Published on Jan 03, 2026 Updated 0 Hours ago

পাকিস্তানের কম-ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচেষ্টা পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায়, দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে এবং পারমাণবিক সংযম সম্পর্কিত বৈশ্বিক নিয়মকানুনকে দুর্বল করে।

কম-ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের বিভ্রম: দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট

অপারেশন সিন্দুরের পর পারমাণবিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগ কৌশলবিদদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে এই উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৫ সালেরবিপদ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কীভাবে চিনের উপর পাকিস্তানের নির্ভরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে ভারতকে পাকিস্তানের বিপদ হিসেবে দেখার মনোভাবের কারণে চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে পাকিস্তানের স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্র (এলওয়াইএনডব্লিউ) সংগ্রহও অন্তর্ভুক্ত। এলওয়াইএনডব্লিউ-‌গুলি, যা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র (টিএনডব্লিউ) নামেও পরিচিত, সেগুলোকে ২০ কিলোটনের কম ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।


এলওয়াইএনডব্লিউ- পেছনের যুক্তি হল, এগুলোর ব্যবহারের ফলে বিস্ফোরণের ব্যাসার্ধ সীমিত থাকবে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত আনুপাতিক প্রতিশোধেরজন্য এগুলোকে উপযুক্ত করে তোলে। তাই এগুলি সীমিত যুদ্ধ বা উত্তেজনা প্রশমনের একটি হাতিয়ার। তবে এই দাবিটি যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর।


উত্তেজনা প্রশমনের মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে, হিরোশিমা নাগাসাকির মতো সম্ভাব্য প্রভাব এবং পারমাণবিক অস্ত্র প্রদর্শনের বর্ধিত ক্ষমতাসহ স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্র পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এবং পারমাণবিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তোলে।


হিরোশিমা নাগাসাকিতে বোমা হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ঘোষণা করেছিলেন যে 'লিটল বয়' এবং 'ফ্যাট ম্যান' বোমা দুটির শক্তি ছিল ১৬ থেকে ২১ কিলোটন, যা স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তির মতোই। তবে, এর ফলাফল কোনও ভাবেই কৌশলগত বা সীমিত ছিল না। হিরোশিমায় প্রথম দিনেই আনুমানিক ৪৫,০০০ জন মারা যান এবং পরবর্তী চার মাসে আরও ১৯,০০০ জন মারা যান। নাগাসাকিতে প্রথম দিনেই ২২,০০০ জন নিহত হন এবং চার মাসে আরও ১৭,০০০ জন মারা যান। এছাড়াও, বোমা দুটি উভয় শহরের প্রায় ১৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছিল।


উত্তেজনা প্রশমনের মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে, হিরোশিমা নাগাসাকির মতো সম্ভাব্য প্রভাব এবং পারমাণবিক অস্ত্র প্রদর্শনের বর্ধিত ক্ষমতাসহ স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্র পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এবং পারমাণবিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তোলে। অতএব, স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে পাকিস্তান ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করার হুমকি দিচ্ছে।

পাকিস্তানের কৌশলগত পারমাণবিক অবস্থান এবং ভারতের পূর্বপ্রতিরোধ ব্যবস্থা

ভারতের পক্ষ থেকে হুমকির ধারণা পাকিস্তানের মধ্যে অপারেশন সিন্দুরের মাধ্যমে শুরু হয়নি। পাকিস্তানের প্রাক্তন কূটনীতিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল খালিদ কিদওয়াই ২০১১ সালে ভারতেরকোল্ড স্টার্টমতবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রনাসরক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বিকাশের কথা উল্লেখ করেন। নাসর ছিল পাকিস্তানেরফুল-স্পেকট্রাম ডেটারেন্স’ (‌পূর্ণ-‌পরিসর পূর্বপ্রতিরোধ)‌ মতবাদের একটি অংশ, যা ভারতের প্রচলিত সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রথম ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে।


অন্যদিকে, ভারত ধারাবাহিকভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম পূর্বপ্রতিরোধ নীতি অনুসরণ করে আসছে, যা কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রতি নিবেদিত এবং তার ঘোষিতনো ফার্স্ট ইউজ’ (এনএফইউ) নীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ভারতেরব্যাপক প্রতিশোধনেওয়ার ঘোষিত নীতিটি বিতর্কিত হলেও, এটি যে কোনও পারমাণবিক অস্ত্র (বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র, যার মধ্যে জৈবিক রাসায়নিক অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত) ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য পূর্বপ্রতিরোধক, এমনকি স্বল্প-মাত্রার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও।



নাসর ছিল পাকিস্তানেরফুল-স্পেকট্রাম ডেটারেন্স’ (‌পূর্ণ-‌পরিসর পূর্বপ্রতিরোধ)‌ মতবাদের একটি অংশ, যা ভারতের প্রচলিত সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রথম ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে।


সুতরাং, উত্তেজনা বৃদ্ধির দায়ভার পাকিস্তানের উপরই বর্তায়। যদি তারা প্রথম আঘাতে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তবে অস্ত্রের বিধ্বংসী ক্ষমতা নির্বিশেষে এটি একটি ব্যাপক ভারতীয় প্রতিক্রিয়া উস্কে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রতিরোধমূলক স্পষ্টতা স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ না করে বরং তা বৃদ্ধি করে। আসল স্ববিরোধিতা ভারতের প্রতিক্রিয়ায় নয়, বরং পাকিস্তানের এই ধারণার মধ্যে নিহিত যে একটি "সীমিত" পারমাণবিক হামলা পূর্ণাঙ্গ প্রতিশোধমূলক হামলাকে উস্কে দেবে না।

একটি আঞ্চলিক হুমকি, একটি বৈশ্বিক সতর্কতা

পাকিস্তানের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণ শুধু ভারতের জন্যই বিপদ নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বিপদ। সংঘাতের ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা কমিয়ে দিয়ে এটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া যখন তাদের নিজস্ব স্বল্প-ক্ষমতার অস্ত্রের মজুদ উন্নত করেছিল, তখনও তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের সমালোচনা করা হয়েছিল। এই ধরনের উন্নয়নের মাধ্যমে এই দুটি শীর্ষ পারমাণবিক শক্তি বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম পূর্বপ্রতিরোধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা সম্পর্কিত বৈশ্বিক নিয়মগুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনে ডব্লিউ৭৬- স্বল্প-ক্ষমতার ওয়ারহেড মোতায়েনকে রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি আনুপাতিক পূর্বপ্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল। তবে, এই যুক্তিটি কৌশলগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বিপজ্জনকভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী হওয়ায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। একই যুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও প্রযোজ্য।


পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার, তা যতই স্বল্প-ক্ষমতার হোক না কেন, এর বিধ্বংসী নিরাপত্তা প্রভাব বা এর ফলে সৃষ্ট বিকিরণের মানব পরিবেশগত স্বাস্থ্যগত পরিণতির কোনও পরিবর্তন ঘটায় না।



এই ধারণাটি বিপজ্জনক যে পারমাণবিক অস্ত্র একবার মোতায়েন করা হলে সেগুলিরব্যবস্থাপনাসম্ভব, বিশেষ করে এমন একটি পরিস্থিতিতে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট কোনো সীমারেখা নেই এবং জাতীয়তাবাদী আবেগ তুঙ্গে থাকে। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার, তার শক্তি যত কমই হোক না কেন, এর বিধ্বংসী নিরাপত্তা প্রভাব বা এর ফলে সৃষ্ট বিকিরণের মানব পরিবেশগত স্বাস্থ্যগত পরিণতির কোনও পরিবর্তন ঘটায় না। উপরন্তু, এই ধরনের মোতায়েন পরবর্তী সময়ে অস্ত্রের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করার জন্য সহায়ক নয়। যে কোনও পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার, তা যত সীমিতই হোক না কেন, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বাইরেও ব্যাপক প্রতিশোধ এবং সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে।

পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা পুনঃপ্রতিষ্ঠা

কম ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদ প্রশমিত করার জন্য ভারত, পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে অবিলম্বে এই অঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে এবং পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে সিদ্ধান্তমূলক লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ করতে হবে।

১। পারমাণবিক লাল রেখা নির্ধারণ করা: উভয় দেশকেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য তাদের সীমা নির্ধারণ করতে হবে। মতাদর্শগত অস্পষ্টতা ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে। ঐতিহাসিকভাবে, সংঘাতের সময় ভারতের প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই পারমাণবিক হুমকির বৃদ্ধি ঘটেছে; তাই, পাকিস্তান কোন পরিস্থিতিতে স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করতে পারে, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট থাকতে হবে।

২। পারমাণবিক সংলাপকে উৎসাহিত করা: আলোচনা, এমনকি যদি বৈশ্বিক শক্তি বা আইএইএ-এর মতো সংস্থাগুলির মতো তৃতীয় পক্ষের দ্বারা মধ্যস্থতা করা হয়, তবে তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করতে এবং পারস্পরিক উত্তেজনা প্রশমনের পদ্ধতিকে উৎসাহিত করতে পারে।
৩। সংকটকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা: হটলাইনগুলিকে উন্নত করা উচিত এবং ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। পারস্পরিক সংকটকালীন মহড়া এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য প্রমিত কর্মপরিকল্পনা উভয় সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতের সংঘাত আরও অনুমানযোগ্যভাবে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করতে পারে।
৪। বহুপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংলাপে স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা: এনপিটি- আওতার বাইরে হলেও, ভারত পাকিস্তানকে অবশ্যই আইএইএ-নির্দেশিত বা রাষ্ট্রপুঞ্জের ফোরামে কৌশলগত পারমাণবিক হুমকি নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হবে। আইএইএ স্বচ্ছতা কার্যক্রম সহজতর করতে পারে এবং বহনযোগ্য, স্বল্প-ক্ষমতার যন্ত্রপাতির জন্য যাচাইকরণ প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনার আয়োজন করতে পারে।

উপসংহার

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বল্প-ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি কমানো শুধু একটি আঞ্চলিক দায়িত্বই নয়, এটি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়ও বটে। সমসাময়িক যুদ্ধে সমতুল্য ক্ষয়ক্ষতিকে "সার্জিক্যাল" বা সুনির্দিষ্ট বলে কল্পনা করা অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে সরল বিশ্বাস। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের সীমা উচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখার জন্য আরও স্বচ্ছ নীতি, শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সহযোগিতামূলক সংযম প্রয়োজন।



শ্রবিষ্ঠ অজয়কুমার সেন্টার ফর সিকিউরিটি, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.