ইথিওপিয়ার ভঙ্গুর শান্তি ফের ভেঙে পড়ছে এবং এ বার হর্ন অফ আফ্রিকায় আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা মাত্র এক হাত দূরে।
হর্ন অফ আফ্রিকায় আর একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনিয়ে উঠেছে, যা পরিস্থিতির এক অবাস্তব অনুভূতি দ্বারা সমর্থিত বলা চলে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (ইএনডিএফ) এবং টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট-এর (টিপিএলএফ) নেতৃত্বে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির একটি জোটের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ প্রায় দুই বছর ধরে চলে, যার ফলে ৬০০,০০০ মানুষ প্রাণ হারান এবং আরও ৯০০,০০০ ইথিওপিয়ান বাস্তুচ্যুত হন। ২০২২ সালের মার্চ মাসে অনির্দিষ্ট কালের জন্য মানবিক যুদ্ধবিরতির শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে আর একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই বছরের কিছু বেশি দিন স্থায়ী হয়।
গত যুদ্ধে ইথিওপিয়ান সরকারি বাহিনী শক্তিশালী ও সুসজ্জিত টিপিএলএফ এবং তার মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, যার মধ্যে ওরোমো লিবারেশন আর্মি (ওএলএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরিত্রিয়া সেই সময়ে সরকারের পক্ষ নিয়েছিল এবং টিপিএলএফ-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছিল। তবে এ বার ইরিত্রিয়া পক্ষ পরিবর্তন করেছে বলে মনে হচ্ছে এবং ইএনডিএফ-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে বলে জানা গিয়েছে।
গত যুদ্ধে ইথিওপিয়ান সরকারি বাহিনী শক্তিশালী ও সুসজ্জিত টিপিএলএফ এবং তার মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, যার মধ্যে ওরোমো লিবারেশন আর্মি (ওএলএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইরিত্রিয়ার অবস্থানের পরিবর্তন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত নয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গেলে, ১৯৬২ সালে প্রাক্তন ইতালীয় উপনিবেশ ইরিত্রিয়াকে ইথিওপিয়া কর্তৃক সংযুক্ত করা হয়। ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে তিন দশকের যুদ্ধের পর দেশটি ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা লাভ করে, যার ফলে ইথিওপিয়া স্থলবেষ্টিত থাকে। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ইথিওপিয়ার প্রাইম মিনিস্টার আবি আহমেদ আলি ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন।
উন্নত সম্পর্কের ফলে টিপিএলএফ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যেই ইরিত্রিয়া আবি-র নেতৃত্বাধীন ইথিওপিয়ান সরকারকে সমর্থন করে। তা সত্ত্বেও আবি ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে পরামর্শ না করেই ‘প্রিটোরিয়া চুক্তি’ নামে পরিচিত একটি শত্রুতা নিরসন চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি ইরিত্রিয়াকে যারপরনাই বিরক্ত করেছিল এবং ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকি যে ভাবে চুক্তিটির বর্ণনা করেছিলেন, তাতে ইরিত্রিয়ার হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি স্পষ্টতই বলেছিলেন ‘টেকোলিফনা’ (আমরা হতাশ হয়েছি)। প্রিটোরিয়া চুক্তিতে ‘বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহারের’ বিধান থাকলেও ইরিত্রিয়া এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ ছিল না এবং ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরে কিছু সৈন্য মোতায়েন রেখেছিল।
ইতিমধ্যে ফানো নামে পরিচিত আর একটি মিলিশিয়া জোট - একটি জাতিগত-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী যারা আমহারার (ইথিওপিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী, যারা টিপিএলএফ-এর বিরুদ্ধে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে লড়াই করেছিল) প্রতিনিধিত্ব করে - ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে জাতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। ‘ফানো’ শব্দটি স্বাধীনতার সংগ্রামকেই বোঝায় এবং ১৯৩০-এর দশকে ইথিওপিয়ায় ইতালীয় ফ্যাসিবাদী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি স্বেচ্ছাসেবক সেনাবাহিনীর সফল অভিযানের সময় থেকে এই শব্দবন্ধের ব্যবহার শুরু হয়।
ফানো জাতীয় সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিল। কারণ তারা প্রিটোরিয়া চুক্তি থেকে বাদ পড়েছিল বলে মনে করেছিল। প্রিটোরিয়া চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা টিপিএলএফ ফানো এবং ওএলএ-র মতো সমস্ত আঞ্চলিক বাহিনীকে ভেঙে দেয়। ফানো এই দাবিকে তাদের টিকে থাকার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী অঞ্চল টিগ্রে ও ওরোমিয়া থেকে সম্ভাব্য আক্রমণের প্রেক্ষিতে।
ফানো জাতীয় সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিল। কারণ তারা প্রিটোরিয়া চুক্তি থেকে বাদ পড়েছিল বলে মনে করেছিল।
সর্বোপরি, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রাইম মিনিস্টার আবি আহমেদ সোমালিয়ার একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে একটি বিতর্কিত চুক্তি স্বাক্ষর করে লোহিত সাগর বন্দর অধিগ্রহণের বিষয়ে তাঁর ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেন। ইথিওপিয়ার সম্ভাব্য নাছোড় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ইরিত্রিয়া মিশর ও সোমালিয়ার সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তী কালে ইরিত্রিয়া সীমান্তে ইথিওপীয় সৈন্য মোতায়েন এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ইরিত্রিয়ার দেশব্যাপী সামরিক সমাবেশ হর্ন অফ আফ্রিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, যার ফলে যুদ্ধের সম্ভাবনা ঘোরতর হয়েছে।
প্রিটোরিয়া চুক্তির ফলে জাতীয় বাহিনীর সঙ্গে টাইগ্রে-র দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে এবং একই সঙ্গে টাইগ্রে-কে দুটি উপদল - টিপিএলএফ এবং টিগ্রে ইন্টেরিম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (টিআইএ) - বিভক্ত করা হয়। শান্তি চুক্তির পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইথিওপীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করে তাদের বিরোধ কূটনৈতিক ভাবে সমাধান করা। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এবং টিপিএলএফ-এর বর্তমান চেয়ারম্যান ডেব্রেটসন গেব্রেমাইকেলের নেতৃত্বে টিপিএলএফ-এর অন্যতম উপদল টিগ্রে-র স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতিতে নিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট গেটাচিউ রেডাকে উৎখাত করে। বিশেষ করে বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উপদলটির ইরিত্রিয়ার সঙ্গে যোগসাজশের সম্ভাবনা বেশি। যাই হোক না কেন, যেহেতু ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলগুলিকে সমর্থন করছে বলে মনে হচ্ছে, তাই টাইগ্রেতে হয়তো আর একটি প্রক্সি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।
এই ইথিওপীয় গ্রাউন্ডহগ ডে-র - যা প্রতি কয়েক বছরে একবার টাইগ্রে-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের আবির্ভাব ঘটায় - দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। ইথিওপিয়ার সংবিধানের ৩৯তম অনুচ্ছেদে প্রতিটি অঞ্চলকে বিচ্ছিন্নতার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং আঞ্চলিক বেসরকারি সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার এই আঞ্চলিক বিবর্তন ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ইথিওপিয়ার সংবিধানের ৩৯তম অনুচ্ছেদে প্রতিটি অঞ্চলকে বিচ্ছিন্নতার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং আঞ্চলিক বেসরকারি সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
হর্ন অফ আফ্রিকায় শান্তির পথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকেও সম্পৃক্ত করা উচিত। তুর্কিয়ে ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) উভয়েরই এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে এবং তারা এই অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে অনিচ্ছুক। মিশর এই অঞ্চলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশেষ করে নীল নদের জন্য বণ্টন এবং গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস বাঁধ (জিইয়ারডি) নিয়ে বিদ্যমান বিরোধের পটভূমিতে দুর্বল ইথিওপিয়া মিশরের জন্য সুবিধাজনক হলেও যদি এই দ্বন্দ্ব মাত্রাতিরিক্ত হয়, তা হলে সঙ্কটটি অবশ্যই মিশরের ক্ষতি সাধন করতে পারে। তা ছাড়া, একটি বিশৃঙ্খল লোহিত সাগরের শৃঙ্খল মিশরের অর্থনৈতিক জীবনরেখা অর্থাৎ সুয়েজ খালের মাধ্যমে বাণিজ্যের জন্য সহায়ক হবে না।
গতবার, ইথিওপিয়া তুর্কিয়েতে ও চিনে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে টিপিএলএফ-কে দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এ বার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি, বিশেষ করে ফানো, ভারী কামান ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থায় সজ্জিত। যদি এই বহিরাগতরা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হবে একটি অন্তহীন গৃহযুদ্ধ।
ইথিওপিয়ায় গ্রাউন্ডহগ ডে আবার আসন্ন। তবে এ বার ঝুঁকি আরও বেশি এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব রয়েছে। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হলে ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল অঞ্চলে তার পরিণতি আরও সুদূরপ্রসারী হবে। এটি সুদানের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে দিতে পারে, চাদকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং সাহেলকে লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে অস্থিরতার একটি করিডোর উন্মোচন করতে পারে। সমগ্র অঞ্চলটি একটি অনিশ্চিত ভারসাম্যের মধ্যেই দোদুল্যমান এবং হর্ন অফ আফ্রিকায় আর একটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে তা প্রতিরোধ করা জরুরি।
সমীর ভট্টাচার্য অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing ...
Read More +