জি২০-এর সভাপতিত্ব গ্রহণকারী প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে নজির তৈরি করার পর দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে বৈশ্বিক মঞ্চে আফ্রিকার বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেতৃত্ব প্রদর্শনের এক অনন্য সুযোগ রয়েছে।
আফ্রিকা মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (আফসিএফটিএ) বাস্তবায়নের জন্য বৃহত্তর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা একটি প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বর্তমানে আন্তঃআফ্রিকান বাণিজ্য মাত্র ১৬%, যা শক্তিশালী বাণিজ্য একীকরণের মাধ্যমে বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি আফ্রিকার জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়াতে পারে, যা ৩০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবে।
এছাড়াও, উন্নত বাণিজ্য শিল্পায়নকে উৎসাহিত করবে, যা আফ্রিকার দেশগুলিকে কাঁচামাল রপ্তানি থেকে আরও বৈচিত্র্যময়, উচ্চ-মূল্যের উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে সক্ষম করবে। এই পরিবর্তন অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাড়াবে এবং আফ্রিকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করবে, যার ফলে বহির্বিশ্বের বাজারের উপর নির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের জন্য একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করতে পারে।
তবে, আন্তঃআফ্রিকা বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হল একটি শক্তিশালী, আফ্রিকান-নেতৃত্বাধীন পেমেন্ট সিস্টেমের অভাব, যা দক্ষতার সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন পরিচালনা করতে সক্ষম। বর্তমানে মহাদেশের অভ্যন্তরের ৮০ শতাংশেরও বেশি পেমেন্ট সুইফট সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল, যা পশ্চিমী দেশগুলির মধ্যস্থতাকারী ব্যাঙ্কের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে।
এই প্রক্রিয়াটি উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটায় এবং লেনদেনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। আফ্রেক্সিমব্যাংকের মতে, আফ্রিকার ব্যবসাগুলি লেনদেনের কারণে বছরে আনুমানিক ৫ বিলিয়ন ডলার হারায়। এই উচ্চ ব্যয়ের প্রধান কারণ হল মুদ্রা রূপান্তর ফি, যা প্রতি লেনদেনে ৩% থেকে ৬% পর্যন্ত হয়ে থাকে, এবং অন্যান্য পরিষেবা চার্জ।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাইরেস এবং পশ্চিম আফ্রিকার সিএফএ ফ্রাঙ্ক জোনের মতো কিছু আঞ্চলিক ব্যবস্থা আংশিক সমাধান প্রদান করে। যদিও এগুলি অধিক সাশ্রয়ী এবং বিলম্ব কমায়, তবে এদের কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাইরেস-এর দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ডের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রায়শই জোটের ছোট অর্থনীতিগুলিকে প্রান্তিক করে তোলে, যা ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণকে সীমিত করে।
ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ আফ্রিকা এবং ইকোব্যাঙ্কের মতো প্যান-আফ্রিকান ব্যাঙ্কগুলিও তাদের আঞ্চলিক উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে মহাদেশব্যাপী পেমেন্ট সমাধান তৈরির চেষ্টা করেছে।
এদিকে, আফ্রিকার প্রায় ২০টি দেশ ছোট আকারের আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের জন্য এম-পেসা এবং অরেঞ্জ মানির মতো মোবাইল মানি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। অন্য দেশগুলি ডলারের উপর নির্ভরতা এড়াতে দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার পথ বেছে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে নাইজেরিয়া ও চিন ২.৫ মিলিয়ন ডলারের একটি মুদ্রা বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা উভয় দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নাইরা বা ইউয়ান যে কোনও মুদ্রায় বাণিজ্য লেনদেন নিষ্পত্তি করার সুযোগ করে দেয়।
একইভাবে, ২০২৩ সালে তানজানিয়া ও ভারত তানজানিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় রুপি ব্যবহারের চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা স্থানীয় মুদ্রায় সরাসরি বাণিজ্যকে সহজতর করেছে।
এছাড়াও, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ আফ্রিকা এবং ইকোব্যাঙ্কের মতো প্যান-আফ্রিকান ব্যাঙ্কগুলিও তাদের আঞ্চলিক উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে মহাদেশব্যাপী পেমেন্ট সমাধান তৈরির চেষ্টা করেছে। তবে, সীমিত প্রসার এবং আন্তঃকার্যকারিতার চ্যালেঞ্জের কারণে এই প্রচেষ্টাগুলি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
আরও প্রত্যন্ত এবং অনুন্নত অঞ্চলগুলিতে বিনিময় প্রথা এবং নগদ অর্থের মতো অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এখনও প্রচলিত রয়েছে, যা মহাদেশের বাণিজ্য বাস্তুতন্ত্রকে আরও খণ্ডিত করছে।
একটি সমন্বিত, সম্প্রসারণযোগ্য ও সহজলভ্য আফ্রিকান পেমেন্ট পরিকাঠামো ছাড়া আন্তঃআফ্রিকা বাণিজ্যের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। খরচ কমানো, বাণিজ্যের দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং আফ্রিকার মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের (আফসিএফটিএ) পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য এই ঘাটতিগুলি পূরণ করা অপরিহার্য।
একটি আফ্রিকী সমাধানের পথে
২০২২ সালে, আফসিএফটিএ কাঠামোর অধীনে, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং আফ্রেক্সিমব্যাঙ্ক প্যান-আফ্রিকান পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেম (পিএপিএসএস) চালু করেছে, যা একটি আর্থিক পরিকাঠামো এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় আন্তঃআফ্রিকা লেনদেন করা সম্ভব। বিদেশি মুদ্রা এবং বিদেশি মধ্যস্থতাকারীদের প্রয়োজনীয়তা দূর করে পিএপিএসএস লেনদেনের খরচ কমানো, বিলম্ব হ্রাস করা এবং বাণিজ্যের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
তবে, উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গিয়েছে। প্রায় ৪৫% আফ্রিকান প্রাপ্তবয়স্কের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই, এবং ৪০%-এর ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই, যা একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ও আর্থিক পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সুবিধা বণ্টনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে, অন্যদিকে অতি মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি এই ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা তৈরি করে।
আলজেরিয়া এবং সুদানের মতো দেশগুলি এখনও পুরনো পদ্ধতির উপর নির্ভর করে চলেছে, এবং পিএপিএসএস-এর স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে এর ব্যাপক প্রচলন ধীর হয়ে পড়েছে।
দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সুবিধা বণ্টনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে, অন্যদিকে অতি মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি এই ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা তৈরি করে।
জি২০-র সভাপতি হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তঃআফ্রিকা বাণিজ্যকে আরও গভীর করার পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছে। শুল্ক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে এবং এসএসিইউ ও এসএডিসি-র মধ্যে বাণিজ্য প্রসারে এর সাফল্য এটিকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
রুয়ান্ডা, মরক্কো ও কেনিয়ার মতো দেশগুলিতে দেখা আঞ্চলিক বাণিজ্য সহজীকরণ মডেলগুলির সর্বোত্তম অনুশীলন প্রচার এবং সেগুলির প্রচলনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা পিএপিএসএস-এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং আফ্রিকার অর্থনৈতিক একীকরণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ করণীয়
দক্ষিণ আফ্রিকার জি২০ নেতৃত্ব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছিল। পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সংরক্ষণবাদের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে, ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত।
ডলার-নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার জন্য ব্রিকস দেশগুলির উপর ১০০% শুল্ক আরোপের হুমকি চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ব্রিকস এবং জি২০ উভয় সংস্থার সদস্য হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে একটি সেতুবন্ধনকারী ভূমিকা পালন করতে হবে, এবং গ্লোবাল নর্থ ও সাউথের দৃষ্টিভঙ্গিগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করতে হবে।
জি২০-র ‘সংহতি, সমতা এবং টেকসই উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্যের অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকা তিনটি মূল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে: দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস করা, একটি সক্ষম ও নৈতিক উন্নয়নমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে চালিত করা।
ফলস্বরূপ, দক্ষিণ আফ্রিকা তার জি২০ সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকাকে একটি বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের ২০৬৩ অ্যাজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। বিশ্বব্যবস্থায় চলমান কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে এই অ্যাজেন্ডার কিছু সংশোধন প্রয়োজন।
একটি মহাদেশীয় পেমেন্ট ব্যবস্থা অবশ্যই একটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে, যা অ্যাজেন্ডা ২০৬৩ বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রাখবে। জি২০-র সভাপতি হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্যই আফ্রিকার অগ্রাধিকারগুলি তুলে ধরেছে। একটি আরও সমন্বিত আফ্রিকার বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য পিএপিএসএস এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (ডিপিআই) মতো ব্যবস্থাগুলিকে সমর্থন করার মাধ্যমে আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা তার অ্যাজেন্ডার শীর্ষে থাকবে।
এই ভাষ্যটি প্রথম আইওএল -এ প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing global ...
Read More +