Published on Nov 26, 2025 Updated 0 Hours ago
দক্ষিণ আফ্রিকার জি২০ প্রেসিডেন্সি এবং গ্লোবাল সাউথ ধারাবাহিকতা

দক্ষিণ আফ্রিকার জি২০ সভাপতিত্ব আফ্রিকা এবং বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা পূর্ববর্তী গ্লোবাল সাউথ চেয়ারইন্দোনেশিয়া, ভারত এবং ব্রাজিলেরদ্বারা সৃষ্ট গতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে জি২০ গ্লোবাল সাউথের সভাপতিত্বের একটি নিরবচ্ছিন্ন চার বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করবে। এটি ধারাবাহিকতার একটি স্পষ্ট রেখা তৈরি করে এবং জি২০ অ্যাজেন্ডায় গ্লোবাল সাউথের উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সহায়তা করে।

২২ এবং ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জোহানেসবার্গের শীর্ষ সম্মেলনটি আফ্রিকার মাটিতে জি২০ নেতাদের প্রথম সমাবেশ। এই উপলক্ষটি প্রতীকীভাবে শক্তিশালী, কারণ এটি আফ্রিকাকে বৈশ্বিক শাসনের প্রান্তদেশ থেকে তার কেন্দ্রে স্থাপন করে। মজার বিষয় হল, ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের সময়ই মহাদেশীয় সংস্থা আফ্রিকান ইউনিয়ন জি২০-‌ স্থায়ী সদস্য হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ আফ্রিকা তার প্রেসিডেন্সির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটি মহাদেশীয় ম্যান্ডেট এবং বৈশ্বিক শাসন বিতর্কে অবদানকারী হিসেবে। এই গোষ্ঠীর একমাত্র আফ্রিকান সদস্য হিসেবে, এর নেতৃত্ব জাতীয় স্বার্থের বাইরেও বিস্তৃত এবং আরও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য মহাদেশের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে। এই আকাঙ্ক্ষা আফ্রিকার রাজনৈতিক দর্শনে, বিশেষ করে 'উবুন্টু' নীতিতে নিহিত। ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের থিম 'বসুধৈব কুটুম্বকম' (‌যার অর্থ "বিশ্ব এক পরিবার")‌-‌এর মতোই উবুন্টু অভিন্ন মানবতা, আন্তঃসংযুক্তি এবং সম্মিলিত দায়িত্বের উপর জোর দেয়।


তার উপর, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সির সময়টি গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুপাক্ষিকতার উপর আস্থা ক্ষয় হওয়ার এক মুহূর্তের সঙ্গে মিলে যায়।



তার উপর, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সির সময়টি গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুপাক্ষিকতার উপর আস্থা ক্ষয় হওয়ার এক মুহূর্তের সঙ্গে মিলে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, গাজা সংকটের মতো দ্বন্দ্বের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি চাপে রয়েছে। বাণিজ্য অস্ত্রায়ন এবং গ্লোবাল নর্থ সাউথের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভাঙনের মতো বিষয়গুলি বিশ্বব্যাপী শাসনকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে। একই সময়ে, বিশ্ব ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, প্রযুক্তিগত ব্যাঘাত, অতিমারি-পরবর্তী ধীর পুনরুদ্ধার, এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে একটি পদ্ধতিগত ঋণ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সম্মিলিত সমাধানগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জি২০-‌এর প্রাসঙ্গিকতা পুনর্নিশ্চিত করতে হবে।

এই বছরের অ্যাজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বব্যাপী বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ। তাই দক্ষিণ আফ্রিকা বৈষম্যের উপর একটি স্থায়ী বৈশ্বিক প্যানেল প্রতিষ্ঠার পক্ষে, যা পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ এবং নীতি নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। এটি দেশগুলির মধ্যে এবং দেশগুলির ভিতরে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য দূর করার জন্য বিশ্বব্যাপী অর্থায়ন কাঠামোতে সংস্কারও চায়।
 
দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় বিষয় হল খাদ্য নিরাপত্তা, যা এখনও সবচেয়ে জরুরি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাঘাতের কারণে আরও তীব্রতর হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা কৃষি উদ্ভাবন, জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক কৃষি অনুশীলন এবং ন্যায়সঙ্গত বণ্টন ব্যবস্থার উপর উন্নত সমন্বয়ের পক্ষ সমর্থন করে বিশ্বব্যাপী স্থিতিস্থাপকতা  বৃদ্ধির লক্ষ্য রাখে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির শাসন তৃতীয় অগ্রাধিকার। দক্ষিণ আফ্রিকা এআই-‌এর রূপান্তরমূলক উন্নয়নমূলক সম্ভাবনা এবং এর ঝুঁকি উভয়কেই স্বীকৃতি দেয়, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিভাজনকে আরও গভীর করবে এমন সম্ভাবনাকে। তার প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে, দক্ষিণ আফ্রিকা নৈতিক শাসন কাঠামো, ডিজিটাল পাবলিক পণ্যের ন্যায্য প্রাপ্যতা, এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলিকে প্রসারিত করার লক্ষ্য রাখে, যা নিশ্চিত করে যে এআই কাঠামোগত বৈষম্য পুনরুৎপাদন করার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিশীল বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ এবং সবুজ রূপান্তর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আফ্রিকায় পরিচ্ছন্ন শক্তি প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য খনিজ পদার্থের বিশাল মজুতের কারণে, দক্ষিণ আফ্রিকা জি২০-‌কে নিষ্কাশনমূলক অর্থনৈতিক মডেল থেকে দূরে সরিয়ে ন্যায়সঙ্গত সুবিধা প্রদান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ভাগ করা মূল্য সৃষ্টির দিকে নিয়ে  যাওয়ার লক্ষ্য রাখে। এই পদ্ধতিটি ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে সম্পদ সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলি আটকে ছিল বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের নিম্ন-মূল্যের অংশে, যেখানে ধনী দেশগুলি শিল্প রূপান্তরের লাভ তুলছিল।


আফ্রিকায় পরিচ্ছন্ন শক্তি প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য খনিজ পদার্থের বিশাল মজুতের কারণে, দক্ষিণ আফ্রিকা জি২০-‌কে নিষ্কাশনমূলক অর্থনৈতিক মডেল থেকে দূরে সরিয়ে ন্যায়সঙ্গত সুবিধা প্রদান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ভাগ করা মূল্য সৃষ্টির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রাখে।



সবশেষে, ঋণের স্থায়িত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় যা তার প্রেসিডেন্সির সময় সমাধান করা প্রয়োজন। অনেক আফ্রিকান দেশ তাদের জাতীয় আয়ের একটি অস্থিতিশীল অনুপাত ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ করে, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনে বিনিয়োগকে সীমিত করে। দক্ষিণ আফ্রিকা ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করেছে, এবং জি২০-‌ সাধারণ কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এবং দায়িত্বশীল ঋণ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও নমনীয় ব্যবস্থা চালু করতে আফ্রিকান প্যানেল অন ডেট-‌এর ফলাফল থেকে শক্তি সংগ্রহ করে।

তবুও দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চাভিলাষী অ্যাজেন্ডা ভয়াবহ বাধার সম্মুখীন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক শীর্ষ সম্মেলন বয়কটের ঘোষণা এবং মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রত্যাহার। যেহেতু জি২০ সিদ্ধান্তগুলি ঐকমত্যের উপর নির্ভর করে, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির অনুপস্থিতি আলোচনাকে জটিল করে তোলে, যার মধ্যে নেতাদের ঘোষণাপত্র জারি করার সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত। পরিহাসের কথা হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অনুরোধ করেছে যে তার অনুপস্থিতিতে কোনও ঘোষণা যেন গ্রহণ না করা হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা নিশ্চিত করেছে যে জি২০ "ব্যর্থ হওয়ার জন্য খুব বড়", কিন্তু বয়কট ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনকে তুলে ধরে এবং ফোরামের জন্য অস্তিত্বগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ঐকমত্যকে আরও বিপদের মুখে ফেলে। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য ব্লক এবং ব্রিকস-এর মধ্যে ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রতি কঠোর মনোভাব উন্নত উন্নয়নশীল সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাসের ইন্ধন জোগায়। একই সময়ে, জি২০ অর্থনীতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ চাপমূল্যস্ফীতি এবং ধীরগতির বৃদ্ধি থেকে শুরু করে মেরুকৃত রাজনৈতিক জলবায়ু পর্যন্তআন্তর্জাতিক সংস্কার অ্যাজেন্ডাগুলিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার জন্য তাদের ইচ্ছাকে হ্রাস করে। এমনকি একটি যৌথ ঘোষণাপত্র তৈরির প্রযুক্তিগত অনুশীলনও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে, যেমনটি সম্প্রতি জি৭-এর চুক্তিতে পৌঁছতে অক্ষমতা দ্বারা চিত্রিত হয়েছে।

এই অস্থির পটভূমিতে, জি২০ ত্রিত্বের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, এবং এখন দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত ত্রিত্ব, তীব্র ভূ-রাজনৈতিক বিঘ্নের সময় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিকে শক্তিশালী করেছে। এটি টানা চার বছর ধরে জি২০ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে গ্লোবাল সাউথ অগ্রাধিকারগুলিকে রাখার সুযোগ করে দিয়েছে।


দক্ষিণ আফ্রিকা শুধু একটি প্রগতিশীল উন্নয়ন এজেন্ডা এগিয়ে নিতেই চায় না, বরং গভীর অনিশ্চয়তার সময়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতেও চায়।



ইন্দোনেশিয়া জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে; ভারত ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামোকে বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের কল্যাণে উন্নীত করেছে; ব্রাজিল ক্ষুধা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাজেন্ডা এইগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি, এবং তা বৈষম্য হ্রাস এবং কাঠামোগত সংস্কারের উপর জোর দিয়েছে। সমন্বিত ত্রিত্ব পদক্ষেপের মাধ্যমে এই প্রেসিডেন্টরা নতুন প্রক্রিয়া, জোট কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিশেষে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সি আফ্রিকা গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত। দক্ষিণ আফ্রিকা শুধু একটি প্রগতিশীল উন্নয়ন এজেন্ডা এগিয়ে নিতেই চায় না, বরং গভীর অনিশ্চয়তার সময়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতেও চায়। উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, দক্ষিণ আফ্রিকার জি২০ প্রেসিডেন্সি নিশ্চিত করে যে বিশ্বব্যাপী সমস্যা সমাধানের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের প্রয়োজন, এবং একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলার জন্য আফ্রিকার কণ্ঠস্বর অপরিহার্য। এটি এমন একটি বার্তা যা ভারতীয় বিদেশনীতি এবং জি২০ অগ্রাধিকারের সঙ্গেও অনুরণিত হয়, যা আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কে চিহ্নিত করে।



এই ভাষ্যটি প্রথম এসএবিসি নিউজ -‌ প্রকাশিত হয়েছিল।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.