যেহেতু বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা এবং জ্বালানি সঙ্কট সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করছে ও খরচ বৃদ্ধি করছে, তাই ভারতকে অবশ্যই স্বল্পমেয়াদি সহায়তার ঊর্ধ্বে উঠে স্থিতিস্থাপক, ক্ষিপ্র এবং আর্থিক ভাবে শক্তিশালী এমএসএমই গড়ে তুলতে হবে, যা দেশটির পরবর্তী পর্যায়ের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।
ভারতের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেজ বা এমএসএমই) খাতটি একটি কঠিন বছর পার করেছে, যা একে পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করেছে। প্রথমত, বাণিজ্য পুনর্গঠন এবং মার্কিন শুল্ক ভারতের রফতানি প্রতিযোগিতাকে ব্যাহত করেছে এবং জীবিকার জন্য গুরুতর সংকট সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়েছে লক্ষ লক্ষ স্বল্প-দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের উপর। অতি সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইজরায়েল সংঘাত ভারতীয় অর্থনীতির গোড়ায় নাড়া দিয়েছে, যার ফলস্বরূপ বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং মাল পরিবহণের খরচ বেড়েছে, দাম বেড়েছে জ্বালানি ও কাঁচামালের।
উদাহরণস্বরূপ, দেশের অন্যতম বৃহত্তম সেরামিক কেন্দ্র গুজরাতের মোরবিতে প্রোপেন সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ১০০টি সেরামিক ইউনিট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও ৪০০টি প্রোপেন-ভিত্তিক ইউনিট তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে। পেট্রোলিয়াম উপজাতের উপর নির্ভরশীল ভারতের বস্ত্রশিল্পে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকের অভাব ও পরিবহণ খরচ বৃদ্ধির ফলে প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। একই ভাবে, প্লাস্টিক ও পলিমার খাত - যেখানে বেশিরভাগ শিল্পই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) হিসেবে পরিচিত - তীব্র কাঁচামাল সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় কৃষি সরঞ্জাম, খেলনা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো বেশ কিছু সংশ্লিষ্ট শিল্প সরকারি সহায়তা চেয়েছে।
ভারতীয় এমএসএমইগুলি তাদের স্বল্প মূলধনী কাঠামো, উপকরণের উপর উচ্চ নির্ভরশীলতা, দুর্বল বাজার প্রবেশাধিকার, স্বল্প প্রযুক্তি গ্রহণ এবং খণ্ডিত পরিকাঠামোর কারণে বাহ্যিক ধাক্কার প্রতি বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাতকে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কেন্দ্র অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রতিক্রিয়ায় পেট্রোলের উপর আবগারি শুল্ক হ্রাস করেছে, ডিজেলকে আবগারি শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ জোরদার করার জন্য এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের উপর রফতানি শুল্ক আরোপ করেছে। বাণিজ্যকে সহায়তা করার জন্য সরকার রফতানি উন্নয়ন মিশনের অধীনে রিলিফ (অর্থাৎ রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড লজিস্টিকস ইন্টারভেনশন ফর এক্সপোর্ট ফেসিলিটেশন) চালু করেছে। এই প্রকল্পটি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক এবং এর লক্ষ্য হল হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে উদ্ভূত উচ্চ পণ্য পরিবহণ খরচ, বর্ধিত বিমা প্রিমিয়াম এবং রফতানি ঝুঁকি থেকে ভারতীয় রফতানিকারকদের রক্ষা করা। এ ছাড়াও, ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড রফতানিকৃত পণ্যে অন্তর্নিহিত কর ও শুল্ক সমন্বয়ের জন্য রডটেপ প্রকল্পটির সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সর্বোপরি, সরকার যুদ্ধ-সম্পর্কিত বিঘ্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলির জন্য ৩-৬ মাসের ঋণ পরিশোধ স্থগিতাদেশের কথা বিবেচনা করছে। এই অস্থায়ী সহায়তা ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে সাহায্য করবে। কারণ কাঁচামালের খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় এবং বাজারের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোভিড-১৯ সঙ্কটের সময়ও ব্যবসাগুলিকে বাহ্যিক ধাক্কা সামলাতে এবং ব্যাপক দুর্দশা এড়াতে সাহায্য করার জন্য অনুরূপ একটি স্থগিতাদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পণ্য প্রেরণের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অর্থায়নের জন্য বর্ধিত রফতানি ঋণের মেয়াদ ৪৫০ দিন পর্যন্ত বাড়ানোর কথাও ঘোষণা করেছে।
বৈশ্বিক ধাক্কার মুখে ভারতীয় এমএসএমই-এর দুর্বলতা মোকাবিলা
এই বাহ্যিক ধাক্কাগুলি নজিরবিহীন হলেও এগুলি একটি গভীরতর সমস্যা উন্মোচিত করে: আর তা হল, বিঘ্নের মুখে এমএসএমইগুলির দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। ভারতীয় এমএসএমইগুলি তাদের স্বল্প মূলধনী কাঠামো, উপকরণের উপর উচ্চ নির্ভরশীলতা, দুর্বল বাজার প্রবেশাধিকার, স্বল্প প্রযুক্তি গ্রহণ এবং খণ্ডিত পরিকাঠামোর কারণে বাহ্যিক ধাক্কার প্রতি বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এখন অপরিহার্য প্রশ্ন হল, কী ভাবে এই উদ্যোগগুলিকে এমন ধাক্কা সহ্য ও শোষণ করার জন্য যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক করে তোলা যায়।
সর্বপ্রথম, এমএসএমইগুলির কার্যকরী মূলধনের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দৈনন্দিন নগদ প্রবাহ ক্রমবর্ধমান উপকরণের মূল্যের আঘাত প্রশমিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লিকুইডিটি বাফার বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই রূপান্তরটির একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তনের রূপ নেওয়া উচিত, যেখানে দ্রুত নিষ্পত্তির নিয়মাবলির কঠোর প্রয়োগ, চালান-ভিত্তিক অর্থায়নের ব্যাপক ব্যবহার এবং ক্রেতা, অর্থায়নকারী ও সরকারি ক্রয় প্রবাহের পরিধি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ট্রেড রিসিভেবলস ডিসকাউন্টিং সিস্টেম-এর (ট্রেডস) গভীরতর প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এমএসএমইগুলির কার্যকরী মূলধনের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দৈনন্দিন নগদ প্রবাহ ক্রমবর্ধমান উপকরণের মূল্যের আঘাত প্রশমিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লিকুইডিটি বাফার বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
বর্তমানে ভারতে শ্রম-নিবিড় উৎপাদন ব্যাপক ভাবে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে, যার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল খণ্ডিত এবং স্থানীয়করণ দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। নীতিগত মনোযোগ অবশ্যই এমন সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরির দিকে সরাতে হবে, যা কাঁচামাল সংগ্রহকে মসৃণ করে, সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করে এবং লজিস্টিকস ও গুদামজাতকরণকে আরও দক্ষ করে তোলে। অভিন্ন সাধারণ পরিকাঠামো এবং স্থানীয়করণের উপর ভিত্তি করে ক্লাস্টার-ভিত্তিক মডেলগুলি আরও সমন্বিত মূল্য শৃঙ্খল তৈরি করতে পারে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে ভারতকে উৎপাদনের সিঁড়িতে উপরে উঠতে সাহায্য করতে পারে। এই ধরনের কেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বয় ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার সময় একটি রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করতে পারে, যা দূরবর্তী বা ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ পথের উপর নির্ভরতা কমায়, বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছে আরো প্রবেশাধিকার দেয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হলে উৎপাদন শৃঙ্খলগুলিকে আরও দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম করে।
প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষিপ্রতা অর্জন আর একটি বৈশিষ্ট্য, যা এমএসএমইগুলিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় আরও ভাল ভাবে প্রস্তুত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) বিশেষত বিশ্বব্যাপী বাজারে মজুতের প্রয়োজনীয়তা অনুমান করা, চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া, বরাতের উপর নজর রাখা এবং ডেলিভারির সময়সীমা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। এটি এমএসএমই-গুলিকে পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক চাহিদার ধরন, চালানের সময়সূচি এবং লজিস্টিক ব্যাঘাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সহায়তা করতে পারে, যার ফলে তারা আরও কার্যকর ভাবে উৎপাদন এবং ডেলিভারির পরিকল্পনা করতে পারে। এআই-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশনগুলো রুট অপটিমাইজেশন সক্ষম করে এবং ডেলিভারির সময়সীমা ১৫-২০ শতাংশ কমিয়ে এমএসএমইগুলির লজিস্টিকস কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে। একটি শক্তিশালী ডিজিটাল উপস্থিতি ই-কমার্স এবং ব্র্যান্ডের সুনাম তৈরির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য আরও সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) বিশেষত বিশ্বব্যাপী বাজারে মজুতের প্রয়োজনীয়তা অনুমান করা, চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া, বরাতের উপর নজর রাখা এবং ডেলিভারির সময়সীমা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করার অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পদ্ধতিগত সরলীকরণের মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধা প্রদান। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেস অ্যান্ড কাস্টমস-এর (সিবিআইসি) একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা এবং সহায়তার মাধ্যমে প্রক্রিয়া সরলীকরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিযুক্ত ব্যবসাগুলির জন্য স্বেচ্ছামূলক বিশ্ব কাস্টমস সংস্থা-ভিত্তিক কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেশনে এমএসএমই-এর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে, এমএসএমইগুলিকে শুধু প্রতিযোগিতা করার জন্যই নয়, বরং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করার জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। এখন সময় এসেছে এমএসএমইগুলিকে ছোট এবং পুরনো দিনের বা সেকেলে হিসেবে নয়, বরং ছোট, চটপটে, অভিযোজনক্ষম ও ভারতের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির আখ্যানের জন্য অপরিহার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।
শ্রুতি জৈন অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Shruti is an Associate Fellow at the Centre for Development Studies, Observer Research Foundation (ORF), where her research examines the intersections between policy, economic diplomacy ...
Read More +