-
CENTRES
Progammes & Centres
Location
মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী দেশটির উপর গত চার মাসে দু’বার আক্রমণ করা হয়েছে। দু’বার। গত চার মাসে তার দুই শত্রু অর্থাৎ ইরান এবং ইজরায়েল এই হামলা চালিয়েছে। কূটনৈতিক নিরপেক্ষতার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসা এবং প্রতিবন্ধকতাময় কথোপকথনে মধ্যস্থতা করার ক্ষমতার জন্য গর্বিত কাতার ২০২৫ সালের জুন মাসে তার অভ্যন্তরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ইরানের আক্রমণের সম্মুখীন হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দোহায় হামাস নেতাদের উপরও ইজরায়েল হামলা চালিয়েছিল।
এই বহুমুখী আগ্রাসন কেবল দোহার শান্তিতেই প্রভাব ফেলেনি, বরং এর বিদেশনীতির মডেলের ভাঙনকেও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ফলে এই প্রশ্নটিই উঠছে যে, কাতারের বহু-জোট কৌশল কি একটি অনাক্রম্যতা না কি দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং জোটকে শক্ত করার যুগে।
বহু-সারিবদ্ধতার মতবাদ
বহু-সারিবদ্ধতা জোটনিরপেক্ষতার চিরাচরিত ধারণা থেকে একটি উল্লেখযোগ্য বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে। ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় থেকে উদ্ভূত জোটনিরপেক্ষতা ছিল সমদূরত্বের একটি প্রতিরক্ষা কৌশল। এর লক্ষ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দু’টি বৃহৎ শক্তি ব্লকের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে জোটবদ্ধ হতে অস্বীকার করে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে নিরাপত্তা তৈরি করা। এর বিপরীতে, বহু-সারিবদ্ধতা প্রতিরক্ষামূলক দূরত্বের কৌশল নয়, বরং আলোচনার অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য একাধিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি কৌশল। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে এই কৌশলটি ব্যবহার করে ক্রমবর্ধমান গবেষণা চলছে। কিছু বিশ্লেষণ এই পদ্ধতিকে ‘হেজিং’-এর একটি রূপ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুর চাঙ্গিতে মার্কিন সামরিক সম্পদের দেখভাল করে এবং চিনের সঙ্গে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সংযোগ বজায় রেখে চলেছে। বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে নয়, বরং উপযোগিতার মাধ্যমেই নিরাপত্তা তৈরি করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী শৃঙ্খলে একটি অপূরণীয় ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে সমস্ত প্রাসঙ্গিক শক্তির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সদিচ্ছার প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক দশকগুলিতে কাতারের রাষ্ট্রীয় কৌশলকে এই মতবাদের প্রয়োগ হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর বিদেশনীতিকে স্বতন্ত্র অথচ আন্তঃসংযুক্ত স্তম্ভের উপর নির্মিত একটি কাঠামো হিসাবে বোঝা যেতে পারে। এই কাঠামোর ভিত্তি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এর নিরাপত্তামূলক অংশীদারিত্ব। এই অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক স্থাপনা আল উদেইদ বিমানঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে কাতার বিশ্বের পরাশক্তির কাছ থেকে তার আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য একটি অন্তর্নিহিত গ্যারান্টি অর্জন করেছে। এই নিরাপত্তার বলয় কাতারকে সীমাবদ্ধ তো করেইনি; বরং এটিকে আরও সাহসী করেছে।
কাতার ২০১২ সাল থেকে হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়কে আতিথেয়তা প্রদান করে আসছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগের শৃঙ্খল স্থাপন করতে’ কাতারকে অনুরোধ করেছিল।
এই নিরাপত্তা ভিত্তির উপর নির্ভর করে কাতার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই অঞ্চলের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে। এটি অর্জন করা হয়েছে বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষের জন্য একটি মঞ্চ প্রদানের মাধ্যমে, বিশেষ করে হামাস এবং আফগান তালিবানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য। সর্বোপরি, কাতার ২০১২ সাল থেকে হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়কে আতিথেয়তা প্রদান করে আসছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগের শৃঙ্খল স্থাপন করতে’ কাতারকে অনুরোধ করেছিল। ২০১৩ সাল থেকে কাতার তালিবানের রাজনৈতিক কার্যালয়কেও আতিথেয়তা প্রদান আসছে এবং আলোচনার সুবিধা প্রদান করে, যা ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দোহা চুক্তিতে পরিণত হয়। অতএব, বিতর্কিত পক্ষগুলির সঙ্গে এই সম্পর্ক পরস্পরবিরোধী ছিল না, বরং তার মার্কিন জোটের পরিপূরক ছিল। কাতার একটি অনন্য পরিষেবা প্রদান করেছিল, যা ওয়াশিংটন দরকারি বলেই মনে করেছিল কিন্তু নিজের জন্য সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। এটি কাতারের অবস্থানকে একটি সাধারণ মার্কিন ঘাঁটির জন্য একটি অনন্য মূল্যবান অংশীদারে রূপান্তরিত করে এবং এটিকে তার আকারের বাইরেও কূটনৈতিক প্রভাবের স্তর প্রদান করে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে কাতারের বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে এই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশলগুলি অর্থায়ন করা হয়েছিল। এর বিশাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সম্পদ অপরিহার্যতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর তৈরি করেছে, যা কাতারকে ইউরোপ ও এশিয়া উভয়ের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলেছে। এই আর্থিক শক্তি কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
অবশেষে, কাতার চতুর্থ স্তম্ভ অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র - দক্ষিণ পার্স/উত্তর ক্ষেত্র - ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভূত - তেহরানের সঙ্গে উন্মুক্ত শৃঙ্খল বজায় রাখার এই নীতি আঞ্চলিক ঝুঁকিমুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতএব, কাতার একটি দৃঢ় আঞ্চলিক বিদেশনীতি গড়ে তোলার জন্য সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ককে পদ্ধতিগত ভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছিল।
অতএব, প্রতিটি সারিবদ্ধতা একটি স্বতন্ত্র নীতি ছিল না, বরং একটি বৃহত্তর কৌশলে এক একটি বোঝা বহনকারী স্তম্ভ ছিল, যা কাতারকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল যে তাকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল এই যে, একটি মডেল যা দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে উন্নত করেছিল, তা কী ভাবে শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটিকেই একটি আদ্যোপান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করল!
কাতারের মাটিতে আক্রমণ বহু-জোটবদ্ধ মতবাদের একটি সমালোচনামূলক পুনর্মূল্যায়ন এবং কৌশলের মধ্যে সুপ্ত ঝুঁকিগুলি বোঝার জন্য প্ররোচিত করেছে।
বহু-জোটবদ্ধতার ঝুঁকি
কাতারের মাটিতে আক্রমণ বহু-জোটবদ্ধতা মতবাদের একটি সমালোচনামূলক পুনর্মূল্যায়ন এবং কৌশলের মধ্যে সুপ্ত ঝুঁকিগুলি বোঝার জন্য প্ররোচিত করেছে। একক ব্যর্থতার পরিবর্তে গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহকে একটি চাপ হিসাবে দেখা যেতে পারে, যা একটি অস্থির অঞ্চলে এই ধরনের বৈদেশিক নীতি বজায় রাখার অন্তর্নিহিত চ্যালেঞ্জগুলিকেই প্রকাশ্যে এনে দেয়।
প্রথমত, কৌশলগত সংস্কৃতিতে সম্ভবত একটি ভিন্নতা রয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রযন্ত্র পারস্পরিক আন্তঃনির্ভরতার শৃঙ্খলকেন্দ্রিক যুক্তির উপর নির্মিত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা-প্রথম মতবাদের সম্মুখীন হলে এই পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। ইরানের মতো বিপ্লবী মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত সরকার বা ইজরায়েলের মতো নিরাপত্তা-প্রথম মতবাদের অধীনে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকির হিসাব অন্য রকম। তারা কূটনৈতিক শৃঙ্খল সংরক্ষণের চেয়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেয়। এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যা প্রতিরোধ করার জন্য কাতারের কৌশলকে সম্পূর্ণ রূপে কাজে লাগানো হয়নি।
দ্বিতীয়ত, সঙ্কট একটি সুবিধাজনক কেন্দ্র এবং একটি সত্যিকারের অপরিহার্য শক্তি হওয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকেও তুলে ধরেছে। কূটনীতি ও শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাতারের সাফল্যের ফলে এটি অপরিসীম নরম শক্তি ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তবে এই হামলাগুলি দর্শায়, যখন অন্য রাষ্ট্রের মূল নিরাপত্তা স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন একটি সুবিধাজনক অংশীদারের উপযোগিতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সর্বোপরি, কাতারের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা সমালোচনামূলক হলেও এটি এই দাবিকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি যে, কাতার কিন্তু আলোচনার টেবিলে অনন্য মূল্য নিয়ে আসে, যা অন্যান্য পক্ষ পারে না। প্রকৃতপক্ষে, হামাসের সঙ্গে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রায়শই তার পক্ষপাতিত্বের কারণ হিসাবে সমালোচিত হয়।
কূটনীতি ও শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাতারের সাফল্যের ফলে এটি অপরিসীম নরম শক্তি ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, এই কৌশলের ফলে আঞ্চলিক সঙ্কেতের জন্য একটি উচ্চ-ভাবমূর্তির মঞ্চ তৈরি হয়েছে। বহু-সারিবদ্ধতার একটি মূল উপাদান হল একটি রাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তি উন্নত করা। তবুও, এটি তার অঞ্চলকে অন্যান্য শক্তির জন্য তাদের উদ্দেশ্যগুলি সহিংস ভাবে প্রকাশ করার একটি প্রতীকী ক্ষেত্র করে তুলতে পারে। এ ভাবে হামলাগুলিকে কেবল কাতারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না, বরং বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে প্রচারিত বার্তা হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় না দেওয়ার জন্য এটি অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কীকরণমূলক বার্তাও বটে।
পরিশেষে বলা যায়, হামলাগুলি কাতারের নিরাপত্তা বলয়ের একটি অস্পষ্টতাকেই তুলে ধরেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব কাতারের প্রতিরক্ষার ভিত্তি। তা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের হামলা এই নিরাপত্তা গ্যারান্টির সুযোগ এবং প্রয়োগ সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, বিশেষ করে এই দ্বিমুখী মিত্রের তরফে সংঘাতের পরিস্থিতিতে। এই পরিস্থিতি দর্শিয়েছে যে, নিরাপত্তা গ্যারান্টিগুলির অব্যক্ত শ্রেণিবিন্যাস ও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, যা কাতারি নীতিনির্ধারকদের জন্য অনিশ্চয়তার একটি নতুন স্তর তৈরি করে।
২০২৫ সালের হামলাগুলি অভূতপূর্ব সত্যের উদ্ঘাটনও করেছে। এই ঘটনাপ্রবাহ কাতারের প্রতিরোধ ক্ষমতার অনুভূতিকে ভেঙে দিয়েছে, এর বিদেশনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সূক্ষ্ম আলোচনার দাবি জানিয়েছে। আগামী সময়ে কাতারি রাষ্ট্রকে কেবল বর্তমান আক্রমণের প্রতি শুধু দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে না, বরং ভবিষ্যতের আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিতর্ক এখন কাতারের কৌশল সংশোধন করা উচিত কি না তা নিয়ে নয়, বরং কী ভাবে তা করা উচিত তা নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ওআরএফ মিডল ইস্ট-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Samriddhi is an Associate Fellow, Geopolitics at ORF Middle East, where she focuses on producing research and furthering the dialogue on regionally relevant foreign policy ...
Read More +