চিনের কেন্দ্রীভূত নগর কৌশল তাদের শহরগুলিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আর অন্য দিকে ভারতের খণ্ডিত শাসনব্যবস্থা তার নগর রূপান্তরকে ধীর করে দিচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি ‘চায়না ক্রনিকলস’ সিরিজের ১৮৩তম পর্ব।
স্বাধীনতার পরপরই (১৯৫০) ভারতের নগরায়ণের হার (১৭ শতাংশ) চিনের (১৩ শতাংশ) চাইতে বেশি ছিল। ১৯৫০ সালের পর বেশ কয়েক দশক ধরে ভারত তার শহরগুলির ব্যাপারে মূলত একটি নিষ্ক্রিয় নীতি অবলম্বন করলেও চিন প্রায় ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বেশ আগ্রাসী ভাবেই নগর-বিরোধী ছিল। তারা তাদের ‘হুকোউ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ-শহুরে অভিবাসনকে প্রতিরোধ করেছিল। এই ব্যবস্থাটি আসলে চিনা জনসংখ্যাকে শহুরে বা গ্রামীণ বাসিন্দা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করত এবং অবস্থান ও পরিষেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করত।
ভারতের গ্রামীণ মানসিকতা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বছরগুলিতেও বিদ্যমান ছিল। ২০০৫ সালে ভারত নগরায়ণকে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকার করে নেয়। তখন থেকে ভারত সরকারের নগর সম্পৃক্ততার প্রচেষ্টা দ্বিমুখী হয়েছে। প্রথমত, ভারত সরকার রাজ্যগুলিকে সংস্কার-ভিত্তিক আইন গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছে। দুঃখজনক ভাবে এই সুপারিশ সাধারণত উপেক্ষিতই থেকেছে। দ্বিতীয়ত, ভারত সরকারের অবকাঠামো উদ্যোগে অংশগ্রহণ করার জন্য ও অংশীদারিত্বের জন্য রাজ্য ও শহরগুলিকে বড় অঙ্কের কেন্দ্রীয় অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
ভারত যখন নগরায়ণ নিয়ে সামান্য হলেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন চিনা নেতৃত্ব পূর্ণ গতিতে দেশকে নগরায়ণের পথে চালিত করে।
উপরে উল্লেখিত চিনের কঠোর নগর-বিরোধী নীতিটি চিনা নেতৃত্বের দ্বারা গুরুতর ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও পর্যালোচিত হয়েছিল। চিনা নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে, একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা নগরায়ণের প্রতি তাদের দুর্ভাগ্যজনক বিমুখতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি চিন নিজেদের অর্থনৈতিক উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে চায়, তবে তাদের হুকোউ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে এবং বৃহত্তর গ্রামীণ জনসংখ্যাকে শহরগুলিতে এসে উৎপাদন ও শিল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সংশোধিত নগর নীতিতে আরও বেশি পরিমাণে শহরের নির্মাণ, বৃহত্তর শহুরে কর্মজীবী জনসংখ্যা এবং জাতীয় অর্থনীতি গঠনে শহুরে অংশগ্রহণের বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। চিনা বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির এই মৌলিক পরিবর্তনটি অতীতের থেকে একটি উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি ঘটিয়েছিল, যার ফলাফল ছিল বিস্ময়কর।
১৯৮০ সালের পর দু’টি দেশের নগরায়ণের গতিপথ তীব্র ভাবে ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ভারত যখন নগরায়ণ নিয়ে সামান্য হলেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন চিনা নেতৃত্ব পূর্ণ গতিতে দেশকে নগরায়ণের পথে চালিত করে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুমান ছিল, ২০২৪ সালে ভারতের শহুরে জনসংখ্যা হবে ৫৩৪.৯১ মিলিয়ন বা ৩৭ শতাংশ এবং চিনের হবে ৯২৩.৪৯ মিলিয়ন বা ৬৬ শতাংশ। এ ভাবে ভারত প্রতি দশকে গড়ে ২.৭০ শতাংশ হারে নগরায়িত হলেও, চিন গড়ে ৭.২৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা কিনা বিশ্বের দ্রুততম নগরায়ণের অন্যতম। ফলস্বরূপ, চিনে বর্তমানে এক মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যাবিশিষ্ট ১৬০টি শহর এবং ১ লক্ষ থেকে ১ মিলিয়নের মধ্যে জনসংখ্যাবিশিষ্ট ৩৬০টি শহর রয়েছে। এর বিপরীতে, ভারতের দশ লক্ষাধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট শহরের সংখ্যা আনুমানিক ৪০টি।
ভারতে নগরায়ণের পথে একটি বড় বাধা হল ভারতীয় সংবিধানের বিষয় বণ্টন। সংবিধান অনুসারে, নগর উন্নয়নের বিষয়টি রাজ্যগুলির এক্তিয়ারে পড়ে। এই ধরনের বণ্টনকে সমস্যাজনক বলে মনে হয়। এটি শহরগুলিতে ভারত সরকারের ভূমিকা সীমিত করে। যেহেতু শহরগুলির বিশাল এককে পরিণত হওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে, তাই ভারতীয় সংবিধান যদি শহরগুলিকে তাদের জনসংখ্যার আকারের ভিত্তিতে বিভক্ত করত এবং পাঁচ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার সমস্ত মেগাসিটিকে ভারত সরকারের এক্তিয়ারে রাখত, তবে তা আরও বেশি যুক্তিযুক্ত হত। তবে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় শহরগুলির জাতীয় গুরুত্বের বিষয়টি সংবিধান প্রণেতাদের দ্বারা পরিকল্পিত হয়েছিল বলে মনে হয় না।
যেহেতু শহরগুলির বিশাল এককে পরিণত হওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে, তাই ভারতীয় সংবিধান যদি শহরগুলিকে তাদের জনসংখ্যার আকারের ভিত্তিতে বিভক্ত করত এবং পাঁচ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার সমস্ত মেগাসিটিকে ভারত সরকারের এক্তিয়ারে রাখত, তবে তা আরও বেশি যুক্তিযুক্ত হত।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চিন একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত, শীর্ষ-থেকে-নিম্নমুখী (টপ-ডাউন) পরিকল্পনা মডেল অনুসরণ করেছে। দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে শক্তিশালী জাতীয় নির্দেশনা রয়েছে, যা অর্জন করার দায়িত্ব শহরগুলির উপর বর্তায়। স্থানীয় সরকারগুলোকে বাস্তবায়নের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও স্থানীয় কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা কেন্দ্রীয় ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং এর সঙ্গে পুরস্কার ও শাস্তির একটি ব্যবস্থাও যুক্ত থাকে। বেশ কয়েকটি আধা-সরকারি সংস্থা (রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট এমন সংস্থা, যা পৌরসভার কোনও কাজ গ্রহণ ও পরিচালনার জন্য গঠিত) শহুরে শাসন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধরনের সংস্থা চিনে সাধারণত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ (স্টেট ওনড এন্টারপ্রাইজ বা এসওই) নামে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগগুলিকে জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ, গণপরিবহণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে শহরের সরকারগুলি তাদের এলাকার মধ্যে এই আধা-সরকারি সংস্থাগুলির কার্যক্রম তদারকি করে।
অন্য দিকে, ভারতের শহুরে প্রশাসনে একটি গণতান্ত্রিক, নিম্ন-থেকে-উর্ধ্বমুখী (বটম-আপ) কাঠামো রয়েছে, যার লক্ষ্য শহরগুলিকে স্ব-ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। তবে এটি রয়েছে কেবল নামেই। বাস্তবে শহরগুলি রাজ্য সরকার দ্বারা কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। শহরের প্রধান কার্যনির্বাহী অর্থাৎ পৌর কমিশনার রাজ্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং রাজ্য সরকারই শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুমোদন করে। চিনের মতো ভারতেও অনেক আধা-সরকারি সংস্থা শহরগুলিতে কাজ করে। কিন্তু চিনের মতো তাদের কার্যক্রম পৌর সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বিত নয় এবং সংস্থাগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে।
শহুরে পরিকল্পনায় চিন এটিকেই জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি সুচিন্তিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল গ্রহণ করেছে। সরকার শহরের বৃদ্ধি, অবকাঠামো এবং শিল্পায়নকে পরিচালিত করার জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ব্যবহার করে। ভারতের শহুরে পরিকল্পনাও রাজ্য সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি একটি সমন্বিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বাধা দেয়। অনেক রাজ্যের বড় শহরগুলি পরিকল্পনা প্রক্রিয়া শুরু করে বটে। তবে সমস্ত চূড়ান্ত অনুমোদন রাজ্য সরকারের হাতেই থাকে। এই খণ্ডিত কর্তৃত্ব সর্বদা নগর পরিকল্পনায় কঠিন সমস্যা তৈরি করেছে।
ভারতের শহুরে প্রশাসনে একটি গণতান্ত্রিক, নিম্ন-থেকে-উর্ধ্বমুখী (বটম-আপ) কাঠামো রয়েছে, যার লক্ষ্য শহরগুলিকে স্ব-ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
শহুরে অবকাঠামোতে চিনের বিনিয়োগ ছিল নজিরবিহীন। জল পরিষেবার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ চিনা শহর ভাল মানের ২৪/৭ জল সরবরাহ ব্যবস্থা ভোগ করে। এর প্রধান শহরগুলিতে ব্যাপক ভূগর্ভস্থ শৃঙ্খল এবং পরিশোধন কেন্দ্র-সহ কেন্দ্রীভূত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। চিনের শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থাও অত্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে চিনের ৫৪টি শহরে মেট্রো ব্যবস্থা রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ১১,০০০ কিলোমিটারের বেশি। ৬০০টিরও বেশি শহরে বাস পরিষেবা রয়েছে, যার মোট বাসের সংখ্যা প্রায় ৬,৮০,০০০। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানের ক্ষেত্রে চিনের মাথাপিছু ব্যবস্থা ভারতীয় শহরগুলির তুলনায় যথেষ্ট বেশি।
তুলনামূলক ভাবে দেখলে, ভারতীয় শহরগুলিতে ২৪/৭ জল সরবরাহ একটি বিরল ঘটনা। শুধুমাত্র দেশের বৃহত্তম শহরগুলিতেই কেন্দ্রীভূত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে এবং বেশির ভাগই তাদের সমস্ত বর্জ্য জল পরিশোধন করার জন্য পরিকল্পিত নয়। উপরন্তু, ভারতের শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থাও অসম্পূর্ণ। ভারতের শহুরে মেট্রো ব্যবস্থা সীমিত— ২৩টি শহরে মোট ১,০০০ কিলোমিটারের মেট্রো নেটওয়ার্ক রয়েছে। মাত্র ১২৭টি শহরে সীমিত বাস পরিষেবা রয়েছে, যেখানে মোট প্রায় ৪৬,০০০ সিটি বাস চলাচল করে।
গত দু’দশকে ভারত সরকার শহুরে অবকাঠামোর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া সত্ত্বেও এই খাতে বিনিয়োগের পথটি অত্যন্ত কঠিন (২.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এ ছাড়াও খণ্ডিত শহুরে শাসন এবং নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খাতটি আমূল সংস্কারের জন্য অপেক্ষমান, যাতে ভারতীয় শহরগুলি বর্তমানে যা প্রদান করছে, তার চেয়ে উন্নত মানের জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে।
রমানাথ ঝা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Ramanath Jha is Distinguished Fellow at Observer Research Foundation, Mumbai. He works on urbanisation — urban sustainability, urban governance and urban planning. Dr. Jha belongs ...
Read More +