একটি তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল ও কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে। এটি বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের গতিশীলতার জন্য একটি অনুমানযোগ্য কাঠামো প্রদান করে। ফলে বর্তমান এইচ-১বি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত উচ্চ খরচ ও আমলাতান্ত্রিক অনিশ্চয়তা অথবা মার্কিন নীতির ব্যাপক অস্থিরতা ছাড়াই পেশাগত সুযোগ খুঁজছেন, এমন ব্যক্তিদের জন্য ইইউ ব্লু কার্ড আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
ইইউ ব্লু কার্ডে বাধা কম, আয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বচ্ছ এবং কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক অধিকার উন্নত, যা প্রতিভাবান পেশাদারদের জন্য ইউরোপে একটি তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল ও কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্লু কার্ডের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে সম্ভাব্য আয় ও আইনি সুরক্ষার মধ্যকার কিছু আপস ও মীমাংসার চিত্র ফুটে ওঠে। এইচ-১বি ভিসা চিরাচরিত ভাবে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত, ব্যস্ত সময়ে কোটা অর্থাৎ সংরক্ষণ ও লটারি ব্যবস্থার দ্বারা সীমিত এবং নতুন ফি কাঠামোর কারণে এটি পৃষ্ঠপোষক ও কর্মচারী উভয়ের জন্যই স্পষ্টতই আরও ব্যয়বহুল ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবুও এটি সফল সম্ভাব্য কর্মীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রযুক্তি বাজারে প্রবেশাধিকার, ইক্যুইটি ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুত কর্মজীবনের উন্নতির সুযোগ প্রদান করে আসছে। অন্য দিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্লু কার্ডটি অনেকটাই অধিকার-ভিত্তিক। এর জন্য একটি বাধ্যতামূলক চাকরির প্রস্তাব প্রয়োজন, যা জাতীয় বেতনের সীমা পূরণ করে। এতে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক সদস্য রাষ্ট্রে এটি স্থায়ী বসবাস এবং ইইউ কাঠামোর মধ্যে স্থানান্তরের জন্য আরও সুনির্দিষ্ট পথ সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে আবেদনকারী ও নিয়োগকর্তাদের জন্য অধিকতর স্বচ্ছতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা প্রদানের লক্ষ্যে নিয়মকানুন ও বেতনের মান নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে, তখন ইউরোপ দক্ষ প্রতিভাদের আকৃষ্ট করার জন্য আইনি, দ্বিপাক্ষিক এবং প্রশাসনিক পথ তৈরি করে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলি কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বৈধ অভিবাসন সহজতর করার জন্য ভারতের সঙ্গে অভিবাসন ও গতিশীলতা অংশীদারিত্ব চুক্তিতে (মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা এমএমপিএ) স্বাক্ষর করেছে। এটি খাপছাড়া নিয়োগের চাইতেও প্রতিভা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি আরও কাঠামোগত পদ্ধতি প্রদর্শন করে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে কর্মীদের ঘাটতির সঙ্গে ভারতে উপলব্ধ দক্ষতার সমন্বয় ঘটায়। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত জার্মানির এমএমপিএ একটি ভাল উদাহরণ। এটি বৈধ অভিবাসন, ছাত্র ও গবেষণা বিনিময় এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতার জন্য শৃঙ্খল স্থাপন করে, যা সম্ভাব্য আবেদনকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ ও কর্মজীবন পরিকল্পনা করার জন্য একটি পূর্বাভাসযোগ্য কাঠামো প্রদান করে।
ইউরোপের মাঝারি আকারের শহরগুলি ভারতীয় পেশাদারদের একটি সুচিন্তিত সুবিধা দিতে পারছে: মার্কিন প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলির তুলনায় সর্বোচ্চ বেতনের সীমা কম হলেও, সেখানে বসবাসের জন্য স্পষ্টতর সুযোগ রয়েছে, কিছু অঞ্চলে জীবনযাত্রার খরচ কম এবং নীতিগত ঝুঁকি ও অস্থিরতাও কম।
শ্রমিকের ঘাটতির কারণে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের যে দেশগুলি আগে উল্লেখযোগ্য রকমের মেধা পাচারের শিকার হয়েছিল, তারা এখন উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক কর্মীদের আকৃষ্ট করার জন্য নিজেদের আইনগত ও প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। ইউরোপের মাঝারি আকারের শহরগুলি ভারতীয় পেশাদারদের একটি সুচিন্তিত সুবিধা দিতে পারছে: মার্কিন প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলির তুলনায় সর্বোচ্চ বেতনের সীমা কম হলেও, সেখানে বসবাসের জন্য স্পষ্টতর সুযোগ রয়েছে, কিছু অঞ্চলে জীবনযাত্রার খরচ কম এবং নীতিগত ঝুঁকি ও অস্থিরতাও কম। উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ড ২০২৪ সালের শেষে দশ লক্ষেরও বেশি বিদেশি শ্রমিকের বসবাসের কথা জানিয়েছে এবং তারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের ঘাটতি পূরণের জন্য শ্রমবাজারের কৌশলগুলিকে সক্রিয় ভাবে উন্নত করছে।
ব্লু কার্ডের চ্যালেঞ্জ
এর অর্থ এই নয় যে, ইইউ ব্লু কার্ডের কোনও চ্যালেঞ্জই নেই। ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কট, ২০১৫ সালের অভিবাসন সঙ্কট এবং ইউরোপে অভিবাসীদের দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনাগুলি অভিবাসনের বিরুদ্ধে জনমতকে প্রভাবিত করেছে। ইউরোপ জুড়ে পপুলিস্ট ও দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান অভিবাসীদের জন্য সামাজিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে, যা অভিবাসন নীতি বিতর্ক ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং একত্রীকরণের চ্যালেঞ্জগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অ-প্রযুক্তিগত কর্মজীবনে উন্নতির জন্য প্রায়শই জাতীয় ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য, যার অভাব স্বাভাবিক ভাবেই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং একত্রীকরণের পথে একটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইউরোপ জুড়ে পপুলিস্ট ও দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান অভিবাসীদের জন্য সামাজিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে, যা অভিবাসন নীতি বিতর্ক ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং একত্রীকরণের চ্যালেঞ্জগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চতর বেতন এবং দ্রুত স্টার্টআপ স্টক সংক্রান্ত সুযোগ প্রদান করে। কারণ মার্কিন প্রযুক্তির বাস্তুতন্ত্রগুলিতে এখনও সবচেয়ে বেশি ইক্যুইটি-সমৃদ্ধ প্যাকেজ, স্টার্টআপ বৃদ্ধির সুযোগ এবং এমনকি নির্বাহী পদও রয়েছে। ফলে সীমাবদ্ধতার কারণে ইউরোপের আকর্ষণ শর্তসাপেক্ষ এবং দেশ, শিল্প ও ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়।
ঝুঁকি ও অধিকারের মাঝে: পাশ্চাত্যের ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবনা
অনেক ভারতীয় পেশাদার এখন দু’টি পশ্চিমি মডেলের তুলনা করছেন: মার্কিন মডেল উচ্চতর লাভের সম্ভাবনা, দ্রুত প্রসার এবং স্বাধীন সুযোগ প্রদান করে। কিন্তু সেটি নতুন প্রশাসনিক ও আর্থিক ঝুঁকিও বহন করে। ইউরোপীয় মডেল অন্য দিকে আইনি সুরক্ষা, পারিবারিক পুনর্মিলন এবং স্থায়ী বসবাসের জন্য অনুমানযোগ্য পথকে যথেষ্ট মূল্য দেয়। ফলে মানুষ নিছক আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি কোথায় বসবাস ও কাজ করবেন, তা বেছে নেওয়ার সময় স্থিতিশীলতা ও অধিকারের বিষয়টিও বিবেচনা করছেন।
এই পুনর্মূল্যায়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আকর্ষণকে হয়তো পুরোপুরি দূর করবে না। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, ইউরোপ জাতীয় নিয়োগ উদ্যোগ, অভিবাসন-চলাচল চুক্তি এবং ব্লু কার্ড কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিভাদের আকর্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করছে। যেহেতু অর্থনৈতিক ও দক্ষ অভিবাসীরা পারিশ্রমিকের পাশাপাশি আইনি অধিকার, পারিবারিক নিরাপত্তা, কাজের উপযুক্ততা এবং নীতির স্থিতিশীলতার একটি সতর্ক ভারসাম্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাই ইউরোপ ভারতীয় পেশাদারদের জন্য একটি বিকল্পের গন্তব্য থেকে পছন্দের গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
শায়েরী মলহোত্র অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর।
শিবাঙ্গী যাদব অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ইন্টার্ন।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Shairee Malhotra is Deputy Director - Strategic Studies Programme at the Observer Research Foundation. Her areas of work include Indian foreign policy with a focus on ...
Read More +
Shivangi Yadav is a Research Intern at the Observer Research Foundation. ...
Read More +