Published on Apr 22, 2026 Updated 0 Hours ago
লক্ষ্য সম্মিলিত উদ্যোগ: ইউরোপ এবং গ্লোবাল সাউথ

বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টায় ইউরোপ একাধিক উভয়সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ইউরোপকে তার অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সতর্ক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে চাপ দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্নতাবাদ বৃদ্ধির সময় ইউরোপ বৈশ্বিক ব্যবস্থায় তার অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত ও সুসংহত করতে চাইছে। গ্লোবাল সাউথও নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এবং তারা জলবায়ু কার্যক্রম, উন্নয়ন অর্থায়ন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ প্রকাশ করছে। যখন অন্য দেশগুলি বাইরে থেকে নির্ভরশীল অংশীদারিত্বের মডেল প্রস্তাব করে চলেছে, তখন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলি বৈশ্বিক শাসনের ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাবের একটি ন্যায্য অংশ চাইছে।

কেন ইউরোপ এবং গ্লোবাল সাউথের একে অপরের প্রয়োজন

ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকারের কারণে, গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে ইউরোপের সম্পৃক্ততা রূপান্তরমূলক হওয়ার চেয়ে বেশি হয়েছে লেনদেনমূলক প্রকৃতির। ইইউ উন্নয়ন সহায়তার অন্যতম বৃহত্তম প্রদানকারী হওয়া সত্ত্বেও, সামগ্রিকভাবে ইউরোপ গ্লোবাল সাউথের উদ্বেগের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের আরামদায়ক বলয়ে নিশ্চিন্তে থাকার সময় ইউরোপীয় ঐক্য বিস্মৃত হয়েছে। ইউরোপের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক জাগরণ বরং অর্থনৈতিক বিভাজন, দুর্বল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ইউরোপীয় একীকরণের অভাব, নীতির অসঙ্গতি এবং সংকীর্ণ স্বার্থের প্রাধান্যকে উন্মোচিত করেছে।

চলতি মার্কিন-চিন শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে যখন ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক এবং ন্যাটো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে, তখন ইউরোপ দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ইউরোপের ভেতরে ও বাইরে চলতি অস্থিরতা গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে কৌশলগত এবং উদ্ভাবনী ধরনের অংশীদারিত্ব অপরিহার্য করে তুলেছে। যদিও কয়েক দশক ধরে গ্লোবাল সাউথ ইইউ-এর বিদেশ, উন্নয়ন এবং বাণিজ্য নীতিতে ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়েছে, ইউরোপের অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততা বেশ হতাশাজনক এবং নব্য-ঔপনিবেশিক প্রবণতায় পরিপূর্ণ থেকেছে। সমালোচকেরা বারবার তুলে ধরেছেন যে, কীভাবে ইউরোপ-‌কেন্দ্রিকতা উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রান্তিক করে এবং তাদেরকে সমান অংশীদার হিসেবে না দেখে শুধু বিনিয়োগ ও কাঁচামালের বাজারের মর্যাদায় নামিয়ে এনে এর অংশীদারিত্ব দুর্বল করেছে। একটি আদর্শিক শক্তি হিসেবে ইউরোপ বহুপাক্ষিকতা, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের মূল্যবোধের কথা প্রচার করে, কিন্তু এর ঘোষিত নীতি এবং বিদেশে তার বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। ইউরোপের সমস্যাগুলির মূল কারণ হল এর পরিবর্তনশীল অগ্রাধিকার, সদস্য রাষ্ট্রগুলির ভিন্ন ভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বহুপাক্ষিকতার একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়ার প্রচেষ্টায় উদ্ভূত কিছু অনিবার্য ভণ্ডামি।

সহজ কথায়, একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই বহুপাক্ষিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য বহুপাক্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইউরোপের প্রয়োজন গ্লোবাল সাউথের সক্রিয় ভূমিকা। গ্লোবাল সাউথেরও ইউরোপকে প্রয়োজন—ক্রমবর্ধমান ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল ক্ষেত্রগুলির জন্য সর্বজনীন মানদণ্ড ও টেকসই বিধিবিধানের বাহ্যিক আরোপ, এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন কৌশলের নতুন মূল ভিত্তি হিসেবে অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্রমাগত প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টিতে বিশ্বাসযোগ্যতা জোগাতে।

বিশ্বাস, কৌশল এবং আপস

ইউরোপের বৈশ্বিক সংযোগ কর্মসূচি পারস্পরিক স্বার্থ এবং সুনির্দিষ্ট অংশগ্রহণের উপর ভিত্তি করে আকর্ষণীয় অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রচুর সুযোগ তৈরি করে। ইইউ-এর গ্লোবাল গেটওয়ে পরিকাঠামো উদ্যোগটি ইউরোপের মধ্যে বাস্তবতার উদয় এবং উদীয়মান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি সাড়া দেওয়ার সচেতনতার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই সম্পর্ক ও সংযোগ স্থাপনের উপর উদ্যোগটির মনোযোগ থাকা সত্ত্বেও, এটি গ্লোবাল সাউথের সমালোচনার মুখে পড়েছে। সমালোচকেরা এটিকে ইইউ-এর একটি নিছক রিব্র্যান্ডিং কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নতুন আর্থিক প্রবাহ যোগ না করে বিদ্যমান উপকরণগুলিকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করে, এবং সম্মিলিত পদক্ষেপকে উৎসাহিত করা বা বাস্তব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ফলাফল প্রদানে ধীর।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক হুমকি এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে ভূ-রাজনৈতিক বিঘ্নের সম্মুখীন হয়ে ইউরোপকে অবশ্যই তার শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করতে হবে, অনুন্নত ক্ষেত্রগুলিতে বিচক্ষণ বৈচিত্র্যকরণ অনুসরণ করতে হবে, এবং গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির জন্য ন্যায়সঙ্গত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলি – বিশেষ করে ব্রিকস, জি-২০ এবং আইবিএসএ সংলাপের মাধ্যমে – অতিমারী-পরবর্তী বিশ্বে সক্রিয়ভাবে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করছে। ভারতের ২০২৩ সালের জি-২০ সভাপতিত্ব বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে “উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি এবং টেকসই সমৃদ্ধি”-কে তুলে ধরেছিল।

ইউরোপ স্বাস্থ্য, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের মতো দেশগুলির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যৌথ ও উদ্ভাবনী উন্নয়নমূলক সমাধান প্রদান করতে পারে, যা গ্লোবাল সাউথ, বিশেষ করে আফ্রিকা এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, তারা সীমিত ব্যবসায়িক প্রণোদনাযুক্ত অপ্রচলিত ক্ষেত্রগুলিতে স্বল্প খরচের সমাধান প্রদানের জন্য কাজ করতে পারে, যেখানে জলবায়ু অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা, জ্বালানি রূপান্তর, জ্ঞান সহযোগিতা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের উপর মনোযোগ দেওয়া হবে।


“একটি আদর্শিক শক্তি হিসেবে ইউরোপ বহুপাক্ষিকতা, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের মূল্যবোধের কথা প্রচার করে, কিন্তু এর ঘোষিত নীতি এবং বিদেশে তার বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে।”



একই সঙ্গে, ভৌত থেকে ডিজিটাল সংযোগ শক্তিশালী করা সমাজের মধ্যে প্রস্তুতি ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে, সাইবার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকে কাজে লাগাতে, এবং জনকেন্দ্রিক ও ফলাফল-ভিত্তিক প্রভাব তৈরিতে সহায়তা করবে। অংশীদারিত্বে উন্মুক্ততা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই ক্ষেত্রগুলিতে অগ্রগতি ইউরোপ এবং গ্লোবাল সাউথের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান উপাদান।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক শাসনের সংস্কারও গ্লোবাল সাউথের কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ এটি তাদের কৌশলগত দৃঢ়তা এবং মহাশক্তিগুলির সঙ্গে আলোচনায় তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে চিনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা একইসঙ্গে ইউরোপ এবং গ্লোবাল সাউথের কিছু সদস্যকে বিচলিত করছে, এবং বেজিংয়ের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য তাদের উভয়েরই রয়েছে। এটি ইউরোপের জন্য ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলির সঙ্গে নিজেদের অংশীদারিত্বকে বিশেষভাবে সাজিয়ে বহুপাক্ষিকতার গুরুত্ব সংরক্ষণ ও রক্ষা করার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। ঋণের বোঝা এবং অংশীদারিত্বের অস্থিতিশীল মডেলগুলির মতো সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য ইউরোপ যে প্রধান উপায়গুলি চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে একটি হল সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্যকরণ, এবং এই অন্তর্দৃষ্টিই গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে অংশীদারিত্বের বিকল্প মডেল অনুসন্ধানে তাদের চালিকাশক্তি হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ—এই সবগুলিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

অবশেষে, সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচন এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রসারের জন্য বাণিজ্য চুক্তিগুলি একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। ভারত সম্প্রতি একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করে চলেছে, যার একটি ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে এফটিএ আলোচনায় ব্রাসেলসের মন্থর অগ্রগতি সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত তার সংরক্ষণবাদী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলি থেকে বেরিয়ে আসা এবং গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ত্বরান্বিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা। এবং ইউরোপের ডিজিটাল প্রযুক্তি, মানব সম্পদ, জ্বালানি রূপান্তর ও পুঁজিবাজার উন্নয়নে বহির্মুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে, ইউরোপকে শুধু বাণিজ্য ও প্রযুক্তির উপর সহযোগিতামূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেই চলবে না, বরং আস্থা পুনরুদ্ধারের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। ইউরোপের জন্য তার ভূ-রাজনৈতিক জাগরণকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার সময় এসেছে। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে সক্রিয়, শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী এবং সত্যিকারের বহুকেন্দ্রিক অংশীদারিত্ব স্থাপন করা।



এই ভাষ্যটি প্রথম বিকেএইচএস ম্যাগাজিন -‌এ প্রকাশিত হয়েছিল।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.