২০২৫ সালের শেষের দিকে বিশ্ব বিগত কয়েক দশকের তুলনায় অনেক বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক শাসনের কাঠামোটি সমসাময়িক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে ক্রমশই বেমানান হয়ে পড়ছিল। শান্তি রক্ষা, সহযোগিতা সহজতর করা, এবং উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলি তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলিকে এখন সেকেলে, অ-প্রতিনিধিত্বমূলক এবং প্রায়শই অকেজো বলে মনে করা হচ্ছে।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের “সভ্যতার সংঘাত” এখনও প্রতিধ্বনিত হলেও, আজকের বৈশ্বিক বিভাজনগুলি আরও অনেক বেশি স্তরযুক্ত। পূর্ব বনাম পশ্চিমের মতো একটি সাধারণ দ্বৈততার পরিবর্তে, আজকের বিশ্ব একটি জটিল বহুমেরু পরিবেশের মুখোমুখি, যা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পরিবেশগত দুর্বলতা দ্বারা বিভক্ত। ফলস্বরূপ, বৈশ্বিক শাসন শুধু মূল্যবোধের দিক থেকেই নয়, বরং এর কাঠামো, কর্তৃত্ব এবং বৈধতার দিক থেকেও বিতর্কিত।
বৈশ্বিক শাসনের নড়বড়ে ভিত্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীরাই বর্তমান বৈশ্বিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জ (ইউএন), বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে একটি স্থিতিশীল ও নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। যদিও এই সংস্থাগুলি প্রায় ৮০ বছর ধরে বিশ্বকে তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু এখন তারা তা করতে ক্রমশ ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার পেছনে একটি বিশেষ কারণ হল এর সেকেলে কাঠামো, যেখানে মুষ্টিমেয় কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সমগ্র বিশ্বের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কেও একই ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান, যেখানে ধনী দেশগুলিরই ভোটাধিকারের ক্ষমতা বেশি অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলিই ঋণ, জলবায়ু এবং স্বাস্থ্য সংকটের চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার কেন্দ্রীয় সংস্থা রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদ এখনও ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার গতিপ্রকৃতিকেই প্রতিফলিত করে। ভেটো ক্ষমতা সম্পন্ন স্থায়ী সদস্য দেশগুলি (পি৫) — অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চিন — নিজেদের স্বার্থের সংঘাত ঘটলে প্রায়শই পরিষদকে অচল করে দেয়। প্যালেস্তাইন, সিরিয়া, ইউক্রেন, মায়ানমার, সুদান এবং অন্যান্য স্থানের যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে রাষ্ট্রপুঞ্জ ব্যর্থ হয়েছে। শান্তির রক্ষক হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে, রাষ্ট্রপুঞ্জকে প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক দম্ভ প্রদর্শনের একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়।
সমস্যাটি শুধু নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নয়, এর প্রতিনিধিত্ব নিয়েও। আশ্চর্যজনকভাবে, নিরাপত্তা পরিষদের অর্ধেকেরও বেশি আলোচ্যসূচি আফ্রিকার সংঘাত সম্পর্কিত হলেও, সেখানে কোনও আফ্রিকান দেশের স্থায়ী আসন নেই। বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের আহ্বান জানিয়ে ২০০৫ সাল থেকে আফ্রিকার আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে গৃহীত এজুলুইনি কনসেনসাসের প্রতি ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, এই মহাদেশটি শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভূমিকা থেকে বাদই রয়ে গিয়েছে। আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কেও একই ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান, যেখানে ধনী দেশগুলিরই ভোটাধিকারের ক্ষমতা বেশি অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলিই ঋণ, জলবায়ু এবং স্বাস্থ্য সংকটের চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
বহুমেরু মুহূর্ত এবং এর দ্বন্দ্বসমূহ
রাষ্ট্রপুঞ্জ-নেতৃত্বাধীন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার অনুভূত দুর্বলতার কারণেই ব্রিকস+ এবং অন্য বিভিন্ন ক্ষুদ্র-বহুপাক্ষিক সংস্থার উত্থান ঘটেছে। এই ঘটনাপ্রবাহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলির কার্যকারিতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রতিনিধিত্বমূলকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে, বহুমেরু বিশ্বের দিকে এই পরিবর্তন সম্ভাবনা ও বিপদ উভয়ই নিয়ে আসে। একদিকে, ব্রিকস+ এর মতো নতুন সংগঠনগুলো বৈশ্বিক বিষয়ে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাশী গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির জন্য বিকল্প মঞ্চের সুযোগ করে দেয়; অন্যদিকে, এই মঞ্চগুলি প্রায়শই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে এবং এদের প্রচলিত বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মতো প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অভাব রয়েছে।
এদিকে, ঠান্ডা যুদ্ধ যুগের দ্বিমেরু বিশ্বের মতোই, বিশ্ব আবারও দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনব্যবস্থার মডেল প্রত্যক্ষ করছে: মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাজার-চালিত কাঠামো বনাম চিনের রাষ্ট্র-চালিত উন্নয়ন মডেল। সতর্কতা ও নির্ভরশীলতার মাঝে পড়ে ইউরোপ ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি প্রথমটির দিকেই ঝুঁকেছে। এর মাঝে রয়েছে গ্লোবাল সাউথ, যা এই শক্তিগুলির মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজে চলা বিভিন্ন দেশের একটি সমষ্টি। এরা নিজেদের শাসনব্যবস্থার পথ প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ-নেতৃত্বাধীন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার অনুভূত দুর্বলতার কারণেই ব্রিকস+ এবং অন্য বিভিন্ন ক্ষুদ্র-বহুপাক্ষিক সংস্থার উত্থান ঘটেছে।
এই বিভাজন পণ্ডিতদের ভাষায় ‘এপিস্টেমিক ডিসোনেন্স’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক অসঙ্গতি তৈরি করে, যা নীতি এবং শাসনব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত তার মৌলিক প্রকৃতি নিয়ে গভীর কাঠামোগত মতবিরোধের জন্ম দেয়। চ্যালেঞ্জটি এখন আর শুধু পক্ষপাতিত্ব বা প্রতিনিধিত্বের অভাব নয়; এটি হল একটি ইউরোপ-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মডেল চাপিয়ে দেওয়া, যেখানে বিভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে পদ্ধতিগতভাবে বাদ দেওয়া হয়।
বৈশ্বিক শাসনের একটি নতুন মডেলের দিকে
বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যর্থতা শুধু বর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক বহুপাক্ষিক কাঠামোই পশ্চিমী আধিপত্য এবং সমরূপের ধারণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। এগুলি একবিংশ শতাব্দীর বহুত্ববাদী, বহুভাষিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না।
আফ্রিকার জন্য একটি নতুন শাসনব্যবস্থার মডেলকে অবশ্যই বিদ্যমান ব্যবস্থায় শুধু নতুন কণ্ঠস্বর যুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একে অবশ্যই মহাদেশটির সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে, দেশীয় জ্ঞানকে মূল্য দিতে হবে, এবং আফ্রিকার দেশগুলির নিজস্ব উন্নয়নের পথ নির্ধারণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। প্রায়শই, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থার কাঠামোতে আফ্রিকার এই জটিলতাকে উপেক্ষা করা হয়। যা প্রয়োজন তা হল আধিপত্যের পরিবর্তন নয়, বরং এমন নমনীয়, বিকেন্দ্রীভূত ও ন্যায্য ব্যবস্থা তৈরি করা, যা আরও ন্যায়সঙ্গতভাবে ক্ষমতা বণ্টন করবে এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করবে।
২০২৩ সালে জি-২০-র স্থায়ী সদস্যপদে আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) যোগদান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। অবশেষে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতার এই প্রধান ফোরামে আফ্রিকা একটি জোট হিসেবে প্রতিনিধিত্ব লাভ করেছে। এই মুহূর্তটি একটি ক্রমবর্ধমান ঐকমত্যকে প্রতিফলিত করে যে, এই মহাদেশকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)-র মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে আরও বেশি সংখ্যক আফ্রিকান নাগরিক নেতৃত্বের পদে আসীন হচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতার এই প্রধান ফোরামে আফ্রিকা একটি জোট হিসেবে প্রতিনিধিত্ব লাভ করেছে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন — যা আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম — আফ্রিকান দৃষ্টিভঙ্গির ক্রমাগত বর্জনের কারণে সৃষ্ট গভীর হতাশার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হবে। আফ্রিকার অগ্রাধিকারগুলি তুলে ধরার এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ: অস্থিতিশীল ঋণের পুনর্গঠন, ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি কমানোর একটি পথ তৈরি করা, এবং আফ্রিকার মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলকে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা।
প্রতীকী থেকে বাস্তব রূপায়ণ
বিশ্ব এখন শাসনব্যবস্থার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে উদীয়মান শক্তিগুলি নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বিশ্ব শাসনের ভবিষ্যৎ শুধু সংস্কারের দ্বারা নির্ধারিত হবে না। এর রূপ দেবে তারাই, যারা একেবারে গোড়া থেকে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে — এমন ব্যবস্থা যা হবে আরও ন্যায্য, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য আরও উপযুক্ত, যা শুধু ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী কয়েকটি দেশের স্বার্থের জন্য নয়।
সৌভাগ্যবশত, দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সেই বিরল সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছে। বিশ্ব শাসনে আফ্রিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান, এর জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চিন, রাশিয়া ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলি এর অংশীদারিত্বের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। তবে, আফ্রিকাকে অবশ্যই বিশ্ব প্রতিযোগিতার একটি নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্র হওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেমনটি এটি শীতল যুদ্ধের সময় ছিল। এর পরিবর্তে, নবায়িত দৃশ্যমানতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক রীতিনীতিকে প্রভাবিত করা এবং নিজস্ব শর্তে ফলাফল নির্ধারণ করা উচিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি থেকে অর্থবহ প্রভাবে উত্তরণের এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সভাপতিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
এই ভাষ্যটি প্রথম ব্রিকস অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল সাউথ -এ প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing ...
Read More +