Published on Dec 13, 2025 Updated 0 Hours ago

নয়াদিল্লির উচিত চুক্তিটি অধ্যয়ন করে এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যা রিয়াদের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে পারে।

সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ভারতের কৌশলগত সমীকরণ

২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব (কেএসএ) এবং পাকিস্তান নিজেদেরকে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির একটি মূল ধারা রয়েছে, যা তাদের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতিকে জোর দিয়ে বলে যে, দুই দেশের বিরুদ্ধে যে কোন আগ্রাসন উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। ন্যাটো-সদৃশ এই প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি তাদের স্বল্প-জোট অংশীদারিত্বকে 'আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক জোট’-এ পরিণত করে। কেএসএ-র জন্য কাতারের উপর ইরায়েলের সাম্প্রতিক আক্রমণ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ একটি প্রধান চালিকাশক্তি; অন্য দিকে, পাকিস্তানের জন্য তার জোট শৃঙ্খলের যে কোন উন্নয়নে সর্বদা একটি ভারতীয় উপাদান একটি প্রেরণাদায়ক কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সৌদি-পাকিস্তান কৌশলগত অংশীদারিত্বের এসএমডিএ-তে পরিণত হওয়ার মূলে রয়েছে সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবর্তন। সম্পর্কগুলি পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ববর্তী সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৪৬ সালে কেএসএ-এর যুবরাজ ফয়সাল রাষ্ট্রপুঞ্জে একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সংগ্রামের পক্ষে একটি মামলা করেছিলেন। পরবর্তীতে সৌদি আরব পাকিস্তানকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম রাষ্ট্রগুলির অন্যতম হয়ে ওঠে।

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে সমর্থন করে আসছে, যা স্পষ্টতই ভারতের মূল সার্বভৌম স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল।

১৯৬০-এর দশকে সৌদি আরবের যুবরাজ সুলতান পাকিস্তানকে বিশ্বের এক নম্বর বন্ধু বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি বলেছিলেন, ‘যখনই দেশের [সামরিক] সাহায্যের প্রয়োজন হয়, আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাকিস্তানের দিকেই তাকাই। এই ধরনের আকস্মিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট ছিল ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় ইরায়েলি বাহিনীর হুমকি। এই লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে ইসলামাবাদের সঙ্গে রিয়াদের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারা সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণে সহায়তা করেছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক সহায়তার আশ্বাসের বিনিময়ে সৌদি আরব ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলামাবাদকে সমর্থন করেছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে সমর্থন করে আসছে, যা স্পষ্টতই ভারতের মূল সার্বভৌম স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল।

১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় সৌদি আরব পাকিস্তানকে উপকরণ দিয়েছিল এবং কূটনৈতিক নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির দিকে পরিচালিত সঙ্কটের সময়ও একই রকম সমর্থন স্পষ্ট ছিল সেই সময় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে সৌদি রাষ্ট্রদূত ভারতের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যে কোন বাইরের হস্তক্ষেপ অবশ্যই [রাষ্ট্রপুঞ্জের] সনদের লঙ্ঘন হবে। বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পরও সৌদি আরব সেই দেশকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়নি যতক্ষণ না পাকিস্তান তা দিয়েছিল। সৌদি আরব কারগিলে পাকিস্তানের দুঃসাহসিকতায় সন্তুষ্ট ছিল না, কিন্তু তবুও তার সমর্থন অব্যাহত রেখেছিল এবং কাশ্মীর বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নয়াদিল্লিকে চাপ দিয়েছিল। এ ভাবে সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব ব্যাপক ভাবে ধর্মীয় ভিত্তিতে তৈরি হলেও এটি একটি লেনদেনের উপাদান দ্বারা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সৌদি আরব এবং ভারত তাদের সম্পর্ককেও শক্তিশালী করছে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর উল্লেখযোগ্য জোর দিয়ে এমনটা হয়েছে২০১৯ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে সৌদি আরবের বৃহত্তর অংশীদারিত্ব পরীক্ষা করা হয়েছিল, যখন রিয়াদ জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখনও মূল বিষয়।

পাকিস্তানের জন্য, সৌদি আরবের সঙ্গে একটি এসএমডিএ স্বাক্ষর নিম্নলিখিত সুযোগগুলি প্রদান করে: প্রথমত, চলমান নানাবিধ সঙ্কটের মধ্যে সৌদি তহবিল তার প্রতিরক্ষা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে; দ্বিতীয়ত, রায়েলের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বলয়ের গ্যারান্টার হিসেবে নিজেকে স্পষ্ট ভাবে অবস্থান করে মুসলিম বিশ্বে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে উন্নত করতে পারে; এবং তৃতীয়ত, এটি সৌদি আরবের মাধ্যমে পাকিস্তানের সর্বকালীন মিত্রচি পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটি সেতু তৈরি করতে পারে।

কেএসএ এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য নিজস্ব পারমাণবিক বোমা তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে বলে মনে করা হয় এবং এই চুক্তি সম্ভবত একটি সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা স্পষ্টতই ইরান এবং ইরায়েলি স্বার্থের প্রতিকূল

এসএমডিএ যে কোন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ নিশ্চিত করার জন্য কেএসএ এবং পাকিস্তানের মধ্যে পরামর্শ সহযোগিতার জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করে। চুক্তির অংশ হিসেবে কেএসএ-তে পারমাণবিক ঢাল সম্প্রসারণের বিষয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অস্পষ্টতার জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। কেএসএ এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য নিজস্ব পারমাণবিক বোমা তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে বলে মনে করা হয় এবং এই চুক্তি সম্ভবত একটি সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা স্পষ্টতই ইরান এবং ইরায়েলি স্বার্থের প্রতিকূল

এসএমডিএ মূলত কেএসএ-র নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা এবং অঞ্চলে হুমকি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও পাকিস্তানের জন্য এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং সুবিধা পরীক্ষা করার লক্ষ্যে গৃহীতভবিষ্যতে যে কোনও ভারত-পাকিস্তান সঙ্কটের উদ্ভব হতে পারে, তাতে কেএসএ এবং সম্ভবত অন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিকে আরও সক্রিয় ভাবে জড়িত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে এসএমডিএ

নয়াদিল্লি কেএসএ- সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শক্তি এবং কৌশলগত মনোযোগ বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতাপত্র। এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও, আজকের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে উদ্ভূত ভারতের সৌদি সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে কিছু স্পষ্ট কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের সামনে সৌদি-পাকিস্তান সহযোগিতায় ধর্মের উপাদান পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও কঠিন কাজ থাকবে, যা উপেক্ষা করা যাবে না, যদিও তাঁরা ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভূ-কৌশলগত পরিবেশ তৈরির জন্য বাস্তববাদী বৈদেশিক সম্পর্কের উপর জোর দিচ্ছেন। ভারত পশ্চিম এশিয়ার তিনটি শক্তির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সফল হয়েছে: সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি, ইরান এবং ইরায়েল। এই তিনটি শক্তি এই অঞ্চলে তাদের নিজস্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।

ভারত পশ্চিম এশিয়ার তিনটি শক্তির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সফল হয়েছে: সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি, ইরান এবং ইরায়েল।

রিয়াদ এবং ইসলামাবাদের মধ্যে একটি এসএমডিএ-র মাধ্যমে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়া কী ভাবে তাদের কৌশলগত সংযোগে একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা তুলে ধরা হয়েছে। নিজস্ব কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য নয়াদিল্লিকে তাদের পারস্পরিক সংহতির সঙ্কেতের বাইরে তাকাতে হবে এবং সৌদি আরব-পাকিস্তান  অংশীদারিত্বের অধীনে পরিকল্পিত সহযোগিতার সীমা পরিধি দুই- নিবিড় ভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। নয়াদিল্লির জন্য বৃহত্তর কাজ হবে সৌদি আরব এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্য অংশীদারদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তার স্বার্থের সমন্বয় সাধন করা এবং যতটা সম্ভব সারিবদ্ধতা তৈরি করা। ভারতের জন্য তাই বড় বৈদেশিক এবং নিরাপত্তা নীতিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে চাপানউতোরকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 


এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় মিন্ট-এ।

 


নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.