Published on Jun 03, 2025 Updated 0 Hours ago

মরিশাসের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতা একটি মুক্ত ও অবাধ’ পশ্চিম ভারতীয় অঞ্চলের প্রতি অবদান রাখবে।

সাগর থেকে মহাসাগর | ভারত মহাসাগরে ভারত নিজের ভূমিকা আরও জোরদার করছে

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক মরিশাস সফরের সময় ভারতীয় নৌবাহিনী মরিশাস কোস্টগার্ড হোয়াইট শিপিং (অর্থাৎ বাণিজ্যিক ও অসামরিক বাণিজ্য জাহাজের চলাচল) সংক্রান্ত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি প্রযুক্তিগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এটি মরিশাসের জলসীমায় অবৈধ মাছ ধরার ঘটনা ঠেকাতে সহায়তা করবে। তা ছাড়া মরিশাসের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতা একটি মুক্ত ও অবাধ’ পশ্চিম ভারতীয় অঞ্চল গঠনে অবদান রাখবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত সন্ধিক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় ট্রান্স-শিপমেন্ট পয়েন্টে (বা আন্তঃজাহাজ চলাচলের কেন্দ্রে) অবস্থিত মরিশাসের প্রায় ২.৩ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) রয়েছে এবং ৪০০,০০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল সেশেলসের সঙ্গে যৌথ ভাবে পরিচালিত। মরিশাসের নীল অর্থনীতির কার্যকলাপ তার জাতীয় জিডিপির ১০.৩ শতাংশকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং উপকূলীয় পর্যটন বাদে প্রায় ২০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান জোগায়

নীল অর্থনীতি মরিশাসের ক্ষেত্রে কেবল তার অর্থনীতির বিকাশ টিকিয়ে রাখার জন্যই নয়, বরং বন্দর অবকাঠামো, জাহাজ চলাচল, পর্যটন, সামুদ্রিক খাবার, মৎস্য, জলজ পালন, জলজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ক্ষেত্রগুলিতে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকে শক্তিশালী করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির একটি ‘সামুদ্রিক অর্থনীতির পথনির্দেশিকা’ রয়েছে এবং সম্প্রতি পথনির্দেশিকার বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে নীল অর্থনীতি, সামুদ্রিক সম্পদ, মৎস্য ও জাহাজ চলাচল মন্ত্রপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

মরিশাসের নীল অর্থনীতির কার্যকলাপ তার জাতীয় জিডিপির ১০.৩ শতাংশকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং উপকূলীয় পর্যটন বাদে প্রায় ২০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান জোগায়

তা সত্ত্বেও মরিশাস ইললিগ্যাল, আনরেগুলেটেড অ্যান্ড আনরিপোর্টেড বা অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত অপ্রতিবেদিত (আইইউইউ) মাছ ধরার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য পরিমাণের শিকার হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই আইইউইউ অনুশীলনের পরিবেশগত পরিণতির ভার বহন করছে মরিশাস। ভারত তার সামুদ্রিক সক্ষমতা তৈরিতে মরিশাসের দীর্ঘদিনের অংশীদার। ২০১৭ সালে ভারত মরিশাসের জাতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীকে যাবতীয় সরঞ্জাম-সহ একটি ইন্টারসেপ্টর বোট সি-১৩৯ লিজ দেয়।

হোয়াইট শিপিং চুক্তির পাশাপাশি ভারত প্রতিরক্ষা সম্পদ, যৌথ সামুদ্রিক নজরদারি, জলরাশি সংক্রান্ত মাপজোক এবং নিয়মিত টহল প্রদানের মাধ্যমে মরিশাসের বিশাল ইইজেড রক্ষায় সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে। এর আগে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজগুলি মরিশাসের জন্য বিনামূল্যে বেশ কয়েকটি হাইড্রোগ্রাফিক এবং সমুদ্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল, যার ফলে এই দেশটি তার প্রাচীন নৌ সংক্রান্ত তথ্য সংশোধন করতে এবং নতুন করে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

কিছু দিন ধরেভারতীয় নৌবাহিনী জলদস্যুতা অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং এই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য তার ইইজেড-এর যৌথ নজরদারির জন্য মরিশাসে নৌ জাহাজ মোতায়েন করছে।

ভারত ভারত মহাসাগর অঞ্চলের জন্য ইন্ডিয়ান ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টারের প্রতিষ্ঠা করে, যা হরিয়ানার গুরুগ্রামে তথ্য ভাগ করে নেওয়া এবং সহযোগিতার মাধ্যমে সামুদ্রিক ক্ষেত্র সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য একটি সহযোগিতামূলক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কেন্দ্র। মরিশাস সেশেলস উভয়ের পাশাপাশিই আরও ২০টি দেশ এই কর্মসূচির অংশ।

এই অঞ্চলের যে কোন সঙ্কটের প্রতিক্রিয়ায় মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারতের একটি শক্তিশালী ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে। ডিসেম্বরে ঘূর্ণিঝড় চিডোর কারণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের পর প্রথম প্রতিক্রিয়াকারীহিসেবে ভারতের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী নবীনচন্দ্র রামগুলাম সম্পর্ককে একটি উন্নত কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করে শ্রমিকদের উদ্ধার ও সঙ্কটের সময় পণ্য সরবরাহে ভারতের দ্রুত প্রতিক্রিয়ার স্বীকৃতি দিয়েছেন।

একটি প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (ডব্লিউআইওআর) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নয়াদিল্লির কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত মরিশাসের আগলেগা দ্বীপে একটি নতুন বিমানঘাঁটি জেটি উদ্বোধন করে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি ভারতের আগ্রহকেই দর্শায়। এই অবকাঠামো ভারতের সামুদ্রিক উপস্থিতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, যার ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা উন্নত হবে।

২০১৫ সালে মরিশাস সফরের সময় মোদী ভারতের সাগর (অঞ্চলে সকলের জন্য নিরাপত্তা এবং বৃদ্ধি) দৃষ্টিভঙ্গির কথা ঘোষণা করেন। এ বার ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গি মহাসাগর-এ (অঞ্চল জুড়ে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য পারস্পরিক সামগ্রিক অগ্রগতি) উন্নীত করেছে, যা ভারতের জন্য এই অঞ্চলের গুরুত্ব এবং এই অঞ্চলে ‘প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী’র ভূমিকা পালনে তার আগ্রহকেই দর্শায়।

ভারতীয় নৌবাহিনী ২২টি অংশীদার দেশের সঙ্গে হোয়াইট শিপিং চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং ১৭টি চুক্তি ইতিমধ্যেই কার্যকর রয়েছে। ২০২৩ সালে ভারত সেশেলসের সঙ্গে একই ধরনের হোয়াইট শিপিং চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

ভারতীয় নৌবাহিনী হোয়াইট শিপিং সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করার দরুন মরিশাস এই অঞ্চলের সেই দ্বিতীয় দেশ হয়ে উঠেছে, যারা অ-সামরিক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল পরিচয় সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ে সম্মত হয়েছে। চুক্তিতে রিয়েল-টাইম ডেটা ভাগাভাগির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে মরিশাসের বাণিজ্য করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

ভারত মহাসাগর কমিশন-এও (আইওসি) ভারতের পর্যবেক্ষকের মর্যাদা রয়েছে, যা পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই অঞ্চলের পাঁচটি উপকূলীয় দেশ অর্থাৎ মাদাগাস্কার, কোমোরোস, দ্য রিইউনিয়ন (ফরাসি বিদেশি অঞ্চল), মরিশাস সেশেলস-কে নিয়ে গঠিত একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা।

চুক্তিতে রিয়েল-টাইম ডেটা ভাগাভাগির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে মরিশাসের বাণিজ্য করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

এই অঞ্চলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং চিনের মতো শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটি রয়েছে, যা এই অঞ্চলটিকে প্রায়শই উপেক্ষা করে। অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাজ্য চাগোস দ্বীপের সার্বভৌমত্ব ধরে রেখেছিল, যা এখন আনুষ্ঠানিক ভাবে মরিশাসের অন্তর্গত। ফ্রান্স তার বিদেশি অঞ্চল দ্য রিইউনিয়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলে একটি উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ডব্লিউআইওআর-এর উত্তরে জিবুতিতে চিনের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। চিন ছাড়াও জিবুতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) নৌঘাঁটি রয়েছে। উভয় পক্ষ বর্ধিত কৌশলগত অংশীদারিত্বের জন্য যৌথ দৃষ্টিভঙ্গিউন্মোচন করার সঙ্গে সঙ্গে ভারত যৌথ সামুদ্রিক নজরদারির জন্য আরও জাহাজ বিমান মোতায়েন করতে প্রস্তুত। এর ফলস্বরূপ মরিশাসের সঙ্গে সামুদ্রিক সহযোগিতা এই অঞ্চলে ‘প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারীহিসেবে ভারতের ভূমিকা প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

 


এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ডেকান হেরাল্ড-এ।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.