এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস-এ।
এ বারের বাজেট বরাদ্দ ভারতের বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা নীতির জন্য শুভ ইঙ্গিত বহন করে।
ভারতের বিদেশনীতি একটি সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশটির বৈদেশিক সম্পৃক্ততার বেশির ভাগই তার অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে নিবিড় ভাবে সম্পৃক্ত হলেও আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলি তার নিরাপত্তা হিসেব-নিকেশের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মনোযোগের দাবি করে। সম্প্রতি সমাপ্ত ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা এফটিএ) সম্পন্ন হয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আপাত ঐকমত্য এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতির উপর সামগ্রিক মনোযোগ এই বিষয়টিকেই দর্শায় যে, একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি ভারতের বিদেশনীতির জন্য অপরিহার্য উপাদান।
একই ভাবে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি চ্যালেঞ্জ এবং নয়াদিল্লির নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে একটি গুরুতর, পদ্ধতিগত পরিবর্তনের সূচনা - যা ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুরের সময় এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয়েছে - একটি শক্তিশালী বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে। ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট এবং বিদেশ মন্ত্রণালয় (এমইএ) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (এমওডি) জন্য বাজেট বরাদ্দ একটি নির্দেশক কাঠামো হিসেবে কাজ করে, যা এই পরিবর্তনশীল সময়ে নয়াদিল্লির অগ্রাধিকারগুলির রূপরেখা দেয়।
মন্ত্রণালয়ের বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দটি দেওয়া হয়েছে ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (ওডিপি) খাতে। এই খাতে দেওয়া হয়েছে ৬,৯৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩১ শতাংশেরও বেশি।
২০২৫-২৬ সাল থেকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। আসন্ন অর্থবর্ষে মন্ত্রণালয়ের জন্য ২২,১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা চলতি বছরের ২০,৫১৬ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। বরাদ্দের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করলে বেশ কিছু পুনর্বিন্যাস দেখা যায়, যা ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দটি দেওয়া হয়েছে ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (ওডিপি) খাতে। এই খাতে দেওয়া হয়েছে ৬,৯৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩১ শতাংশেরও বেশি। বিভিন্ন সমমনস্ক দেশের সঙ্গে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির সঙ্গে উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে ভারতের ধারাবাহিক মনোযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, ওডিপি-র জন্য এই বিপুল বাজেট সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রটিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য নয়াদিল্লির প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতাকেই দর্শায়।
গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির জন্য বরাদ্দ একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে থেকেছে, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিধিতে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চলের অনুঘটক হিসেবে কাজ করার জন্য নয়াদিল্লির প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং এটি ‘প্রতিবেশ প্রথম’ (নেবারহুড ফার্স্ট) নীতির আলোচনা কাঠামোর মাধ্যমে পরিবেষ্টিত। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভুটান (২,২৮৮.৫৬ কোটি টাকা), নেপাল (৮০০ কোটি টাকা) এবং মলদ্বীপ ও মরিশাস (উভয়ই ৫৫০ কোটি টাকা) সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। মজার বিষয় হল, ভুটান আবারও ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের সর্বোচ্চ অংশের প্রাপক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ১০ শতাংশেরও বেশি পেয়েছে।
অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কা (৪০০ কোটি টাকা) এবং আফগানিস্তানের (১৫০ কোটি টাকা) জন্য বাজেট বরাদ্দে ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। কলম্বোর সঙ্গে নয়াদিল্লির সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং কাবুলের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ধীর গতির পুনর্গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে, বাজেট বরাদ্দের এই বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায় যে, ভারত তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েনও ঢাকার জন্য বাজেট বরাদ্দের হ্রাসে স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান, যা ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য পূর্ববর্তী বছরের ১২০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৬০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দে ১৪% বৃদ্ধি নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে আধুনিকীকরণ এবং সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা ও উন্নতিকেই দর্শায়।
বাজেটে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অংশীদারিত্ব অন্য সব মন্ত্রকের মধ্যে সর্বোচ্চ রয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ৭৮৪,৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, যা সরকারের মোট বাজেটের ১৪.৬৮%। ২০২৫ সালে ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত হিসেব-নিকেশ তীব্র ভাবে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। যেহেতু ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদ এবং সীমান্ত সংঘাতের আসন্ন হুমকি বিদ্যমান, তাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট বৃদ্ধি প্রস্তুতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রদত্ত অগ্রাধিকারকেই তুলে ধরে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দে ১৪% বৃদ্ধি নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে আধুনিকীকরণ এবং সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা ও উন্নতিকেই দর্শায়। বিশ্ব জুড়ে প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপের সময়ে এবং ভারতের নিরাপত্তা হিসাবের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে, নয়াদিল্লি প্রতিরক্ষায়, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে। এই বাজেটে সশস্ত্র বাহিনীর মূলধন ব্যয়ের জন্য ২১৯,০০০ কোটি টাকা এবং রাজস্ব ব্যয়ের জন্য ৩৬৫,৪৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ভারত যেহেতু নতুন প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়ন, সামগ্রিক সংস্কার, আধুনিকীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে সুসংহত করার উপর জোর দিচ্ছে, তাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভারতের নিরাপত্তা প্রস্তুতির বাধ্যবাধকতার জন্য একটি ইতিবাচক লক্ষণ।
গত এক বছরে ভারত তার অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রচেষ্টায় একটি বিশাল উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। ভারত নতুন সুযোগের সন্ধানে এই বাজারগুলিতে প্রবেশের জন্য সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সফল ভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তবে গত এক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের জন্য ভারতের প্রচেষ্টা নয়াদিল্লিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। নয়াদিল্লির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কের বিশাল পরিসরের প্রতিটি খাতের স্বার্থ রক্ষা করা একটি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবেই থেকেছে।
ভারত তার অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রচেষ্টায় একটি বিশাল উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। ভারত নতুন সুযোগের সন্ধানে এই বাজারগুলিতে প্রবেশের জন্য সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সফল ভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ঐকমত্যের নতুন ঘোষণা এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের পক্ষ থেকে কৃষি ও দুগ্ধ খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিকে বাণিজ্য চুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা থেকে বোঝা যায় যে, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতির উপর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্ববাজারের একীকরণের এই যুগে শুল্ক আরোপের বিষয়টি নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পথে একটি বড় বাধা। গত এক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল, আলোচনার ফলে তা খানিক হলেও থিতিয়ে গিয়েছে এবং উভয় পক্ষের জন্যই নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিদ্যমান ঘাটতিগুলি পূরণ করা প্রয়োজন। ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সক্ষমতা আরও ভাল ভাবে পরিচালনার জন্য কর্মী নিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ… এই দু’টি হল গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই দু’টি মন্ত্রণালয়ের প্রতি বাজেট বরাদ্দের প্রবণতা থেকে বোঝা যায় যে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত সরকার আর্থিক শক্তিও যোগ করতে ইচ্ছুক।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +
Sayantan Haldar is an Associate Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. At ORF, Sayantan’s work is focused on Maritime Studies. He is interested in questions on ...
Read More +