হরমুজ প্রণালী নিয়ে সংঘাত — পর্তুগিজ সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে সমসাময়িক উত্তেজনা পর্যন্ত — দর্শায় যে, কী ভাবে কৌশলগত বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতাগুলি বিশ্ব ক্ষমতার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ইউএস) এবং ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা হরমুজ প্রণালীকে বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার চরম সময়সীমা জারি করেন, যেখানে তিনি সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবি জানান এবং এই দাবি পূরণ না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেন। এই ঘটনাটি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ, যেখানে হরমুজ প্রণালী এবং হরমুজ বন্দর শহর বাণিজ্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘস্থায়ী ধারাকেই প্রতিফলিত করে, যার নজির রয়েছে ১৫০৭ সালে (পর্তুগিজদের দখল), ১৫৫২ সালে (পর্তুগিজদের সামুদ্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অটোমানদের চ্যালেঞ্জ), ১৬২২ সালে (অ্যাংলো-পার্সিয়ানদের দ্বারা পর্তুগিজদের বিতাড়ন) এবং ১৬২৫ সালে (পর্তুগিজ, ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ডাচ ভিওসি-কে সম্পৃক্ত করে পরবর্তী নৌ-প্রতিদ্বন্দ্বিতা)।
হরমুজ প্রণালীর নামকরণ হয়েছে ইরানের ছোট দ্বীপ হরমুজের নামানুসারে। বহু শতাব্দী ধরে এই দ্বীপটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাণিজ্যিক লেনদেন হত এবং এটি সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের মাধ্যমে সংযুক্ত দূরবর্তী অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করত। বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসে, পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগর ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য সংযোগে হরমুজ একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও এই পথের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে বসরা, বেইরুত এবং আলেকজান্দ্রিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে পারস্য উপসাগরের মুখে এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে হরমুজের একটি স্বতন্ত্র স্থান ছিল।
১৫০৭ সালে উদীয়মান পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য এবং হরমুজ রাজ্যের মধ্যে হরমুজে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আফোনসো দি আলবুকার্ক-এর নেতৃত্বে পর্তুগিজরা দ্বীপটি দখল করতে সফল হয়, যিনি পরবর্তীতে ১৫০৯ সালে গোয়া এবং ১৫১১ সালে মালাক্কাও জয় করেছিলেন।
এই সময়কালটি ছিল বণিকবাদী প্রতিযোগিতা দ্বারা চিহ্নিত, যেখানে উদীয়মান ইউরোপীয় নৌ শক্তিগুলি বিশ্ব বাণিজ্যের লাভজনক অংশগুলির উপর বাণিজ্যিক আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ব জুড়ে ঘন ঘন সংঘাতে লিপ্ত হত। ভারত ও ভারত মহাসাগর থেকে উদ্ভূত এবং এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাণিজ্য বিশ্ব অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করেছিল। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন অনুমান করেছিলেন যে, সতেরো শতকে এই অঞ্চলটি বিশ্ব জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। হরমুজ দখল করে পর্তুগিজরা ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল।
একুশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে হরমুজ প্রণালীতে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও নৌ-উত্তেজনার সাম্প্রতিক পর্যায়ে এটি উপলব্ধি করা জরুরি যে, এই ভৌগোলিক অবস্থানটি দীর্ঘকাল ধরেই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং বাণিজ্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
এই বিজয়ের আগে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য একটি অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, যেখানে বৈশ্বিক বিনিময়ের সুবিধা আরব, গুজরাতি, বাঙালি, মালাবারি, আর্মেনীয় এবং মিশরীয়-সহ বিভিন্ন বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হত। বিশ্ব বাণিজ্যের এই অত্যন্ত লাভজনক খাতে পর্তুগিজরা দেরিতে প্রবেশ করেছিল। তবে তারা পণ্যের চলাচল এবং সামুদ্রিক যান চলাচলের উপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছিল। এই যুদ্ধটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ এটি বিশ্ব রাজনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এর ফলে ভারতের গোয়ায় সদর দফতর-সহ পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের সংহতিকরণ ঘটে, যা ঐতিহাসিক ভাবে এস্তাদো দা ইন্ডিয়া নামে পরিচিত।
বর্তমান মার্কিন-ইরান উত্তেজনার প্রসঙ্গে আসার আগে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, হরমুজের উপর নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘকাল ধরে নৌশক্তির অসামঞ্জস্যতার উপর নির্ভরশীল ছিল। ১৫০৭ সালে আফোনসো দি আলবুকার্ক স্থানীয় প্রতিরোধকে পরাস্ত করার জন্য প্রাথমিক কামান ব্যবহার করে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-সংঘর্ষের মাধ্যমে হরমুজে বিজয় অর্জন করেন।
১৫৫২ সালে হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে তীব্র নৌ-যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে পর্তুগিজ এবং অটোমান সাম্রাজ্য একে অপরের সম্মুখীন হয়েছিল। পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য অটোমানদের বারবার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, পর্তুগিজরা সফল ভাবে অটোমান নৌবাহিনীকে প্রতিহত করে এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল।
১৬২২ সালে হরমুজকে ঘিরে তৃতীয় সংঘাতটি সংঘটিত হয়, যখন পর্তুগিজ বাহিনী ইংরেজদের মিত্র পারস্য বাহিনীর সম্মুখীন হয়। ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০০) এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ভিওসি, ১৬০২) সেই একই তাগিদ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভারত মহাসাগরের ময়দানে প্রবেশ করে, যা পূর্বে পর্তুগিজদের সম্প্রসারণকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিল। ১৬২২ সালের এই সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ ইংরেজরা এশীয় সামুদ্রিক পথগুলির উপর পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে এবং একটি কৌশলগত ঘাঁটি সুরক্ষিত করতে চেয়েছিল। এর পাশাপাশি, শাহ আব্বাসের অধীনে ইরান আরও জোরালো উপকূলীয় নীতি অনুসরণ করে, বাহরাইন দখল করে, বন্দর আব্বাস বন্দরের উন্নয়ন ঘটায় এবং গোয়াদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিসরগুলিতে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করে।
এই সময়ের কূটনৈতিক কৌশল এবং বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলক ভাবে একবিংশ শতাব্দীর সমসাময়িক ক্ষমতার রাজনীতিকে অনেক সরল একটি প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। সম্মিলিত ইংরেজ-পারস্য বাহিনী হরমুজে পর্তুগিজদের চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করে এবং কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটায়। এই পরাজয়ের পর পর্তুগিজরা মাসকাটে পিছু হঠে, যা পরবর্তী কালে এই অঞ্চলে তাদের অবশিষ্ট অভিযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
হরমুজ আবারও নির্ণায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এই পরাজয় সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে পর্তুগালের অবস্থানকে মারাত্মক ভাবে দুর্বল করে দেয়, যার প্রভাব গুজরাত থেকে তাইল্যান্ড এবং গোয়া থেকে ম্যাকাও পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হরমুজ কখনওই কেবল একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্কীর্ণ পথ ছিল না; এর কৌশলগত গুরুত্ব বারবার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে; তা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যুগেই হোক বা পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়েই হোক। ঘোড়া, মশলা, রেশম, তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো পণ্যের পথ পরিবর্তনের বাইরেও, এটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্তে বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর গতিপথকে আকার দিয়েছে।
১৬২৫ সালের হরমুজের যুদ্ধকে প্রায়শই সেই সময় পর্যন্ত পারস্য উপসাগরের অন্যতম বৃহত্তম নৌ-যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। পর্তুগিজ নৌবহরটি ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌবাহিনী এবং ডাচ ভিওসি-র সম্মিলিত চাপের মুখে পড়েছিল। যদিও এই সংঘর্ষে কোনও চূড়ান্ত বিজয়ী ছিল না এবং এটিকে সাধারণত একটি অমীমাংসিত লড়াই হিসেবে গণ্য করা হয়, তবুও এটি এই অঞ্চলে পর্তুগিজ নৌ-আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। পরবর্তী বছরগুলিতে পর্তুগিজরা হরমুজ পুনরুদ্ধারের জন্য বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। এই প্রচেষ্টার মধ্যে ১৬২০-এর দশক জুড়ে নতুন করে প্রচেষ্টা এবং ১৬৩১ সালে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল, যা সামুদ্রিক শক্তির ক্রমাগত পরিবর্তনের বিষয়টিকে তুলে ধরে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হরমুজ সামুদ্রিক শক্তির একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গিয়েছে, যা বিশ্বব্যবস্থার বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
একুশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে হরমুজ প্রণালীতে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও নৌ-উত্তেজনার সাম্প্রতিক পর্যায়ে এটি উপলব্ধি করা জরুরি যে, এই ভৌগোলিক অবস্থানটি দীর্ঘকাল ধরেই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং বাণিজ্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন বিশ্বশক্তি — যার মধ্যে পর্তুগিজ, অটোমান তুর্কি, সাফাভিদ পারস্য, ইংরেজ, আরব বণিক এবং ডাচরা অন্তর্ভুক্ত — এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এই সংঘাতগুলির পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী, যা রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন রূপ দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলে দিয়েছিল এবং প্রধান কৌশলগত পণ্যগুলির ভোগকে রূপান্তরিত করেছিল। যদি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর হরমুজ সংঘাত ঘোড়া, মশলা এবং সুতির বস্ত্রের বাণিজ্যের উপর প্রভাব ফেলে বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়ে থাকে, তবে বর্তমান উত্তেজনা বৃদ্ধি একই ভাবে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক প্রবাহকে ব্যাহত করে পদ্ধতিগত প্রভাব ফেলতে পারে। সুতরাং, হরমুজ প্রণালীর উপর সমসাময়িক মনোযোগ একটি দীর্ঘতর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই অংশ, যেখানে কৌশলগত বাণিজ্য করিডোরগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ ভূ-রাজনৈতিক ফলাফলকে ক্রমাগত রূপ দান করে চলেছে।
ডক্টর অভিমন্যু সিং আরহা নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) সেন্টার ফর হিস্টোরিকাল স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Abhimanyu Singh Arha is a historian and an academician currently serving as Associate Professor at Centre for Historical Studies, School of Social Sciences, Jawaharlal Nehru ...
Read More +