কম ওজনসম্পন্ন শিশুজন্মের সমস্যা সমাধানের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সম্প্রদায় স্তরের যত্নকে মূলধারার মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে সমন্বিত করা প্রয়োজন।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতে কম ওজনের (এলবিডব্লিউ) মতো প্রতিকূল জন্মগত পরিণতির উচ্চ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী কম ওজনের শিশুর জন্মের হার ১৫.৫ শতাংশ, যার ৯৫ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ঘটে। ২০১৯-২০ সালের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার (এনএফএইচএস-৫) তথ্য থেকে জানা গিয়েছে যে, ভারতে কম ওজনের শিশুর জন্মের অনুপাত ছিল ১৭.২৯ শতাংশ, যার মধ্যে ৬ শতাংশের জন্মের ওজন খুবই কম (<১৫০০ গ্রাম)। সুবিধা-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাগুলিতে স্থিতিশীল বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ও প্রসব-পূর্ব পরিষেবা গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০১৯-২০২১ সালে প্রথম ত্রৈমাসিকে ৮৮.৬ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব গ্রহণ করেছেন এবং ৭০ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা প্রসবপূর্ব যত্ন (এএনসি) পরীক্ষা করেছেন। তবে গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহরাঞ্চলে এই মাত্রা বেশি। সর্বোপরি, এই উন্নতি সত্ত্বেও ২০১৪-২০১৫ সালের এনএফএইচএস ৪ সমীক্ষার পর থেকে এলবিডব্লিউ-এর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়নি।
নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সীমিত শিক্ষা, কিশোরী গর্ভাবস্থা এবং প্রসবপূর্ব যত্নের অভাবের মতো কারণগুলি এলবিডব্লিউ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি করে।
এলবিডব্লিউ শিশুদের প্রাথমিক ভাবে হাইপোথার্মিয়া ও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকিও বেশি থাকে। এমনকি তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। এ ছাড়াও, এলবিডব্লিউ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও ডিসলিপিডেমিয়া-সহ দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, প্রায়শই এই ধরনের সমস্যা তাড়াতাড়ি শুরু হয়।
এটি সুপরিচিত যে, সুবিধাবঞ্চিত সামাজিক পটভূমির গর্ভবতী মহিলাদের এলবিডব্লিউ বাচ্চা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সীমিত শিক্ষা, কিশোরী গর্ভাবস্থা এবং প্রসবপূর্ব যত্নের অভাবের মতো কারণগুলি এলবিডব্লিউ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি করে। মদ, সিগারেট বা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার অকাল জন্ম (৩৭ সপ্তাহের আগে) এবং এলবিডব্লিউ জন্মের সম্ভাবনা বাড়ায়। এ ছাড়াও, এগুলি শিশুর অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে, যার মধ্যে শ্বাসকষ্ট, খাওয়ানোর সমস্যা ও বিকাশে বিলম্ব অন্তর্ভুক্ত। এলবিডব্লিউ-র অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলির মধ্যে রয়েছে একাধিক গর্ভাবস্থা, প্রসূতি জটিলতা, আঘাত, প্রি-এক্লাম্পসিয়া বা এক্লাম্পসিয়া, সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির পাশাপাশি মায়ের পুষ্টির অবস্থা। ভ্রূণের ক্ষেত্রে গর্ভাশয়ের অন্তঃসত্ত্বা বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা (আইইউজিআর), সংক্রমণ ও কিছু নির্দিষ্ট প্লাসেন্টাল অস্বাভাবিকতাও এলবিডব্লিউ-তে অবদান রাখে।
ভ্রূণ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির জন্য সম্পূর্ণরূপে মায়ের উপর নির্ভরশীল। তাই প্রসবপূর্ব যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল মাতৃত্বকালীন পুষ্টি। ভ্রূণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশ, কঙ্কালের বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতার জন্য প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের মতো বিভিন্ন পুষ্টির প্রয়োজন হয়। এই পুষ্টির অপ্রতুল গ্রহণের ফলে বিকাশে বিলম্ব, প্রসবকালীন ফলাফলের সীমাবদ্ধতা এবং এলবিডব্লিউ হতে পারে। শিশুর জন্মের পরেও মাতৃত্বকালীন পুষ্টির ঘাটতি শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশকে প্রভাবিত করে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির পাশাপাশি দুর্বল জ্ঞানগত বিকাশকে গর্ভাবস্থায় মায়েদের দুর্বল পুষ্টির অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই ফলাফলগুলি গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-সহ একটি সুষম খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব এবং নবজাতকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য গঠনে এর ভূমিকার উপর জোর দেয়।
কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের মতো ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টগুলি শক্তি সরবরাহ করে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়। আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২ ও ফোলেটের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টগুলি লোহিত রক্তকণিকা গঠন, হাড়ের বৃদ্ধি এবং জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয়। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণকে উৎসাহিত করে; ভিটামিন সি কোষের মেরামতকে উৎসাহিত করে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়; দৃষ্টিশক্তি ও কোষ বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজন; কোষ সুরক্ষার জন্য ভিটামিন ই এবং বিপাক ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন দরকার। এই প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুলির যেকোনো একটির ঘাটতি শিশুর জন্য প্রতিকূল পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
শিশুর জন্মের পরেও মাতৃত্বকালীন পুষ্টির ঘাটতি শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশকে প্রভাবিত করে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির পাশাপাশি দুর্বল জ্ঞানগত বিকাশকে গর্ভাবস্থায় মায়েদের দুর্বল পুষ্টির অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রসব-পূর্ব সময়কালে মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য শিশুর বিকাশের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ইতিবাচক মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য মা-সন্তানের বন্ধন, নিরাপদ সংযুক্তি এবং শিশুর সুস্থ সামাজিক-আবেগিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি শিশুর মানসিক, জ্ঞানগত ও আচরণগত বিকাশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মাতৃত্বকালীন উদ্বেগ, চাপ ও বিষণ্ণতা শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এটি প্ল্যাসেন্টাল বাধা অতিক্রম করে ভ্রূণে পৌঁছায়, যা ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং চাপের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এই চাপ হরমোনের উচ্চ মাত্রার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ভ্রূণের মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বিকাশ ঘটাতে পারে, যা আবেগ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলগুলিকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করে। ফলস্বরূপ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত গর্ভবতী মহিলাদের সন্তানদের আচরণগত ও জ্ঞানগত সমস্যা এবং মানসিক অসুস্থতা নিয়ে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, প্রসব-পূর্ব এবং প্রসবোত্তর সময়কালে মাতৃত্বকালীন বিষণ্ণতার সংস্পর্শে আসা শিশুরা উচ্চ স্তরের অনিরাপদ সংযুক্তি, মানসিক সমস্যা ও দুর্বল সামাজিক দক্ষতা অনুভব করতে পারে। উপরন্তু, বিষণ্ণতা তার সন্তানের প্রতি সংবেদনশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল যত্ন প্রদানের ক্ষেত্রে মায়ের ক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে।
বিশ্ব জুড়ে প্রতিকূল জন্মগত ফলাফল কমাতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের (ইউএন) স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩-এর (এসডিজি ৩) উদ্দেশ্য হল দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা প্রসবের অনুপাত বৃদ্ধি করে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং মৃত্যুহার মোকাবিলা করা। ভারতে এলবিডব্লিউ জন্মের সমস্যা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলি তাদের নিজ নিজ স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে শক্তিশালী করার উপর মনোনিবেশ করেছে। কিছু কর্মসূচিগত উদ্যোগ এএনসি পরিষেবার মান উন্নত করা এবং মায়েদের জন্য খরচ কমানোর উপর অধিক জোর দেয়, যেমন জননী শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম এবং প্রজনন, মাতৃ, নবজাতক, শিশু, কিশোর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি (আরএমএসসিএএইচ+এন)। অন্য প্রকল্পগুলিতে মাতৃত্বকালীন ওজন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি গর্ভবতী মায়েদের জন্য সম্পূরক পুষ্টি পরিষেবা প্রদানের উপর মনোনিবেশ করা হয়েছে, যেমনটা সমন্বিত শিশু উন্নয়ন পরিষেবা (আইসিডিএস) প্রকল্প এবং পোষণ অভিযানে দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, প্রসব-পূর্ব এবং প্রসবোত্তর সময়কালে মাতৃত্বকালীন বিষণ্ণতার সংস্পর্শে আসা শিশুরা উচ্চ স্তরের অনিরাপদ সংযুক্তি, মানসিক সমস্যা ও দুর্বল সামাজিক দক্ষতা অনুভব করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় মহিলাদের মানসিক-সামাজিক স্বাস্থ্যকে গর্ভাবস্থার প্রতিকূল ফলাফলের ঝুঁকির কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। যদিও প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত - বিশেষ করে চিকিৎসা সম্প্রদায়ের মধ্যে - প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও চাপ এবং জন্মের ফলাফলের উপর তাদের প্রভাব মূলত উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছে। সর্বোত্তম শিশুর বিকাশের জন্য, উপযুক্ত সহায়তা ও চিকিৎসা এবং মা ও শিশু উভয়ের জন্য একটি লালন-পালনের পরিবেশের ব্যবস্থার মাধ্যমে মাতৃ মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রজনন স্বাস্থ্যের ফলাফলের উন্নতির জন্য হাসপাতালভিত্তিক পদ্ধতির ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরে। মাতৃত্বের চাপ কমানোর জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও সম্প্রদায় পর্যায়ে প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সহায়তা অপরিহার্য। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের উপর মাতৃত্বের চাপের প্রভাবকে লালন-পালনের পরিবেশকে উৎসাহিত করে এমন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এবং চাপ ব্যবস্থাপনা কৌশলগুলির পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে হ্রাস করা যেতে পারে।
জন্মের ফলাফল উন্নত করার জন্য, শিশুর বেঁচে থাকার হার উন্নত করার লক্ষ্যে মাতৃত্বকালীন চাপ ও পুষ্টির সমস্যা মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলি সুস্থ ভ্রূণের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে একটি সুষম খাদ্যের অধিকার প্রদান, পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করা এবং কার্যকর চাপ ব্যবস্থাপনা কৌশল বাস্তবায়ন করা। একটি সুস্থ ও ইতিবাচক গর্ভাবস্থার অন্যতম পূর্বশর্ত হল একটি সামগ্রিক পদ্ধতি, যা মাতৃত্বের শারীরিক এবং মানসিক উভয় সুস্থতাকে সমর্থন করে।
সীমা পুরি ইউনিভার্সিটি অফ দিল্লির ইনস্টিটিউট অফ হোম ইকোনমিক্সের ডিপার্টমেন্ট অফ ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশনের প্রাক্তন অধ্যাপক।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr Seema Puri, Former Professor in Nutrition at the Institute of Home Economics, University of Delhi has over 40 years of teaching and research experience. ...
Read More +