রাশিয়া-ইউক্রেন ও হামাস-ইজরায়েল যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য বাধার সম্মুখীন হয়েছে, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার জটিলতাকেই দর্শায়। নির্বাচনী প্রচারণায় উভয় দ্বন্দ্ব দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও আলোচনা এখনও পর্যন্ত স্থগিতই রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের আমলে রাশিয়া ও ইউক্রেন এবং হামাস ও ইজরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া দু’টি যুদ্ধের সমাপ্তি টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের সময় ট্রাম্প দু’টি যুদ্ধ শুরু হতে দেওয়ার জন্য বাইডেনের তীব্র নিন্দা করেন এবং জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি যদি প্রেসিডেন্ট থাকতেন, তা হলে দু’টি যুদ্ধই ঘটত না।
তিনি অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পরেও বিদ্যমান এই যুদ্ধগুলি তাঁকে এ কথা বুঝতে বাধ্য করেছে যে, কেন যুদ্ধ শুরু করা সহজ কিন্তু শেষ করা কঠিন। প্রতিটি যুদ্ধের আলোচনাই অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পরে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সূচনা ঘটে, যা ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ ভেঙে যায়। এমনটা ঘটে যখন গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ সামরিক প্রত্যাহার-সহ একটি চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতিতে অসম্মত হলে এবং আরও বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দিতে ইজরায়েল অস্বীকৃত হলে হামাস ইজরায়েলি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দিতে অস্বীকার করে। ট্রাম্প হামাসকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন যে, বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে; যদি তা না হয়, তা হলে ‘এর ভয়ঙ্কর মূল্য চোকাতে হবে’।
হামাস ও ইজরায়েলের ক্ষেত্রে, ট্রাম্প তেল আভিভের তরফে হামাসকে সম্পূর্ণ রূপে পরাজিত বা নির্মূল করার প্রচেষ্টার কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া আর কোনও সাফল্য পাননি এবং হামাসের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের দাবি পূরণে হামাসের কোনও আগ্রহ নেই।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে মার্কিন সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি মস্কো ও কিয়েভ শত্রুতা বন্ধ না করে এবং একটি মীমাংসায় পৌঁছতে না পারে, তা হলে ওয়াশিংটন অন্যান্য অগ্রাধিকারের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হবে। হামাস ও ইজরায়েলের ক্ষেত্রে, ট্রাম্প তেল আভিভের তরফে হামাসকে সম্পূর্ণ রূপে পরাজিত বা নির্মূল করার প্রচেষ্টার কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া আর কোনও সাফল্য পাননি এবং হামাসের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের দাবি পূরণে হামাসের কোনও আগ্রহ নেই।
সুতরাং, সেই পরিচিত সমস্যাই প্রকাশ্যে এসেছে যেখানে তৃতীয় পক্ষগুলি যখন শত্রুতা বন্ধ করা এবং যুদ্ধে আগ্রহী যুদ্ধবাজদের মধ্যে শান্তি মীমাংসার মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে, তখন – যেমনটা ইজরায়েলের ক্ষেত্রে গিয়েছে - তারা বিশ্বাস করে যে, হামাসকে ব্যাপক ভাবে তারা পরাজিত করতে পারে। এর বিপরীতে হামাস আবার বিশ্বাস করে যে, তারা দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ বজায় রাখতে পারে।
একই ভাবে, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সমীকরণের কারণে সাফল্যের নিরিখে ভূখণ্ড দখলের সম্ভাবনা বিবেচনা করে রুশরা কখনওই ট্রাম্পের ইতিবাচক শান্তি প্রচেষ্টায় সাড়া দেবে না। আর তাই কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতি ব্যর্থ হয়ে যাবে, বিশেষ করে রাশিয়া জানে যে, তারা আরও বেশি অঞ্চল দখল করতে সক্ষম। ইউক্রেনীয়দের যে ভাবে ট্রাম্প কাজে লাগিয়েছেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটবে না। কারণ ওয়াশিংটনের মূল অস্ত্র সরবরাহের উপর ইউক্রেন আরও বেশি নির্ভরশীল।
মার্চের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ওভাল অফিসের এক বিপর্যয়কর বৈঠকের পর ট্রাম্প কিয়েভে সামরিক সরবরাহ সাময়িক ভাবে স্থগিত করেছিলেন, যা পরবর্তী কালে আলোচনায় বসতে ও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে জেলেনস্কিকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প বুঝতে পেরেছিলেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য অধরাই থাকবে। কারণ রাশিয়া যেহেতু কোনও তীব্র চাপের সম্মুখীন হচ্ছে না, তাই ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধবিরতিতে আসার কোনও উৎসাহ নেই। যাই হোক না কেন, ক্রেমলিন এবং জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতিকে অসময়োচিত বলে মনে করছেন এবং যদি যুদ্ধবিরতি সম্পন্ন হয়, তবে তা কেবল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে পুনরায় সংগঠিত হতে এবং শত্রুতা পুনরায় শুরু করতে সাহায্যই করবে।
ইউক্রেনীয়দের যে ভাবে ট্রাম্প কাজে লাগিয়েছেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটবে না। কারণ ওয়াশিংটনের মূল অস্ত্র সরবরাহের উপর ইউক্রেন আরও বেশি নির্ভরশীল।
আরও মৌলিক ভাবে বললে, ট্রাম্পের এই দুটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যর্থতার নেপথ্যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি সংঘাতে দু’টি যুদ্ধরত পক্ষের মধ্যে স্বার্থের ভারসাম্য সাধারণ ভাবেই তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে অসামঞ্জস্য রকমের বিরোধপূর্ণ, যা এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঘটেছে। কিয়েভের দিক থেকে দেখতে গেলে, ইউক্রেন উল্লেখযোগ্য অঞ্চল ও সার্বভৌমত্ব হারাতে চলেছে। এবং দেশের অবশিষ্ট জিনিসগুলিকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট রক্তপাত ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সহ্য করার পরে ট্রাম্পের দাবির কাছে নতি স্বীকার করা ইউক্রেনের জন্য হবে চরম আত্মসমর্পণের সমান। রাশিয়ানদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের কাছে তাদের নিজস্ব পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব ইউক্রেনের সঙ্গে জটিল ভাবে সম্পৃক্ত। কারণ রাশিয়ার ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ফলস্বরূপ, ব্যাপক পরিমাণে প্রাণ ও সম্পদ ব্যয় করার পর এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আবেদন সত্ত্বেও ২০১৪ সালে দখল করা ডনবাস অঞ্চল এবং ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড ধরে রাখার জন্য, সর্বোপরি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আক্রমণের পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের যে অতিরিক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি করছে, তা ধরে রাখার জন্য অবিচল। প্রকৃতপক্ষে, রাশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতির অর্থ হবে, ইউক্রেনীয় অঞ্চল খারকিভ দখল করা, যা ঐতিহাসিক ভাবে রাশিয়ান ভূখণ্ড ও ওডেসা দখলের জন্য একটি আক্রমণমূলক পথ হিসাবে কাজ করেছে। এটি কিয়েভকে তার একমাত্র কার্যকর সমুদ্রবন্দর ও কৃষ্ণ সাগরে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে।
ট্রাম্পের আমেরিকার জন্য ঝুঁকি ও সমতাবিধান এতটাও জরুরি নয় যে, রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে ইউক্রেনে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহের জন্য মার্কিন করদাতাদের তরফে প্রদত্ত অর্থ ট্রাম্প পুনরুদ্ধার করতে চাইবেন। ক্ষতিপূরণ হিসাবে তিনি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার দাবি করেছেন। জেলেনস্কি এতে আপাতত সম্মত হয়েছেন এই কথা ভেবে যে, রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সাহায্য মিলবে।
দ্বিতীয়ত, শত্রুতা তখনই বন্ধ হতে পারে যদি ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ ভেঙে যায়। কারণ তখন রাশিয়া মস্কোর জন্য অত্যন্ত অনুকূল শান্তি মীমাংসার শর্ত আরোপ করতে পারে। এমনটা তখনই সম্ভব যখন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে পড়বে অথবা যদি ইউক্রেন ওয়াশিংটন থেকে প্রাপ্ত সামরিক সরবরাহ - যেমন রাশিয়ান বাহিনী এবং কেন্দ্রগুলির উপর হামলা চালানোর জন্য মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র - থেকে বঞ্চিত হয়।
হামাস-ইজরায়েল যুদ্ধ ট্রাম্পের সহজ সমাধানকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। কারণ উভয় পক্ষই তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং নিবেদিত।
যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের অবসানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা সত্ত্বেও ট্রাম্প এখনও কিয়েভে সামরিক সরবরাহ বন্ধ করার ইঙ্গিত দেননি। বরং ওয়াশিংটনের সক্রিয় মধ্যস্থতা ততদিন অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের ইউরোপীয় সদস্যরা ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তা প্রত্যাহারের ক্ষতিপূরণ দিতে সক্ষম হয়। এই পরিস্থিতি কেবল যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে এবং ট্রাম্পের হতাশা বৃদ্ধি করবে। ফলস্বরূপ, দীর্ঘায়িত যুদ্ধ রাশিয়ার বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না এবং রাশিয়ার শর্তে কোনও মীমাংসা না-ও করতে পারে। বরং এই পরিস্থিতি এমন অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে, যা মস্কোকে আরও ক্লান্ত করে তুলবে।
একই ভাবে, হামাস-ইজরায়েল যুদ্ধ ট্রাম্পের সহজ সমাধানকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। কারণ উভয় পক্ষই তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং নিবেদিত। হামাসের জন্য এটি টিকে থাকার লড়াই। আর ইজরায়েলের জন্য, সামরিক হুমকি ও শাসক সত্তা হিসাবে হামাসকে নির্মূল করা জরুরি। কারণ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন যে, সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর অবশিষ্টাংশের কিছু প্রতিরোধ সত্ত্বেও তিনি এমনটা করতে পারবেন। ট্রাম্প কঠিন পথে হলেও শেষ পর্যন্ত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন যে, কাল্পনিক কথার জোরে প্রচার চালানো গেলেও, শাসন করতে গেলে বাস্তবতা জরুরি। এবং যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতা ও বিচক্ষণতা আরও বেশি করে দরকার।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +
Kartik is a Senior Fellow with the Strategic Studies Programme. He is currently working on issues related to land warfare and armies, especially the India ...
Read More +