বর্তমান অ-প্রাতিষ্ঠানিক রূপেও রাশিয়া-ভারত-চিন ত্রিপাক্ষিক আসলে ভারতকেই কূটনৈতিক সুবিধা প্রদান করছে।
তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে গ্লোবাল সাউথের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব ছিল, যা মনে করিয়ে দেয় যে, এই সংস্থায় ২৬টি দেশ রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি পূর্ণ সদস্য, দুজন পর্যবেক্ষক এবং ১৪টি সংলাপ অংশীদার রয়েছে। তবুও, একটি পর্ব সম্ভবত পুরো অনুষ্ঠানটির জৌলুস কেড়ে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনের সময় হাসিমুখে থাকা ছবিগুলি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। এমনকি কিছু সংবাদমাধ্যম এটিকে ‘বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার গতিশীলতার পরিবর্তন’ বা নতুন করে আঁকা ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র’ হিসাবে অভিহিত করেছে। এই সম্পৃক্ততার গভীরতা এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য রকমের অতিরঞ্জিত। যদিও একজন দর্শক অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে বেশ চমকিতই হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
ত্রিপাক্ষিক বিন্যাসের ধারণাটি ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে। ২০০৩ সালে বিদেশমন্ত্রীদের পরামর্শের মাধ্যমে এর উত্থানের পর এটি মিথস্ক্রিয়ার সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে এবং ২০২১ সালের শেষের দিকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে একত্রিত হয়েছিল। তবে ভারত-চিন বিরোধের কারণে এই গোষ্ঠীর আবেদন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে এবং সম্পর্কের উপর আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
রাশিয়া-ভারত-চিন (আরআইসি) ত্রিপাক্ষিক আলোচনা বিশ্বব্যাপী এবং আঞ্চলিক রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ভারতের নীতিগত হিসেব-নিকেশে, কিছু উপায়ে আরআইসি আলোচনাকে ব্রিকস এবং এসসিও-র ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হিসাবে দেখা হয়েছিল - ব্রিকসের বিশ্বব্যাপী শাসন অ্যাজেন্ডা এবং এসসিও-র ইউরেশীয় নিরাপত্তায় মনোযোগ। এই ত্রিপাক্ষিক আলোচনা এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিধ্বনিত হওয়ার দু’টি বিশেষ কারণ ছিল। প্রথমত, অনেক আশা ছিল যে, তিনটি ইউরেশীয় শক্তি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়গুলিতে, প্রধানত নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পেতে সফল হবে। দ্বিতীয়ত, এটি পশ্চিমি রাজধানীগুলির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পর্যাপ্ত স্থান বজায় রেখে পশ্চিমিদের বিরুদ্ধে বাজি ধরে রাখার এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত সুযোগ প্রদান করেছিল।
ভারত-চিন সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ স্বয়ংক্রিয় ভাবে নয়াদিল্লিকে ত্রয়ীতে পুনরায় জড়িত হতে উৎসাহিত করে না। ভারতীয় স্বার্থের জন্য এই ফরম্যাটের সম্ভাব্যতা এখনও স্পষ্ট নয়।
২০১৮ সালে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়া যখন পুতিন, মোদী এবং শি-র মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের প্রস্তাব দেয়, তখন ভারত এই ধারণাটি গ্রহণ করে। সেই সময় ক্ষুদ্র-পার্শ্বিক বৈঠকগুলির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা আরআইসি-তে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য একটি গতি তৈরি করেছিল, যার মধ্যে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর এবং ২০১৯ সালের জুন মাসে অনানুষ্ঠানিক নেতাদের সমাবেশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এই বৈঠকগুলি জাপান-মার্কিন-ভারত শীর্ষ সম্মেলন এবং পুনরুজ্জীবিত কোয়াড মন্ত্রী পর্যায়ে ভারতের অংশগ্রহণের সঙ্গে একযোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই বিন্যাসগুলি নয়াদিল্লির একাধিক গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার ক্ষমতা তুলে ধরেছিল, যেখানে কখনও কখনও বিরোধপূর্ণ অ্যাজেন্ডাও থাকে এবং যার ফলে ভারতের বহু-সারিবদ্ধকরণের উদ্দেশ্য পূরণ হয়।
অন্য অনেক ক্ষুদ্র-পার্শ্বিক বৈঠকের মতো একটি অনানুষ্ঠানিক সঙ্কীর্ণ বলয়ের ফোরাম হিসাবে আরআইসি-র সুবিধাও একটি দুর্বলতা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। পরামর্শ ও ধারণা বিনিময়ের বাইরে এটি কোনও সমাধান বা বৃহৎ আকারের উদ্যোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তা ছাড়া, যেহেতু আরআইসি-র সম্পৃক্ততা বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারত-চিন বিভেদকে প্রশমিত করতে পারেনি, তাই ভারতীয় কূটনীতির জন্য এর মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি ব্যতিক্রম যেখানে তিনটি দেশ সহযোগিতা করতে সক্ষম হয়েছিল তা হল আফগানিস্তান, যা নিয়ে প্রায়শই আরআইসি-র মধ্যে আলোচনা করা হত এবং এর ফলে কাবুলে মানবিক সহায়তার সমন্বয়ের মতো সাফল্য অর্জিত হত। তবে একই সময়ে সন্ত্রাসবাদ এবং মৌলবাদের বিষয়ে পার্থক্য দূর করার প্রচেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক পরিবেশে এই বিষয়গুলি নিয়ে অনেক আলোচনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি চিনের সমর্থন এবং রক্ষার ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
যদি আরআইসি আবার আকর্ষণ ফিরে পায়, তবুও এর অ্যাজেন্ডাটির জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সতর্কতামূলক চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হবে।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, ভারত-চিন সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ স্বয়ংক্রিয় ভাবে নয়াদিল্লিকে ত্রয়ীতে পুনরায় জড়িত হতে উৎসাহিত করে না। ভারতীয় স্বার্থের জন্য এই ফরম্যাটের সম্ভাব্যতা এখনও স্পষ্ট নয়। এটা ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর হবে যে, চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান সম্পৃক্ততার পরিবেশ ত্রিপাক্ষিক প্রক্রিয়ায় কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দিকে চালিত করতে পারে। মস্কো ও বেজিং উভয়ের দ্বারা সমর্থিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো কিছু প্রস্তাব এখনও নয়াদিল্লির কাছে অগ্রহণযোগ্য, যেমনটা এসসিও আলোচনা এবং যৌথ বিবৃতিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
ত্রয়ীতে পুনরায় যোগদানের ক্ষেত্রে ভারতের আর একটি সমস্যা হল রাশিয়া কী ধরনের ইউরেশীয় নিরাপত্তা কাঠামো অনুসরণ করছে, সে সম্পর্কে স্পষ্টতার অভাব। ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে মস্কো তার প্রতিবেশ অঞ্চলে যে চ্যালেঞ্জগুলির সম্মুখীন হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে নিজেকে একত্রিত না করে নয়াদিল্লি আরও বেশি লাভ করেছে বলে মনে হচ্ছে। মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ ককেশাস এবং পূর্ব ইউরোপে নয়াদিল্লি রাশিয়া বা চিনের সমর্থনের উপর নির্ভর না করে বিচক্ষণতার সঙ্গে নিজেরাই কাজ করছে। এটি এমন একটি কৌশল, যা ভারতকে এই ভৌগোলিক অঞ্চলগুলিতে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ পেতে সক্ষম করেছে।
তবুও এটাও সম্ভব যে, ভারত, চিন এবং রাশিয়া ত্রিপাক্ষিক যোগাযোগে কোনও ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক ট্র্যাক টু সংলাপ আসলে স্থগিত করা হয়নি। এই স্তরে অনেক ক্ষুদ্র পক্ষের আবির্ভাব বা পুনরুত্থান ঘটে, তাই এমনকি যদি আরআইসি আবার আকর্ষণ ফিরে পায়, তবুও এর অ্যাজেন্ডাটির জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সতর্কতামূলক চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হবে।
যদি আরআইসি-র সত্তা ট্রাম্পের সঙ্গে লেনদেনে এই ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারে, তা হলে ভারত ভবিষ্যতে রাশিয়া এবং চিনের সঙ্গে একই ধরনের আলোচনায় লিপ্ত হতে প্রলুব্ধ হতেই পারে।
বর্তমান অ-প্রাতিষ্ঠানিক রূপে হলেও আরআইসি ভারতকে কূটনৈতিক ভাবে সুবিধা প্রদান করছে। প্রাক্তন আরআইসি-র মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মোদীর চিন সফরের পর ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সুর নরম করেছেন, তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘দৃঢ় ব্যক্তিগত বন্ধন’ এবং ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্কের’ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এটি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করার পথ প্রশস্ত করে। জানা গিয়েছে, ‘আগামী সপ্তাহগুলিতে’ও সরাসরি মোদী-ট্রাম্প কথোপকথনের পথ প্রশস্ত হবে।
যদি আরআইসি-র সত্তা ট্রাম্পের সঙ্গে লেনদেনে এই ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারে, তা হলে ভারত ভবিষ্যতে রাশিয়া এবং চিনের সঙ্গে একই ধরনের আলোচনায় লিপ্ত হতে প্রলুব্ধ হতেই পারে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ফিন্যানসিয়াল এক্সপ্রেস-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President - ORF and Studies at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with ...
Read More +
Aleksei Zakharov is a Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. His research focuses on the geopolitics and geo-economics of Eurasia and the Indo-Pacific, with particular ...
Read More +