এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় লোয়ি ইনস্টিটিউট-এ।
সুদানের গৃহযুদ্ধ উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করেছে। কিন্তু এর গভীরতর ফাটলটি নীল নদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
ছবিসূত্র: লুই টাটো/এএফপি, গেটি ইমেজেসের সৌজন্যে
ছবির ক্যাপশন: ‘সাউথ সুদান পিপলস লিবারেশন আর্মি ইন অপোজিশন’-এর এক সদস্য। এই দলটি গত বছর সুদানের যোদ্ধাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা লড়াইয়ের পর সুদানের যুদ্ধ আর কোনও অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উপসাগরীয় দেশগুলির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বৃহৎ শক্তিগুলির প্রতিযোগিতা-সহ বেশ কয়েকটি পারস্পরিক কারণের প্রভাবে এই যুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এটি এখন নীল নদ নিয়ে মিশর ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংগ্রামের একটি প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা উভয় দেশ এবং এই অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক।
ইরান এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংঘাতকে লোহিত সাগরের পাদদেশের সঙ্কীর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালী পর্যন্ত আরও প্রসারিত করার হুমকি দেওয়ায় এই আঞ্চলিক গতিপ্রকৃতিকে বিশ্বের পক্ষে উপেক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সুদানের ভৌগোলিক অবস্থানই এই বহিরাগত মনোযোগের একটি বড় কারণ। লোহিত সাগর ও সাহেল অঞ্চলের সংযোগস্থলে এবং সাতটি দেশের সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সুদান আফ্রিকার সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলগুলির সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। দেশটির কৃষির সম্ভাবনা, খনিজ সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরব থেকে শুরু করে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন দেশকে আকৃষ্ট করেছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করেছে, যা প্রায়শই সুদানের অধরা বেসামরিক শাসনে রূপান্তরের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করেছে।
সুদানের গৃহযুদ্ধ খাদ্য ও বিনিয়োগ করিডোর সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলির আগ্রহ আকর্ষণ করেছে, যার ফলে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিকে সমর্থন করছে। রাশিয়া প্রথমে ওয়াগনার গ্রুপের মাধ্যমে এবং এখন আফ্রিকা কোরের মাধ্যমে সুদানের খনি খাতে - বিশেষ করে স্বর্ণ খাতে - নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছে। বাব আল-মান্দেবের যাতায়াত পথ সুরক্ষিত করার প্রয়াস হিসেবে রাশিয়া পোর্ট সুদানে একটি নৌঘাঁটি স্থাপনেও আগ্রহী, যেখানে রুশ সেনাদের মোতায়েন করা হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতাদের যুদ্ধবিরতির দিকে ঠেলে দিয়ে প্রভাব বিস্তারের প্রাথমিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। শুরুতে উদাসীন থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মিশর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সহযোগিতায় মধ্যস্থতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকি প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে... এর মাঝে পড়ে সুদান এমন একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে এই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগুলি সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।
সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর (আরএসএফ) নেতা জেনারেল মুহাম্মদ হামদান দাগালোর (হেমেদতি) মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জের ধরে এই যুদ্ধ শুরু হয়। গত বছর এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং এতে প্রতিবেশী দক্ষিণ সুদান থেকে জঙ্গিরাও জড়িয়ে পড়ে।
তবে যুদ্ধটি এখন আর খার্তুম বা দারফুরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পূর্ব দিকে ইথিওপিয়ার সঙ্গে সুদানের সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই অঞ্চলটি গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম-এর (জিইআরডি) বিপজ্জনক ভাবে নিকটবর্তী, যেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নীল নদের জল নিয়ে মিশর ও ইথিওপিয়া এক উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থায় জড়িয়ে রয়েছে। এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই দশ লক্ষেরও বেশি সুদানি শরণার্থীকে মিশরের সীমান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্য দিকে উত্তর সুদানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিস্তার নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু কায়রোর গভীরতর উদ্বেগ বাড়ছে নীল নদের রাজনীতির উপর এর প্রভাবকে ঘিরে। দ্বিধাবিভক্ত সুদান জিইআরডি নিয়ে আলোচনায় মিশরের দর কষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে, যাকে মিশর তার জল নিরাপত্তার জন্য একটি অস্তিত্বের সঙ্কট বলে মনে করে।
ছবির ক্যাপশন: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইথিওপিয়ার গুবাতে অবস্থিত গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম (জিইআরডি), আফ্রিকার বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধটির উদ্বোধনের পর (আমানুয়েল সিলেশি/ব্লুমবার্গ, গেটি ইমেজেসের সৌজন্যে)
এটিই মিশরের সতর্ক পর্যবেক্ষক থেকে সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠার কারণকে ব্যাখ্যা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মিশর তার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তকে শক্তিশালী করেছে, নজরদারি সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং একাধিক প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তর-পশ্চিম সুদানে আরএসএফ-সংশ্লিষ্ট সরবরাহ পথগুলিতে হামলা চালিয়েছে। বুরহানের প্রতি কায়রোর সমর্থন কোনও আদর্শগত সংগতির কারণে নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ সুদান রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্পষ্ট, যা নীল নদের কূটনীতিতে একটি স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে।
অন্য দিকে, ইথিওপিয়া জিইআরডি-কে জাতীয় উন্নয়নের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচনা করে – যা একই সঙ্গে জাতীয় গর্বের প্রতীক এবং একটি সম্ভাব্য দুর্বলতা। সুদানের সীমান্তের কাছে বেনিশাঙ্গুল-গুমুজ অঞ্চলে এর অবস্থান এটিকে আন্তঃসীমান্ত অস্থিতিশীলতার জন্য সংবেদনশীল করে তোলে। ইথিওপিয়ার কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের কাছে বিদ্রোহে মদত দেওয়ার জন্য মিশরকে অভিযুক্ত করে আসছেন, যদিও মিশর এই অভিযোগগুলি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ বার সুদানের কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে যে ,আরএসএফ-এর রসদ ও চলাচল সহজ করার জন্য ইথিওপিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগগুলি পারস্পরিক সন্দেহের গভীরতাকেই কেবল তুলে ধরে।
একটি প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকিও প্রবল হয়েছে। মিশর চায়, সুদান যেন অস্থিতিশীলতার দিকে ঝুঁকে না পড়ে বা ইথিওপিয়ার সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়। ইথিওপিয়া চায়, নিজের দেশের জড়িয়ে পড়া আটকাতে এবং জিইআরডি-কে রক্ষা করতে। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সুদান এমন একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে এই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগুলির সংঘাত ঘটবে।
উপসাগরীয় পক্ষগুলির সম্পৃক্ততা এই সমীকরণে আর একটি মাত্রা যোগ করেছে। জানা গিয়েছে, আরএসএফ-এর যুদ্ধ প্রচেষ্টা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে যুক্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভর করছে। অন্য দিকে মিশর সুদানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমর্থন করার জন্য সৌদি আরব এবং কাতারের মতো অংশীদারদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। লিবিয়া ও লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে প্রচলিত চোরাচালানের পথগুলি চাপের মুখে পড়ায় ইথিওপিয়া এবং নীল নদের মধ্য দিয়ে নতুন করিডোর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সুদানের জন্য এর পরিণতি ভয়াবহ। বাহ্যিক সমর্থন আপস করার প্রেরণা কমিয়ে দেয়, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে এবং বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে। দক্ষিণ দারফুরে আরএসএফ-এর একটি সমান্তরাল সরকার ঘোষণা ইতিমধ্যেই কার্যত বিভাজনের দিকে ইঙ্গিত করছে। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্সি যুদ্ধ এই বিভাজনগুলিকে আরও গভীর করবে, যা যে কোনও রাজনৈতিক সমাধানকে আরও অধরা করে তুলবে।
সুদানের যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি গৃহযুদ্ধ নয়। এটি দ্রুত উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার বিভাজন রেখায় রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে জল নিয়ে রাজনীতি, সীমান্ত বিরোধ এবং বৃহৎ শক্তিগুলির জোট একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে এবং একে অপরকে শক্তিশালী ও প্রসারিত করছে। সুদানের অস্থিতিশীলতা লোহিত সাগরের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে, বাণিজ্য পথ ব্যাহত করছে এবং অরাষ্ট্রীয় পক্ষ ও বহিরাগত শক্তি উভয়ের জন্যই সুযোগ তৈরি করছে। এটি মানবিক সঙ্কট মোকাবিলার প্রচেষ্টাকেও জটিল করে তোলে। কারণ খণ্ডিত কর্তৃত্ব এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপ সমন্বয়কেই দুর্বল করে দেয়।
দীর্ঘকাল ধরে জীবন ও সভ্যতার উৎস নীল নদ দ্রুত একটি বিভাজন রেখায় পরিণত হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় লোয়ি ইনস্টিটিউট-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing ...
Read More +