এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দি ইকোনমিক টাইমস-এ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চিন সফরের মূল লক্ষ্য ছিল এই দুই বিশ্বশক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করা। দুই নেতা শি জিনপিং এবং ট্রাম্প স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার লক্ষ্যে আলোচনায় অংশ নেন। কোনও বড় ধরনের অগ্রগতি না হলেও উভয় দেশই সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার জন্য ধাপে ধাপে পদক্ষেপ করতে সম্মত হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা সম্পর্কের অবনতি সংক্রান্ত বিপদকে স্বীকার করে নিয়েছে।
এই সপ্তাহে ট্রাম্পের চিন সফর ক্রমবিকাশমান বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন-চিন সম্পর্কের চিরস্থায়ী কেন্দ্রীয় ভূমিকাকেই তুলে ধরেছে। বেজিংয়ে সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের প্রায় ন’বছর পর এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান বৈরিতাপূর্ণ পর্যায়ের প্রায় এক দশক পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এই শীর্ষ সম্মেলনটি কোনও কৌশলগত পুনর্গঠন নয়, বরং লাগামহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণাম সম্পর্কে তীব্র ভাবে সচেতন দুই শক্তির মধ্যে সঙ্কট ব্যবস্থাপনার একটি অনুশীলন হিসেবেই বেশি পরিগণিত হয়েছে।
আবহও ছিল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সজ্জিত। ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তগুলির জন্য বেজিং যে সমস্ত প্রতীকী আয়োজন করে থাকে, শি জিনপিং সে সবই ট্রাম্পকে দিয়ে করিয়েছেন: গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ বৈঠক, টেম্পল অফ হেভেন-এ সাংস্কৃতিক কূটনীতি এবং একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ভোজসভা। উভয় নেতাই স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং তথাকথিত ‘থুকিডাইডস ট্র্যাপ’-এর বিরুদ্ধে আবারও সতর্ক করেছেন। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক উষ্ণতার আড়ালে কাঠামোগত প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল।
এই সফরের সময়টিও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলমান বাণিজ্যিক সংঘাত, গভীরতর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইরান সংঘাতের অস্থিতিশীল প্রভাবের মধ্যেই এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হল। মার্কিন প্রতিনিধিদলের গঠনই ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারগুলিকে প্রতিফলিত করেছে। মার্কো রুবিও, পিট হেগসেথ এবং স্কট বেসেন্টের মতো ঊর্ধ্বতন ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কর্পোরেট আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ইলন মাস্ক, টিম কুক, জেনসেন হুয়াং এবং অন্যান্য ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। এই সব কিছুই দর্শায় যে, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা দ্বিপাক্ষিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ট্রাম্পের এই কৌশল শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনীতির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল ছিল, যা তাঁর এই বিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার বোঝাপড়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এই সফরটি ছিল বাস্তবসম্মত হিসেব-নিকেশ দ্বারা চালিত। ট্রাম্প এমন কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলেন, যা দেশের অভ্যন্তরে আমেরিকান প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে: মার্কিন কৃষি, মহাকাশ ও জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে চিনের বাড়তি ক্রয়, রেয়ার আর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থে উন্নততর প্রবেশাধিকার, ফেন্টানিলের পূর্বসূরি উপাদান নিয়ে সহযোগিতা এবং ইরান সঙ্কট স্থিতিশীল করতে চাওয়া - বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর বিষয়ে চিনের কিছুটা হলেও সমর্থন। ট্রাম্পের এই কৌশল শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনীতির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল ছিল, যা তাঁর এই বিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার বোঝাপড়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারে।
বেজিংয়ের উদ্দেশ্যও ছিল সমান ভাবে স্পষ্ট। চিন এই অস্থিতিশীল সম্পর্কে স্থিতিশীলতা চেয়েছিল। এমন এক সময়ে যখন চিনের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত চাপের সম্মুখীন, তখন শি জিনপিং শুল্ক, বিনিয়োগ নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে থাকা অনিশ্চয়তা কমাতে চেয়েছিলেন। বেজিং ইরানের মতো বৈশ্বিক বিষয়গুলিতে নিজেকে একজন দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল এবং একই সঙ্গে তাইওয়ানের বিষয়ে তার আপসহীন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিল, যেটিকে শি জিনপিং আবারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল পরিমিত হলেও নিতান্তই তুচ্ছ নয়। কোনও ব্যাপক অগ্রগতি হয়নি, কোনও যুগান্তকারী বড় সমঝোতা হয়নি এবং উল্লেখযোগ্য ভাবে কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিতবাহী কোনও বড় যৌথ বিবৃতিও দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে উভয় পক্ষই সম্পৃক্ততাকে স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া বিভিন্ন পদ্ধতির উপর মনোযোগ দিয়েছে। জানা গিয়েছে, আলোচনায় অসংবেদনশীল খাতগুলির জন্য নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির পাশাপাশি বাণিজ্য এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে পারস্পরিক অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইরানের বিষয়ে উভয় দেশই হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা এবং তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একমত হয়েছে। এটি এই যৌথ উপলব্ধিকে প্রতিফলিত করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলছে। তবে বৃহত্তর কৌশলগত প্রশ্নগুলিতে মতপার্থক্য অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই শীর্ষ সম্মেলনটি দেখিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিন তীব্র ভাবে প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেলেও উভয় দেশই এখন কোনও রক্ষাকবচ ছাড়া উত্তেজনা বৃদ্ধির বিপদ স্বীকার করে। তাই এই সফরটি অন্তর্নিহিত বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাইওয়ান, প্রযুক্তি রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং কাঠামোগত ভাবে আপসের প্রতি প্রতিরোধী।
বৃহত্তর বিশ্বের জন্য, এই শীর্ষ সম্মেলনটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস প্রদান করেছে। বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো স্থিতিশীলতার সঙ্কেতে ইতিবাচক ভাবে সাড়া দিয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানি প্রবাহকে ঘিরে থাকা উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে। তবুও এই বৈঠকটি এই বাস্তবতাকেও জোরদার করেছে যে, অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন-চিন সম্পর্কই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির নির্ধারক অক্ষ হিসেবে থাকবে। ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত অন্য প্রধান শক্তিগুলি এই অস্বস্তিকর ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে তাদের কৌশল সমন্বয় করতে থাকবে।
বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো স্থিতিশীলতার সঙ্কেতে ইতিবাচক ভাবে সাড়া দিয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানি প্রবাহকে ঘিরে থাকা উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে।
ভারতের জন্য এর প্রভাব বিশেষ ভাবে জটিল। আমেরিকা ও চিনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নয়াদিল্লি কৌশলগত ভাবে লাভবান হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক সমীকরণে ভারতের গুরুত্ব বাড়িয়েছে এবং একই সঙ্গে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ বৈচিত্র্যময় কৌশলকে ত্বরান্বিত করেছে। ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে যে কোনও দীর্ঘস্থায়ী টানাপড়েনের সম্পর্ক ভারতীয় কৌশলগত মহলে অনিবার্য ভাবে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করে, বিশেষ করে যদি তা ভারতের মতো দেশগুলির সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে আমেরিকার তাগিদ কমিয়ে দেয়।
এর পাশাপাশি এই দুই শক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাতে ভারতের তেমন কোনও আগ্রহ নেই। একটি তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল আমেরিকা-চিন সম্পর্ক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি কমায়, যা ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে এমন একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে পথ চলা, যেখানে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। কিন্তু তা ক্রমশ পরিমিত এবং লেনদেনমূলক রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।
ট্রাম্পের বেজিং সফর আমেরিকা-চিন সম্পর্কের মৌলিক গতিপথ পরিবর্তন করেনি। এটি কেবল এমন একটি বাস্তবতাকে পুনঃনিশ্চিত করেছে, যা উভয় পক্ষই আগে থেকেই বোঝে: সংঘাত বা আপস কোনওটিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্থিতিশীল পথ নয়। এর পরিবর্তে যা উদ্ভূত হচ্ছে তা হল, সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক দীর্ঘস্থায়ী পর্যায় — যা বাছাইকৃত সহযোগিতা, স্থায়ী অবিশ্বাস এবং অবিরাম কৌশলগত দর কষাকষি দ্বারা সংজ্ঞায়িত। ভারত-সহ সমগ্র বিশ্বকে সেই অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দি ইকোনমিক টাইমস-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +