সুবিক উপসাগরে ওয়াশিংটনের প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে চিহ্নিত করে, যা চিনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক আগ্রাসনকে মোকাবিলা করার জন্য ঠান্ডা লড়াইয়ের উত্তরাধিকারকে পুনরুজ্জীবিত করছে।
২০২৫ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিদ্যমান বাহা সা লুনেতা প্রতিবাদ সত্ত্বেও ম্যানিলার মাটিতে নীরবে ঘটে যাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ফিলিপিন্সের সুবিক নৌঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায়ের প্রকাশ। ফিলিপিন্সের এই ঐতিহাসিক ঠান্ডা লড়াইয়ের সময়কার ঘাঁটির পুনরুজ্জীবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় এবং এটি দ্বীপ শৃঙ্খলের সাপেক্ষে ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা জোরদার করার একটি প্রচেষ্টাও বটে। ফিলিপিন্স এই শৃঙ্খলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সুবিক নৌঘাঁটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই ঘাঁটি স্থাপনের সূত্রপাত হয় উপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে, যা আবার উদ্ভূত হয়েছিল দ্বীপপুঞ্জটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মার্কিন সিদ্ধান্ত থেকে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মাহানিয়ান দৃষ্টিভঙ্গির (মার্কিন নৌ আধিকারিক আলফ্রেড থেয়ার মাহানের কৌশলগত ধারণা) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমুদ্রপথের উপর ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। এই পথটি চিনের বাণিজ্যের জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে উঠে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন এবং প্রতিরক্ষার জন্য একটি কৌশলগত ও নিরাপত্তা সম্পদ হিসেবে ফিলিপিন্সের অন্তর্নিহিত মূল্য উপলব্ধি করেছিল। কোরিয়া, পারস্য উপসাগর এবং ভিয়েতনামের সংঘাত এই প্রস্তাবনার বৈধতাও প্রমাণ করেছিল। ফিলিপিন্স ১৯৪৬ সালে স্বাধীন হলেও ঘাঁটিটির উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল।
এর ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের শক্তির কাছে হস্তান্তরের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
ফিলিপিন্সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিটি দু’টি মূল ঘাঁটি অর্থাৎ সুবিক নৌঘাঁটি ও ক্লার্ক বিমানঘাঁটি এবং অন্যান্য সহযোগী কেন্দ্র নিয়ে গঠিত ছিল। এই ঘাঁটিগুলি কৌশলগত বিমান নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদান করত। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের আশ্রয়স্থল ছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ট্রানজিট পোস্টে পরিণত হয়েছিল। সুবিক নৌঘাঁটিতে জাহাজ মেরামতের জন্য ভাসমান সুবিধার পাশাপাশি ড্রাই ডকিং সুবিধা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী রাখার জন্য বার্থিং সুবিধা এবং ডিপো রাখার ব্যবস্থা ছিল। ক্লার্ক বিমানঘাঁটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানশক্তির প্রদর্শনকে সুসংহত করেছিল। এই দু’টি ঘাঁটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এবং কার্যক্রমের দীর্ঘস্থায়িত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল।
তবে ১৯৯১ সালে ফিলিপিন্সের সেনেট এমন একটি ইজারা চুক্তি বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়, যা তাদের মাটিতে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিকে সম্ভব করেছিল। পরবর্তী সময়ে এটিকে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়। এখানে একটি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র রয়েছে, যা এখন এইচডি হুন্ডাই হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রাথমিক ভাবে এটি দক্ষিণ কোরিয়ার হানজিন হেভি ইন্ডাস্ট্রি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ওয়াশিংটনের প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার সুযোগ নিয়ে চিন দক্ষিণ চিন সাগরে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বিস্তার করে। তারা কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করে এবং স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে অবস্থিত মিসচিফ রিফ দখল করে নেয়। ১৯৯৮ সালে দুই পক্ষ ভিজিটিং ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট-এ স্বাক্ষর করে। এই অঞ্চলে চিনের আগ্রাসী আচরণের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটিকে ২০১৪ সালে এনহ্যান্সড ডিফেন্স কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা হয়। এটি ফিলিপিন্সের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত বাহিনীর মোতায়েন এবং আবর্তনকে সহজতর করে। সুবিক ঘাঁটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলির নোঙর পুনরায় শুরু হওয়ার পাশাপাশি এটি ঘটেছিল। ধারাবাহিক এই চুক্তিগুলি থেকে মূলত দু’টি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। প্রথমত, ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অঞ্চল গঠনের অবস্থান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে বিরূপ ভাবে প্রভাবিত করেছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের শক্তির কাছে হস্তান্তরের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, চিনের আগ্রাসী আঞ্চলিক অবস্থানের কারণে সৃষ্ট এই নির্ভরশীলতা একটি উপনিবেশকে তার অঞ্চলের বাইরের ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে প্রতিরক্ষা চাইতে বাধ্য করেছে।
এই অঞ্চলে সম্ভাব্য তেল ও হাইড্রোকার্বন মজুত রয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ফিলিপিন্স যৌথ অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে। এই সব কিছুই চিনের স্বার্থের পরিপন্থী।
সুবিক উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির বর্তমান পুনরুজ্জীবনের সূত্রপাত হয়েছে মূলত একটি মার্কিন বিনিয়োগ সংস্থা সারবেরাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে। হানজিন কোম্পানির পতনের পর ২০২২ সালে দরপত্র প্রক্রিয়ায় চিনা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল এই সংস্থাটি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপিন্সকে সম্পৃক্তকারী একটি ত্রিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিক জাহাজ নির্মাণ অবকাঠামোকে কার্যকর ভাবে পুনরুজ্জীবিত করেছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সাময়িক ভাবে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়েছে। এই উদ্যোগটি ফিলিপিন্সের অবস্থানেও একটি দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আবর্তনশীল প্রশিক্ষণ গ্রহণ থেকে শুরু করে দ্বীপপুঞ্জে তার যথেষ্ট উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলে সম্ভাব্য তেল ও হাইড্রোকার্বন মজুত রয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ফিলিপিন্স যৌথ অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে। এই সব কিছুই চিনের স্বার্থের পরিপন্থী। এ হেন তেল ও হাইড্রোকার্বনের ভাণ্ডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম ফিলিপিন্সে নিজের উপস্থিতি পুনরুজ্জীবিত করতে উৎসাহিত করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফিলিপিন্সের জন্য এর প্রভাব
ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়রের মধ্যে সাম্প্রতিক এক শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন যে, ফিলিপিন্সের কাছে অন্য যে কোনও দেশের চাইতে ‘আরও অনেক বেশি গোলাবারুদ’ থাকবে, যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবিচ্ছিন্ন নৌ ও বিমান উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম করবে। এই অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে সুসংহত করবে, যা এর সেনা মোতায়েন, গোলাবারুদ উৎপাদন, প্রতিরোধমূলক বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে শক্তি প্রদর্শন এবং লজিস্টিক সরবরাহ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে। এই উদ্যোগটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ, ন্যায্য ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার বাণিজ্য রক্ষা করতে সহায়ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপিন্সে একটি সামরিক ভাণ্ডার স্থাপন করার উদ্যোগটিকে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। ফিলিপিন্সের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ তার নিরাপত্তা কৌশলকে শক্তিশালী করার জন্যও সহায়ক, যা আত্মনির্ভরশীলতার উপর ভিত্তি করে আমেরিকার কাছে আউটসোর্স করা হচ্ছে। কারণ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও অখণ্ডতা এই অঞ্চলের মৌলিক বিষয়। তবে ফিলিপিন্সকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ এবং তার অন্যতম প্রধান বিদেশি বিনিয়োগকারী চিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এই অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে সুসংহত করবে, যা এর সেনা মোতায়েন, গোলাবারুদ উৎপাদন, প্রতিরোধমূলক বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে শক্তি প্রদর্শন এবং লজিস্টিক সরবরাহ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে।
উপসংহার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোলাবারুদ সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামো ব্যবহার এবং যানবাহন মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য অঞ্চলটি ব্যবহারের বিষয় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তবুও ভবিষ্যতে প্রথমোক্ত উদ্দেশ্যে অঞ্চলটিকে ব্যবহার করার সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অস্থির অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে বিদ্যমান নিরাপত্তা সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অথবা এই অঞ্চলে চিনের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে এবং তার সরবরাহ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ধূসর-অঞ্চল যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করা থেকে আসলে চিনকে বিরত রাখা ও নিয়ন্ত্রিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ঈপ্সিতা চক্রবর্তী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে গবেষণারত।
নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Ipshita Chakravarty is at present a Ph.D. scholar in the Department of International Relations with Political Science at Jadavpur University, Kolkata. The broad research area ...
Read More +