এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ভালদাই ক্লাব-এ।
নয়াদিল্লি নর্দার্ন সি রুটের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা সম্পর্কে সচেতন। কারণ আর্কটিকের বাড়তে থাকা গলন এবং দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়া ও অন্যান্য আর্কটিক দেশের মধ্যে উন্নত সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলে নয়াদিল্লির উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একটি উল্লেখযোগ্য আদর্শগত পরিবর্তনকেই দর্শায়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণায় সহযোগিতার উপর জোর দিয়ে আসছে। তবে দেশটির আর্কটিক দৃষ্টিভঙ্গি এখন একটি স্পষ্ট ভূ-অর্থনৈতিক মাত্রা বহন করে। এই বিবর্তনটি আর্কটিক বরফের ত্বরান্বিত গলন এবং নর্দার্ন সি রুট (বরফ ভাঙার সহায়তায়) বরাবর বছরব্যাপী নৌচলাচলের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা থেকে উদ্ভূত। উপরন্তু, পশ্চিমিদের সঙ্গে রাশিয়ার অবনতিশীল সম্পর্ক ও নিষেধাজ্ঞার দরুন রাশিয়ান আর্কটিক থেকে পশ্চিমি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সংস্থাগুলি বেরিয়ে যাওয়ার কারণে মস্কো আর্কটিক অঞ্চলে এশীয় দেশগুলির – অর্থাৎ চিন এবং ভারতের - অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে। গত দশকে বেজিং আর্কটিকে উপস্থিতি বৃদ্ধি করলেও, ভারতের উপস্থিতি এখনও পরিমিত। তা সত্ত্বেও ২০২০ সাল থেকে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সরকারি আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। এই প্রেক্ষিতে, ভারতের আর্কটিক সম্পৃক্ততার চালিকাশক্তিগুলি অনুসন্ধান করা, রাশিয়ান আর্কটিকের উপস্থিতির পরিধি মূল্যায়ন করা এবং নয়াদিল্লির সমীকরণে এনএসআর-এর কেন্দ্রীয়তার মূল্যায়ন নিবিড় তদন্তের দাবি রাখে।
ভারত এবং আর্কটিক
নয়াদিল্লি আর্কটিকের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ভাগ করে নেয়। ১৯২০ সালে ভারত স্বলবার্ড চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ৮৭ বছর পর ২০০৭ সালে নয়াদিল্লি আর্কটিক অঞ্চলে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু করে। ২০০৮ সালে ভারত স্বলবার্ডে তার প্রথম আর্কটিক আউটপোস্ট উদ্বোধন করে। ভারতের আর্কটিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, আর্কটিক শাসন এবং সংযোগ বৃদ্ধিতে সহযোগিতা জোরদার করার কথা বলা হয়। নয়াদিল্লির সমীকরণে আর্কটিকের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছিল আর্কটিক কাউন্সিলে যোগদানের জন্য তার প্রচেষ্টায়, যা ২০১৩ সালে গৃহীত হয়েছিল। ভারতের পাশাপাশি চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং সিঙ্গাপুরকে আর্কটিক কাউন্সিলে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী আর্কটিক শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
নয়াদিল্লির সমীকরণে আর্কটিকের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছিল আর্কটিক কাউন্সিলে যোগদানের জন্য তার প্রচেষ্টায়, যা ২০১৩ সালে গৃহীত হয়েছিল। ভারতের পাশাপাশি চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং সিঙ্গাপুরকে আর্কটিক কাউন্সিলে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী আর্কটিক শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
প্রথমত, আর্কটিকের জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনাকে অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। নয়াদিল্লি আর্কটিক ও আন্টার্কটিকের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষেত্রে হিমালয়ের সঙ্গে এক ধরনের সমন্বয় লক্ষ করে। এ ক্ষেত্রে হিমালয় আসলে একটি ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে অবস্থান করছে, যেখানে হিমবাহের গলনের ফলে আবহাওয়ার অবস্থা এবং বর্ষার ধরনে পরিবর্তন আসছে। দ্বিতীয়ত, কৌশলটি আর্কটিক অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং সংযোগ শক্তিশালী করার দিকে ক্রমবর্ধমান প্রেরণাকেই দর্শায়। রাশিয়ান আর্কটিক ভূ-অর্থনীতিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের জন্য এই পরিবর্তনকে দায়ী করা যেতে পারে। গত দশক ধরে শক্তি ও খনিজ উত্তোলন প্রকল্প, আর্কটিক বন্দর এবং সংযোগ নোডগুলিকে শক্তিশালীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ২০২০ আর্কটিক নীতি ও ২০২২ সালের সামুদ্রিক মতবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নথিতে তা প্রতিফলিত হতে পারে।
এর পাশাপাশিই অন্য নব্য-বাস্তববাদী কারণগুলি - যেমন রাশিয়ান আর্কটিক আলোচনায় চিনা সংস্থাগুলির একীকরণ - অঞ্চলটি থেকে পশ্চিমা সংস্থাগুলির প্রস্থানের ফলে তৈরি শূন্যতার পাশাপাশি আর্কটিকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জোরদার করার জন্য ভারতীয় আগ্রহ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। ভারতের হিসেব অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধি ভারত-রাশিয়া অংশীদারিত্বের উপর ইতিবাচক বহুমুখী প্রভাব ফেলবে। এটি ভারতের সরকারি ও বেসরকারি খাতের জন্য আরও ন্যায্যতা তৈরি করবে, রাশিয়ান আর্কটিক অঞ্চলে নয়াদিল্লির উপস্থিতি বৃদ্ধি করবে, বিশেষ করে জ্বালানি, খনিজ, বিরল মৃত্তিকা উপকরণ এবং জাহাজ নির্মাণের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে।
২০২১ সালে রাশিয়ায় ভারতীয় সরকারি খাতের বিনিয়োগ - বিশেষ করে জ্বালানি ও খনিজ খাতে - মোট ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করার ক্রমবর্ধমান আগ্রহকেই দর্শায়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ক্রমবর্ধমান ছাড়ের কারণে নয়াদিল্লি রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক হয়ে ওঠে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যার পরিমাণ ২০২১ সালের ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২০২৫ সালে ৬৬ বিলিয়ন ডলারে। যদিও অপরিশোধিত তেল রফতানি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বেশির ভাগ অংশ যোগ করে, তবে পরবর্তীতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। গত দশক থেকে উভয় দেশই আর্কটিক সম্পদ, জ্বালানি সম্পদ এবং বিরল মৃত্তিকা উপকরণ উত্তোলনে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নর্দার্ন সি রুট
এনএসআর-এ নয়াদিল্লির আগ্রহের মূলে রয়েছে ইস্টার্ন মেরিটাইম করিডোর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা - ভারতের পূর্ব বন্দরগুলিকে ভ্লাদিভোস্টকের সঙ্গে এবং ফলস্বরূপ রাশিয়ার উত্তরের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা। নয়াদিল্লির এনএসআর ব্যবহারের ফলে রাশিয়ার সঙ্গে তিনটি দিকে বৃত্তাকার সংযোগ সম্ভব হবে: মুম্বই হয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত বিদ্যমান রুট, ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর ব্যবহার করে ককেশাস হয়ে পথ এবং তৃতীয়ত ইস্টার্ন মেরিটাইম করিডোর। এনএসআর কেবল ইউরোপে যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয় বরং রাশিয়ান আর্কটিক ও ভারতীয় বন্দরগুলির মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই তিনটি পথের পরিপূরক হয়ে উঠবে। আর্কটিক বন্দর থেকে ইএমসি হয়ে ভারতীয় বন্দরগুলিতে পৌঁছনোর জন্য এনএসআর ব্যবহার করলে জাহাজ চলাচলের সময় কমানো যেতে পারে।
২০২৩ সালে দূর প্রাচ্য এবং আর্কটিকের উন্নয়ন মন্ত্রী আলেক্সি চেকুনকভ এনএসআর-এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহণ নিয়ে আলোচনা করতে ভারত সফর করেছিলেন। ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মস্কো সফরের সময় উভয় পক্ষই বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক আন্তঃসরকারি কমিশনের অধীনে নর্দার্ন সি রুটে একটি কর্মী গোষ্ঠী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। কর্মী গোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উভয় পক্ষই কার্গো ট্রানজিট লক্ষ্যমাত্রা, মেরু নৌচলাচলের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাবিকদের জন্য সম্ভাব্য প্রশিক্ষণ এবং আর্কটিক জাহাজ নির্মাণের জন্য যৌথ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করে। রাশিয়ান বন্দর এবং জাহাজ নির্মাণ সুবিধাগুলির পাশাপাশি মস্কো তৃতীয় দেশগুলিতে অ-পারমাণবিক বরফভাঙা জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে গত বছর চারটি অ-পারমাণবিক বরফভাঙা জাহাজ নির্মাণের জন্য রোসাটম এবং ভারত সরকারের মধ্যে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
প্রতিবন্ধকতা
নর্দার্ন সি রুটের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং এর ফলে সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সত্ত্বেও আর্কটিক অঞ্চলে ভারতীয় বিনিয়োগ নগণ্য। বর্তমানে ভারত রাশিয়ান আর্কটিক থেকে উৎপাদিত তেল এবং এলএনজি আমদানি করে চলেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার হুমকির মতো বাহ্যিক কারণগুলি তার অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ভারতীয় তেল সচিব ঘোষণা করেছিলেন যে, নয়াদিল্লি অনুমোদিত আর্কটিক-এলএনজি ২ প্রকল্প থেকে এলএনজি কিনবে না। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় ভারতীয় পণ্য পরিবহণের জন্য এনএসআর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তা বাণিজ্যিক ভাবে কার্যকর নয়। এটি কাঠামোগত বাস্তবতা এবং বাজার শক্তির দ্বারা সৃষ্ট সীমাবদ্ধতার কারণেই ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের নিম্ন রফতানি ও জিডিপি-র অনুপাত (প্রায় ২০%) এবং উৎপাদন খাতে কম মনোযোগ, যার ফলে নয়াদিল্লির রফতানি ঝুড়িতে তুলনামূলক সুবিধা কমে এসেছে। উপরন্তু, পরিবহণের উচ্চ খরচ, বরফ-শ্রেণির জাহাজের অভাব ও কার্গো বিমা করার চ্যালেঞ্জ ট্রানজিটকে জটিল করে তোলে এবং এই সব কিছুই এনএসআরের সম্ভাব্যতা হ্রাস করে।
তবুও আর্কটিকের আরও গলন এবং রাশিয়া ও অন্যান্য আর্কটিক রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে উন্নত সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে নয়াদিল্লি এনএসআরের ভবিষ্যতের কার্যকারিতা সম্পর্কে সচেতন। আর ঠিক এই কারণেই ভারত এই পথে সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে রয়েছে। পশ্চিমি সংস্থাগুলির প্রস্থানের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ সহযোগিতার জন্য আরও পথ তৈরি করেছে। সর্বোপরি, মস্কো নয়াদিল্লিকে আর্কটিক অঞ্চলের যৌথ উন্নয়নে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে এবং আর্কটিক শাসনের আলোচনায় ভারতের উপস্থিতিকে ইতিবাচক ভাবে উপলব্ধি করে, যা রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আর্কটিকের এশিয়ান দেশগুলির বর্ধিত উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, পশ্চিমিদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের বর্তমান প্রবণতা আর্কটিকের আরও পূর্বাঞ্চলীয়করণের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষিতে, ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের দরুন যৌথ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রাশিয়ান আর্কটিক অঞ্চলে ভারতের অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উপস্থিতি বৃদ্ধির উপর নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ভালদাই ক্লাব-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Rajoli Siddharth Jayaprakash is a Junior Fellow with the ORF Strategic Studies programme, focusing on Russia’s foreign policy and economy, and India-Russia relations. Siddharth is a ...
Read More +