অ্যাঙ্গোলা যখন কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের মোকাবিলা করছে, তখন গভীরতর বিশ্লেষণে প্রকাশ পেয়েছে যে, কী ভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ছবিসূত্র: গেটি ইমেজেস
দুই রুশ রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ইগর রাচিন এবং লেভ লাকশটানভের কথিত হস্তক্ষেপ নিয়ে অ্যাঙ্গোলায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু আইনি বিষয় নয়। এটি প্রক্সি যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, আখ্যানের লড়াই সম্পর্কিত বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের প্রতিফলন। বর্তমানে বিচারাধীন এই দুই রুশ নাগরিকের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করা, অপতথ্য ছড়ানো এবং অ্যাঙ্গোলার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আসল প্রশ্নটি শুধু বিদেশি হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তা-ই নয়, বরং এই দাবিগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিকে কেন্দ্র করেও উঠছে।
অ্যাঙ্গোলার সরকারি আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, এই দুই রুশ নাগরিক ‘আফ্রিকা পলিটোলজি’র পক্ষ থেকে কাজ করছিলেন। ২০২৩ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের মৃত্যুর পর ভাগনার গ্রুপের অবশিষ্টাংশ থেকে এই গোপন নেটওয়ার্কটির উদ্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়। হুইসলব্লোয়ার ইয়ালিকে-নগোঞ্জোর মতে, এই নেটওয়ার্কটি আফ্রিকা জুড়ে একটি অত্যাধুনিক অপতথ্য কাঠামো তৈরি করেছে, যার উদ্দেশ্য হল পশ্চিমা প্রভাবকে দুর্বল করা, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করা।
আসল প্রশ্নটি শুধু বিদেশি হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তা-ই নয়, বরং এই দাবিগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিকে কেন্দ্র করেও উঠছে।
আপাতদৃষ্টিতে, আফ্রিকান পলিটোলজির বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলিকে যৌক্তিক বলেই মনে হয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে রাচিন ও লাকশটানভ দেশের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন শাসক দল ‘পপুলার মুভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ অ্যাঙ্গোলা’র (এমপিএলএ) জেনারেল হিগিনো কারনেইরো এবং বিরোধী দল ‘ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য টোটাল ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ অ্যাঙ্গোলা’র (ইউনিটা) নেতা আদালবের্তো কস্তা জুনিয়র। রাজনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে তাঁদের উভয়কেই আকর্ষণীয় আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই কার্যপ্রণালীটি ঠান্ডা লড়াইকালীন হাইব্রিড বা মিশ্র ধরনের হস্তক্ষেপের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
তবে এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া থেকে অনেক দূরে। অভিযুক্ত এবং তাদের আইনি দল উভয়েই আফ্রিকান পলিটোলজির সঙ্গে যে কোনও রকমের সংযোগ অস্বীকার করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে, তাদের কার্যকলাপ সাংস্কৃতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যার মধ্যে লুয়ান্ডায় একটি ‘রাশিয়ান হাউস’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, এই অপতথ্য প্রচারণার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী ম্যাক্সিম শুগালেই - যিনি লিবিয়ায় প্রিগোজিনের পক্ষে তাঁর সফল গুপ্তচরবৃত্তির জন্য পরিচিত - তাকে এই অভিযানের সময় চাদে আটক করা হয়েছিল। লিবিয়ায় তিনি প্রাক্তন নেতা মুয়াম্মার গদ্দাফির পুত্র সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে সমর্থন করার জন্য সফল ভাবে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং একটি কৌশল প্রস্তুত করেন। লিবিয়ার কারাগার থেকে তাঁর পলায়নের ঘটনাটি পরবর্তীতে প্রিগোজিনের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত তিনটি অ্যাকশন টিভি চলচ্চিত্রের একটি ট্রিলজিতে পরিণত হয়। তবে তাঁর আটকের সময়কাল বিবেচনায় নিলে অ্যাঙ্গোলায় তাঁর কথিত সম্পৃক্ততা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।
এই অসংলগ্নতা শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ভীতিকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গোলা সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০১৭ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রেসিডেন্ট হোয়াও লোরেনজো ধীরে ধীরে অ্যাঙ্গোলার পররাষ্ট্রনীতিকে মস্কোর সঙ্গে তাঁর চিরাচরিত জোট থেকে সরিয়ে এনে বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে চালিত করেছেন। এই পরিবর্তনটি প্রতীকী ভাবে আরও জোরদার হয়েছিল ২০২৪ সালে জো বাইডেনের অ্যাঙ্গোলা সফরের মাধ্যমে, যেখানে মধ্য আফ্রিকার খনিজ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিকে আটলান্টিক রফতানি পথের সঙ্গে সংযোগকারী একটি কৌশলগত অবকাঠামো উদ্যোগ উচ্চাভিলাষী লোবিতো করিডোর প্রকল্পটি উন্মোচন করা হয়েছিল।
এই অসংলগ্নতা শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ভীতিকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গোলা সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই পশ্চিমমুখী অভিমুখীকরণের পরিণতিও রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আলরোসা এবং ভিটিবি ব্যাঙ্কের মতো সংস্থাগুলি সরে যেতে বাধ্য হওয়ায় অ্যাঙ্গোলায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থ ইতিমধ্যেই সঙ্কুচিত হয়েছে। কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাও কমিয়ে আনা হয়েছে। লোরেনজো ২০১৯ সাল থেকে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এই প্রেক্ষাপটে, রাশিয়াকে একটি অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা অ্যাঙ্গোলার দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক হতে পারে। এটি এক দিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নকে বৈধতা দেয়, তেমনই অন্য দিকে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত পশ্চিমা বয়ান অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারের কার্যকলাপের জন্য রাশিয়ার উপর দোষ চাপায়।
প্রকৃতপক্ষে, আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। অ্যাঙ্গোলা যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী চক্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্নগুলিও বড় আকার ধারণ করেছে। আফ্রিকার অন্য অনেক নেতার মতো লোরেনজোও সাংবিধানিক কৌশলের মাধ্যমে তাঁর মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করা একটি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। জেনারেল হিগিনো কারনেইরো একই শাসক দল এমপিএলএ-র সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে জনপ্রিয় এবং অনেকেই তাঁকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বেশ কয়েকটি মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা পরে খারিজ হয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাঁর পুনরুত্থান নতুন করে অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছে, যা ক্ষমতাসীনদের দ্বারা বিরোধীদের উপর দমনপীড়নের এক পরিচিত আফ্রিকান চিত্রকেই তুলে ধরেছে।
এই ঘটনাগুলির সময়কালও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যাঙ্গোলায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ঢেউ - যা প্রাথমিক ভাবে একটি শান্তিপূর্ণ ট্যাক্সি ধর্মঘটের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল - শেষ পর্যন্ত দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। যদিও সরকার দাবি করছে যে, বিদেশি শক্তিগুলি এই বিক্ষোভগুলিকে সংগঠিত করেছে। অনেক সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের কর্মীরা জোর দিয়ে বলছেন যে, এই অসন্তোষগুলি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, যার মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং প্রশাসনিক ঘাটতি। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়া - যার ফলে একাধিক ব্যক্তির মৃত্যু ও গণগ্রেফতার হয়েছে - সরকারি ভাষ্যের প্রতি সন্দেহকে আরও গভীর করেছে।
অ্যাঙ্গোলার ঘটনাটি বাহ্যিক হস্তক্ষেপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্পষ্ট সীমানাকেই তুলে ধরে। এর বৃহত্তর প্রভাব ভীতিকর।
এই প্রেক্ষাপটে, আফ্রিকান পলিটোলজিকে দোষারোপ করা একটি সুবিধাজনক অজুহাত বলে মনে হয়, যা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে সুসংহত করে। এটি সরকারকে বিরোধী নেতাদের বিদেশি স্বার্থের সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগও দেয়, যার ফলে তাদের বৈধতা ক্ষুণ্ণ হয়।
তবুও রাশিয়ার প্রকৃত সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়াও নির্বুদ্ধিতার নামান্তর হবে। ভাগনার গ্রুপ এবং এর উত্তরসূরি নেটওয়ার্কগুলি আফ্রিকা জুড়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের স্পষ্ট সক্ষমতা ও প্রেরণা প্রদর্শন করেছে। রাশিয়া সরাসরি জড়িত না হলেও এই কার্যক্রমগুলি শেষ পর্যন্ত ক্রেমলিনের জন্যই লাভজনক। অতএব, এর নাগরিকদের আটক করার বিষয়ে যে কোনও মৃদু প্রতিক্রিয়া পরোক্ষ সহযোগিতার ধারণাকে আরও উস্কে দিতে পারে। তথ্যযুদ্ধের জগতে নীরবতাকে প্রায়শই একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
শেষ পর্যন্ত, অ্যাঙ্গোলার ঘটনাটি বাহ্যিক হস্তক্ষেপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্পষ্ট সীমানাকেই তুলে ধরে। এর বৃহত্তর প্রভাব ভীতিকর। অ্যাঙ্গোলার গতিপথ একটি বৃহত্তর প্রবণতাকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলি নতুন করে পরাশক্তিগুলির প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হচ্ছে। সম্পদ-রাজনীতি এবং প্রভাব বিস্তারের কার্যকলাপের সংমিশ্রণ ঠান্ডা লড়াইয়ের আদর্শগত লড়াইয়ের সঙ্গে এক অস্বস্তিকর সাদৃশ্য তৈরি করে। অ্যাঙ্গোলা যখন রাশিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা গভীর করছে, তখন এটি একটি উদীয়মান প্রক্সি যুদ্ধের সম্মুখসারির রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আফ্রিকা পলিটোলজি একটি প্রকৃত হুমকি না কি একটি অতিরঞ্জিত হুমকি - তা যা-ই হোক না কেন - এর ব্যবহার একটি গভীরতর সঙ্কটেরই ইঙ্গিত দেয় এবং সেটি হল বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে আফ্রিকান রাজনীতির ক্রমশ জড়িয়ে পড়া। এবং বিশেষ করে এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রচারণা এবং ক্ষমতার মধ্যকার সীমারেখা নির্ধারণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
সমীর ভট্টাচার্য অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing ...
Read More +