অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ও কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে তেহরানের কাছে বেজিং অপরিহার্য, কিন্তু চিন তার যুদ্ধ মিত্র হতে প্রস্তুত নয়।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত সপ্তাহে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে আলোচনার জন্য বেজিং সফর করেন। এই সফরটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল আরাঘচির প্রথম চিন সফর। এই সংঘাত আঞ্চলিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে ব্যাহত করেছে, এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।
এই সফরের সময়টিও ছিল সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আলোচনার নির্ধারিত সময়ের মাত্র কয়েক দিন আগে আরাঘচি বেজিংয়ে পৌঁছন। স্বাভাবিকভাবেই, আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা, নিষেধাজ্ঞা, এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বেজিং উত্তেজনা প্রশমন, কূটনীতি এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার উপর তার চিরাচরিত গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে, এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অপরিহার্যতার উপরও জোর দিয়েছে। অন্যদিকে, আরাঘচি চিনের চার-দফা শান্তি প্রস্তাবের কয়েকটি উপাদানকে সমর্থন করেছেন, এবং এই সংকট তেহরানের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে যুক্তি দিয়ে ইরানের স্থিতিস্থাপকতা তুলে ধরেছেন।
বেজিং উত্তেজনা প্রশমন, কূটনীতি এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার উপর তার চিরাচরিত গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে, এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অপরিহার্যতার উপরও জোর দিয়েছে।
এই সফরটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে চিনের ক্রমবিকাশমান ভূমিকাকেই তুলে ধরে: যা প্রভাবশালী, কিছু ক্ষেত্রে অপরিহার্য, কিন্তু মৌলিকভাবে সতর্ক এবং তার নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশ দ্বারা সীমাবদ্ধ।
চিন আজ ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক জীবনরেখা। নিষেধাজ্ঞার চাপ সত্ত্বেও, এটি ইরানের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা এবং সময়ে সময়ে তেহরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে থাকে। পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার সময়েও এই সম্পর্ক ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক স্বস্তি দিয়েছে। তেলের বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন-সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ এবং সোডিয়াম পারক্লোরেটের মতো রাসায়নিকসহ দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সরবরাহের সঙ্গে চিনা সংস্থাগুলির সংযোগের প্রতিবেদনগুলি এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে যে, বেজিং বিশ্বাসযোগ্য অস্বীকৃতি বজায় রেখে নীরবে ইরানের কৌশলগত স্থিতিশীলতার বিভিন্ন দিককে সক্ষম করেছে।
কূটনৈতিকভাবে, চিন নিজেকে একটি দায়িত্বশীল স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। বেজিং মার্কিন-ইজরায়েলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে, ইরানের ‘বৈধ অধিকার’ রক্ষা করেছে এবং যুদ্ধবিরতি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংলাপের আহ্বানের মাধ্যমে নিজেকে এক সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই অবস্থানটি শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পছন্দের ভাবমূর্তির বিপরীতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অস্থিতিশীলতাকে তুলে ধরার জন্য চিনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে আরাঘচির সফরের ক্রমটি কোনওভাবেই আকস্মিক ছিল না; এটি বেজিংকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়েই পশ্চিম এশিয়ায় তার কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতার ইঙ্গিত দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
তবুও, চিনের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে লেনদেনমূলকই রয়ে গেছে। বেজিং ইরানের কম মূল্যের তেল এবং অন্য একটি আঞ্চলিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্যদিকে থাকায় লাভবান হয়, কিন্তু গভীর কৌশলগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে তারা তেমন আগ্রহ দেখায়নি। একটি আনুষ্ঠানিক মিত্রের মতো আচরণ না করে চিন তেহরানের প্রতি প্রকাশ্য সামরিক প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলেছে এবং এই অঞ্চল জুড়ে, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং এমনকি ইজরায়েলের সঙ্গে, যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে, সেখানে তার সম্পর্ককে সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ রাখছে। ইরানের প্রতি সীমিত বস্তুগত সহায়তার প্রতিবেদনগুলি এমনভাবে পরিকল্পিত বলে মনে হয়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়ানো যায় বা চিনের বৃহত্তর স্বার্থ বিপন্ন না হয়।
বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইরান সংকট ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি বা তাইওয়ান—যে বিষয়েই হোক না কেন—বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতায় বেজিংকে কার্যকর সুবিধা প্রদান করে।
বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইরান সংকট ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি বা তাইওয়ান—যে বিষয়েই হোক না কেন—বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতায় বেজিংকে কার্যকর সুবিধা প্রদান করে। একই সঙ্গে, যখন চিন নিজেকে সংযম ও সার্বভৌমত্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন গ্লোবাল সাউথের নেতা এবং 'অভিন্ন ভবিষ্যতের জনসম্প্রদায়'-এর প্রবক্তা হিসেবে তার আত্মপরিচয় আরও শক্তিশালী হয়। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার দ্বারা সীমাবদ্ধ। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারী হিসেবে চিনের প্রধান অগ্রাধিকার হল জ্বালানি নিরাপত্তা এবং এমন দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত প্রতিরোধ করা, যা তার ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এটিই ইরানের উপর চিনের প্রভাবের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করে। সম্পর্কটি অপ্রতিসম, কিন্তু এমনভাবে নয় যা আবশ্যিকভাবে নির্ণায়ক প্রভাবে রূপান্তরিত হয়। ইরান জ্বালানি রাজস্ব এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য চিনের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তবুও চিনের কাছে একাধিক বিকল্প জ্বালানি উৎস রয়েছে, এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যার মধ্যে বহুল প্রচারিত ২০২১ সালের কৌশলগত অংশীদারী চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত। অধিকন্তু, ইরানের তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ আধা-বেসরকারি চিনা শোধনাগারগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, যা বেজিংয়ের সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রাকে সীমিত করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চিন তেহরানকে কোনও অর্থবহ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেয় না। বেজিং ধারাবাহিকভাবে এমন সব প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলেছে যা তাকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে সামরিকভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে, অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও, ইরান চিনের পছন্দের পরিবর্তে জমানার টিকে থাকা এবং আদর্শগত বিবেচনার দ্বারা চালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত কৌশলগত পথ অনুসরণ করে চলেছে। আঞ্চলিক প্রক্সি এবং মিলিশিয়া নেটওয়ার্কগুলিকে ঘিরে পূর্ববর্তী ঘটনাগুলি ইতোমধ্যেই বাস্তব পর্যায়ে ফলাফল নির্ধারণে বেজিংয়ের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করেছে।
চিন উত্তেজনা প্রশমনে উৎসাহিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য চাপ দিতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার বৃহত্তর সম্পৃক্ততায় এই সংকটকে কাজে লাগাতে পারে।
পরিশেষে, আরাঘচির এই সফর চিন-ইরান অংশীদারিত্বের গুরুত্ব এবং সীমাবদ্ধতা উভয়কেই তুলে ধরেছে। অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এবং কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে তেহরানের কাছে বেজিং অপরিহার্য, কিন্তু এটি ইরানের যুদ্ধকালীন মিত্র বা কৌশলগত নিশ্চয়তাদানকারী হতে প্রস্তুত নয়। চিন উত্তেজনা প্রশমনে উৎসাহিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য চাপ দিতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার বৃহত্তর সম্পৃক্ততায় এই সংকটকে কাজে লাগাতে পারে। যা এটি করতে পারে না — এবং চেষ্টা করতেও অনিচ্ছুক বলে মনে হয় — তা হল ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলিকে মৌলিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এটি পশ্চিম এশিয়ায় চিনা রাষ্ট্রপরিচালনার বৃহত্তর ধরনকেই প্রতিফলিত করে: বাস্তববাদী, ঝুঁকি-বিমুখ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের বোঝা না নিয়ে প্রভাবকে সর্বোচ্চ করার জন্য সতর্কভাবে পরিকল্পিত।
এই ভাষ্যটি প্রথম এনডিটিভি-তে প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +