ইইউ-ঘানা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ইউরোপের পশ্চিম আফ্রিকা নীতিতে একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও সাহেলীয় নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে ঘানাকে একটি আঞ্চলিক ঘাঁটি হিসেবে শক্তিশালী করে।
২৪ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ঘানা একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব (সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিফেন্স পার্টনারশিপ বা এসডিপি) চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং কোনও আফ্রিকান দেশের সঙ্গে ইইউ-এর এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি।
সন্ত্রাসবাদী হুমকি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সাইবার হামলা ও হাইব্রিড হুমকি পর্যন্ত বিস্তৃত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা গভীর করার লক্ষ্যে প্রণীত এই ইইউ-ঘানা এসডিপি চুক্তিটি ইউরোপ ও পশ্চিম আফ্রিকার নিরাপত্তার আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে উভয় পক্ষের ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতিরই প্রতিফলন।
কৌশলগত প্রেক্ষাপট
পশ্চিম আফ্রিকার ক্রমশ খারাপ হতে থাকা নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ঘানার প্রতিবেশী দেশগুলিতে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির অনুপ্রবেশের প্রেক্ষাপটে ইইউ-ঘানা এসডিপি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশেষ করে, ঘানার উত্তরে অবস্থিত বুরকিনা ফাসোতে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস-সম্পর্কিত প্রাণহানি এবং গণ-স্থানচ্যুতির একটি বড় অংশ ঘটে থাকে। ঘানা বড় ধরনের আক্রমণের শিকার না হলেও আন্তঃসীমান্ত অস্থিতিশীলতা, ক্রমবর্ধমান শরণার্থী প্রবাহ এবং ঘানার ব্যবসায়ীদের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিটির ভঙ্গুরতাকেই তুলে ধরে। এই প্রেক্ষাপটে, ইইউ-ঘানা এসডিপির লক্ষ্য হল সাহেল অঞ্চলে জঙ্গিদের সহিংসতার বিস্তার রোধ করা।
স্থিতিশীল রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অভিযানগত সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে, এসডিপি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সাহেল অঞ্চলের বিপর্যয়ের পর পশ্চিম আফ্রিকায় তার নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা পুনর্বিন্যাস করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে ইইউক্যাপ সাহেল নাইজার এবং ইইউটিএম মালির মতো ইউরোপীয় মিশনগুলি স্থগিত করা হয়েছে।
তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী, রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস এবং পশ্চিম আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের (ইকোনমিক কমিউনিটি অফ ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস বা ইকোওয়াস) মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলিতে বিশিষ্ট নেতৃত্বের ভূমিকা-সহ একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে, এসডিপি ঘানাকে গিনি উপসাগর এবং পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চল জুড়ে স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি প্রধান ইউরোপীয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ দিকে, স্থিতিশীল রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অভিযানগত সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে, এসডিপি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সাহেল অঞ্চলের বিপর্যয়ের পর পশ্চিম আফ্রিকায় তার নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা পুনর্বিন্যাস করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে ইইউক্যাপ সাহেল নাইজার এবং ইইউটিএম মালির মতো ইউরোপীয় মিশনগুলি স্থগিত করা হয়েছে।
ইইউ-ঘানা এসডিপি-র পরিধি
পশ্চিম আফ্রিকার অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, ইইউ-ঘানা এসডিপি সন্ত্রাসবাদ দমন, চরমপন্থা, সঙ্কট ব্যবস্থাপনা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই চুক্তির পাশাপাশি ইইউ ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ইউরোপীয় শান্তি সুবিধা (ইউরোপিয়ান পিস ফেসিলিটি বা ইপিএফ) প্যাকেজের অধীনে ঘানার সশস্ত্র বাহিনীকে নজরদারি ড্রোন, মোটরসাইকেল এবং ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা-সহ ৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি প্রাণঘাতী নয়, এমন সামরিক সরঞ্জামের প্যাকেজ প্রদান করেছে। এই সরঞ্জামগুলির লক্ষ্য হল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ঘানাকে তার সীমান্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে ও সন্ত্রাসবাদী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করা। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠিত অপরাধ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা হল এসডিপি-র প্রধান লক্ষ্য। এর উদ্দেশ্য হল অরক্ষিত সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিদের সুবিধা নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রতিহত করা।
গিনি উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা আর একটি মূল উদ্দেশ্য, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ এবং জলদস্যুতা, মাদক পাচার ও অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইইউ-র দিক থেকে দেখলে, এই অঞ্চলে সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা অনিয়মিত অভিবাসন ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্য পূর্ণ। এসডিপি-তে উন্নত পরিস্থিতিগত সচেতনতা ও প্রতিরোধের জন্য ইইউ-এর সমন্বিত সামুদ্রিক উপস্থিতি (কোঅর্ডিনেটেড মেরিটাইম প্রেজেন্সেস বা সিএমপি) ব্যবস্থার অধীনে ইউরোপীয় নৌবাহিনীগুলোকে ঘানার নৌবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য ইয়াউন্দে কাঠামোকে সমর্থন করারও ব্যবস্থা রয়েছে।
ঘানার নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার মাধ্যমে ইইউ পশ্চিম আফ্রিকার সেই সব অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় সহায়তা করতে চায়, যা সরবরাহ শৃঙ্খল, অভিবাসন পদ্ধতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে।
ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ইইউ-এর অন্যান্য এসডিপি-র মতোই, ইইউ-ঘানা এসডিপি জলবায়ু ও পরিবেশগত চাপের মতো অপ্রচলিত নিরাপত্তা ক্ষেত্রগুলির পাশাপাশি ভুয়ো তথ্য এবং উদীয়মান প্রযুক্তি থেকে উদ্ভূত মিশ্র ধরনের হুমকিগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এই অংশীদারিত্ব একটি বিশেষ বার্ষিক শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংলাপ প্রতিষ্ঠা করে, যার লক্ষ্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
আফ্রিকায় ইইউ-এর বৃহত্তর কৌশল
এই এসডিপি ইইউ-ঘানার দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত ইইউ-ঘানা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির কাঠামোর অধীনে, ইইউ ঘানার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির কোকো ও অন্যান্য কৃষি রফতানির জন্য একটি প্রধান বাজার। অন্য দিকে, ঘানায় ইইউ-এর অর্থায়ন কর্মসূচিগুলি গ্লোবাল গেটওয়ে ইনিশিয়েটিভের অধীনে নগর উন্নয়ন, শাসন সংস্কার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে সমর্থন করে এবং গ্লোবাল-ইউরোপ নেবারহুড, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন ইন্সট্রুমেন্ট-এর (এনডিআইসিআই) অধীনে ২০২১-২০২৭ সময়কালের জন্য ৩৩৯ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে। ঘানার নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার মাধ্যমে ইইউ পশ্চিম আফ্রিকার সেই সব অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় সহায়তা করতে চায়, যা সরবরাহ শৃঙ্খল, অভিবাসন পদ্ধতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে।
আরও বিস্তৃত ভাবে বললে, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির মধ্যে আফ্রিকার সঙ্গে ইইউ-এর সম্পৃক্ততাকে নতুন করে সাজানোর এক বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হল এসডিপি। বিদ্যমান যুদ্ধগুলি যখন ইউরোপীয় সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ট্রান্সআটলান্টিক জোটের মতো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কগুলিকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে, তখন ইইউ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর জন্য তার অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনছে। নাইজেরিয়া ও সেনেগালের মতো অন্য আফ্রিকান দেশগুলির সঙ্গেও ইইউ-এর সম্পৃক্ততা বাড়ছে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আফ্রিকান-নেতৃত্বাধীন সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ইইউ-ঘানা এসডিপি এই যৌথ স্বীকৃতিকে প্রতিফলিত করে যে, সমসাময়িক নিরাপত্তা হুমকিগুলি আন্তঃরাষ্ট্রীয়, বহুমুখী ও অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত কারণগুলির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভাবে জড়িত।
উচ্চাভিলাষী পরিধি থাকা সত্ত্বেও, ইইউ-ঘানা এসডিপি কিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। প্রথমত, কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নত সরঞ্জামের পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বয় প্রয়োজন। সাহেল অঞ্চলে ইউরোপের অতীত অভিজ্ঞতা বাহ্যিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করেছে, বিশেষ করে যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা, স্থানীয় অগ্রাধিকার এবং সম্প্রদায়ের চাহিদার বিষয়গুলিকে বিবেচনা না করা হয়। সর্বোপরি, অংশীদারিত্ব এবং স্থানীয় মালিকানার উপর জোর দেয় এমন সক্ষমতা-বর্ধন উদ্যোগের জন্য ঘানার অংশীজনদের সাধারণ অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও, বিদেশি সামরিক সহায়তা সম্পর্কে আপত্তি ব্যাপক ভাবে বিদ্যমান।
ইইউ-ঘানা এসডিপি এই যৌথ স্বীকৃতিকে প্রতিফলিত করে যে, সমসাময়িক নিরাপত্তা হুমকিগুলি আন্তঃরাষ্ট্রীয়, বহুমুখী ও অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত কারণগুলির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভাবে জড়িত। ইইউ-এর জন্য, ঘানা একটি অস্থিতিশীল অঞ্চলে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার; ঘানার জন্য, এই চুক্তিটি জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বস্তুগত সম্পদ এবং সহায়তা প্রদান করে। আরও বিস্তৃত ভাবে দেখলে, এটি দু’টি মহাদেশকে সংযুক্ত করে, যেখানে স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান ভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত। যদিও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে, তবে এসডিপি পশ্চিম আফ্রিকায় আরও স্থিতিশীল নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে অবদান রাখতে পারে এবং আঞ্চলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঘানার ভূমিকাকেও শক্তিশালী করতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশটি ২০২৭ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের সভাপতিত্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শায়েরী মলহোত্র অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Shairee Malhotra is Deputy Director - Strategic Studies Programme at the Observer Research Foundation. Her areas of work include Indian foreign policy with a focus on ...
Read More +