Published on Aug 28, 2025 Updated 0 Hours ago

ইরান ইথিওপিয়ার নতুন নিরাপত্তা চুক্তি ব্রিকসের প্রভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে, যা হর্ন অফ আফ্রিকাশক্তি শৃঙ্খল পুনর্নির্মাণ করছে এবং পশ্চিমি প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

আঞ্চলিক সমীকরণের পুনর্গঠন: হর্ন অফ আফ্রিকায় ইরানের কেন্দ্রবিন্দু

হর্ন অফ আফ্রিকার ভূ-রাজনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিকসে যোগদানকারী নতুন দুটি সদস্য দেশ - ইরান ইথিওপিয়া - একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে প্রবেশ করেছে। এই অংশীদারিত্ব দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা এবং একই সঙ্গে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করার সম্ভাবনা রাখে।

২০২৫ সালের ৬ মে আদ্দিস আবাবায় আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার রূপরেখা রয়েছেযেমন— আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের মাধ্যমে সামরিক ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাকে আরও গভীর করে। সর্বোপরি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভূ-রাজনৈতিক সাযুজ্যতার জন্য এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি সত্ত্বেও এই চুক্তি বৃহত্তর হর্ন অফ আফ্রিকার সমীকরণে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

হর্ন অফ আফ্রিকাইরানের প্রভাব জোরদার করা

ইরানের জন্য এই চুক্তিটি আফ্রিকা জুড়ে তার রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই চুক্তিটি এই অঞ্চলে ইরানের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা পদক্ষেপের উপর ভিত্তি করে তৈরি - যার মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়ায় মোহাজের-৬-এর মতো নজরদারি এবং যুদ্ধ ড্রোন সরবরাহ - বিশেষ করে ২০২০-২০২২ সালের টাইগ্রে সংঘাতের সময়। এই সংঘাতে তেহরানের ভূমিকা তার ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরে। ইরান আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে শক্তিশালী জোট গড়ে তুলতে এটির ব্যবহার করেছে, বিশেষ করে এমন এলাকায় যেখানে অস্থিরতা প্রভাবের সুযোগ তৈরি করে।

এই চুক্তিটি ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা জোরদার করা, তার আঞ্চলিক কৌশলকে দৃঢ় করার ইচ্ছাকেও দর্শায়, যার মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়া এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতা। এটি ইথিওপিয়ার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেও দর্শায়, যা ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়েছিল, যখন হাইলে সেলাসির নেতৃত্বে ইথিওপিয়া তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশ হয়ে ওঠে। সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির বিদ্যমান কূটনৈতিক চাপ সত্ত্বেও হর্ন অফ আফ্রিকা অবস্থিত ইথিওপিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব এই অস্থির অঞ্চলে ইরানের উপস্থিতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তোলে।

ইথিওপিয়ার বাস্তববাদী বৈদেশিক নীতি

ইথিওপিয়ার জন্য নিরাপত্তা চুক্তিটি সেই সময় হয়েছে, যখন দেশটি দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টাইগ্রে সংঘাত কেবল দেশের সম্পদের সঙ্কোচনই করেনি, বরং ক্রমবর্ধমান জাতিগত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা জটিল নিরাপত্তা পরিবেশেও অবদান রেখেছে। ইরানের প্রতি ইথিওপিয়ার কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশটিকে তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে, যা তার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং জাতিগত মিলিশিয়া প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া উভয়ের হুমকি মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ইথিওপিয়াকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করে, যা সম্ভাব্য ভাবে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংঘাত পরিচালনা করার ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার সঙ্গে অস্থির পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখছে। ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে টাইগ্রে যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তবে বিতর্কিত অঞ্চল এবং সোমালিল্যান্ডে সম্ভাব্য লোহিত সাগর বন্দর অধিগ্রহণ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। এ বার ইরিত্রিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে। ইরানের সমর্থন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সম্ভব হয়েছে, যেখানে এটি ইথিওপিয়াকে এই সম্ভাব্য সংঘাতগুলি মোকাবিলায় সহায়তা করতে কার্যকর বলে প্রমাণিত হতে পারে।

নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ সত্ত্বেও ইথিওপিয়া ইরান সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রেখা অনুসরণ করছে। অতীতে দুটি দেশ প্রায়শই আঞ্চলিক সংঘাতের বিপরীত দিকে থেকেছে, যেমন ইয়েমেন সুদান। টাইগ্রে সংঘাতের সময় ইথিওপিয়া ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি উভয়ের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা নিতে সক্ষম হয়েছিল এবং হর্ন অফ আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিতে জটিল ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল।

ব্রিকস সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক শক্তি সমীকরণেউপর প্রভাব

ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চি, দক্ষিণ আফ্রিকা) সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে ইরান ইথিওপিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতাও তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিকস ব্লকের নতুন সদস্য হিসেবে উভয় দেশই বিশ্ব মঞ্চে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের জন্য নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। ব্রিকসে ইরান ইথিওপিয়ার অন্তর্ভুক্তি সংগঠনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, বিশেষ করে আফ্রিকায়। ইরান ইথিওপিয়ার অংশীদারিত্ব পশ্চিমি প্রভাবকে ভারসাম্যহীন করতে পারে এবং একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারে যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলি বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন দাবি করে।

সর্বোপরি, ইরান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টি ব্রিকসের বৈশ্বিক কৌশলের জন্যও বৃহত্তর প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রিকস যখন সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন এই সংস্থাটির নিরাপত্তা ক্ষেত্রে একটি প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান-ইথিওপিয়া নিরাপত্তা চুক্তি দর্শায় যে, কী ভাবে ব্রিকস সদস্যরা পশ্চিমি-অধ্যুষিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে একে অপরকে অর্থনৈতিক, সামরিক কৌশলগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতিকে পুনর্গঠন করতে পারে।

ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক

আশ্চর্যজনক ভাবে, এই নিরাপত্তা চুক্তি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি - মধ্যপ্রাচ্যে প্রাক্তন দীর্ঘকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী - তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরফ গলানোর লক্ষণ প্রদর্শন করছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে বৈঠকটি কয়েক বছরের মধ্যে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এই কূটনৈতিক সম্প্রসারণ একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তির জন্য মঞ্চ তৈরি করতে পারে, যার সম্ভাব্য পরিণতি হর্ন অফ আফ্রিকার নিরাপত্তা কাঠামোর উপর পড়বে।

বিদ্যমান ইরান-ইরায়েল উত্তেজনা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অস্থিতিশীলতা পর্যন্ত চ্যালেঞ্জগুলি অব্যাহত থাকলেও ইরান সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল সহযোগিতামূলক ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে অবদান রাখতে পারে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তা হলে এটি ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলিকে ইতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যারা জটিল আঞ্চলিক জোটের মাঝেই পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একটি ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় ফ্রন্ট ইথিওপিয়ার উপর বৈদেশিক চাপ কমাতেও অবদান রাখতে পারে কারণ এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার নিরাপত্তা চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

হর্ন অফ আফ্রিকায় একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক পুনর্ভারসাম্য

পরিশেষে, ইরান ইথিওপিয়ার মধ্যে এই নিরাপত্তা চুক্তি হর্ন অফ আফ্রিকার ভূ-রাজনৈতিক ভূদৃশ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও ব্রিকস বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি কাঠামোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সমীকরণকেও দর্শায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হর্ন অফ আফ্রিকার ভবিষ্য গঠনে ইরান ইথিওপিয়ার প্রভাব কেবল বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলে বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার জন্য নতুন পথ তৈরি করবে। তবে এই নিরাপত্তা চুক্তির সাফল্য এর বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব নির্ভর করবে ইথিওপিয়া, ইরান এবং অন্য অংশীদারদের হর্ন অফ আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম হেন জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল জালের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতার উপর।

 


সমীর ভট্টাচার্য অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.