ভারত ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সার্বভৌম, সহ-উন্নয়নচালিত অংশীদারিত্বই প্রতিরক্ষা বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।
জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে নৃশংস সন্ত্রাসবাদী হামলার কারণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত হয়েছিল। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল নয়াদিল্লি ও রিয়াদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সেতু নির্মাণের জন্য বর্তমান সরকারের আগ্রাসী নীতির অংশ হিসেবে এটি ছিল মোদীর তৃতীয় সফর।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করার মূল উপাদান হিসেবে প্রতিরক্ষাকে তুলে ধরা হয়েছে। ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই মূলত লেনদেন-ভিত্তিক ছিল এবং নয়াদিল্লির তেলের সূক্ষ্ম নিরাপত্তা ভারসাম্য পূরণের জন্য তেলের তীব্র চাহিদার উপর ভিত্তি করে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সামুদ্রিক অঞ্চলে, নিজের স্বার্থ রক্ষায় চিরাচরিত ভাবে ঝুঁকি-বিরোধী ভারতীয় নিরাপত্তা চিন্তাভাবনা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর হুতি জঙ্গিদের আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনী পশ্চিম আরব সাগর ও এডেন উপসাগর জুড়ে ১০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, যাতে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ও ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, যারা বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের কর্মীদের একটি বড় অংশ। এর আগে ২০১৯ সালে ভারতীয় নৌবাহিনী অপারেশন সংকল্পও চালু করেছিল এবং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপসাগরে একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সামুদ্রিক অঞ্চলে, নিজের স্বার্থ রক্ষায় চিরাচরিত ভাবে ঝুঁকি-বিরোধী ভারতীয় নিরাপত্তা চিন্তাভাবনা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভারত ও সৌদি আরব সমুদ্র, স্থল ও আকাশপথে তিনটি সংঘাতময় স্থানে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী, ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধানরা গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব সফর করেছেন। সাধারণ ভাবে আরব রাষ্ট্রগুলিতে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) সঙ্গে ভারতের সফল অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক লাভ প্রদান করেছে। এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে আরও জটিল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্ভাবনা, যেমন প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র সহ-প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়ন।
প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বাস্তবতা
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার জন্য ভারতের বিস্তৃত ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বিদেশি সরঞ্জামের উপর ভারতীয় সামরিক নির্ভরতা ব্যাপক ভাবে হ্রাস করার জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। তিনি আরও দাবি করেছিলেন যে, ভারত এখন তার প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তার মাত্র ৩৫ শতাংশ আমদানি করে, যা পূর্ববর্তী দশকগুলিতে ৬৫-৭০ শতাংশ ছিল। তবুও, স্বদেশি সামরিক ব্যবস্থার বড় মেয়াদের রফতানি এখনও অর্জিত হয়নি, যা প্রকৃত বিক্রির তুলনায় সংবাদ শিরোনামে বেশি নজর কাড়ে। হালকা যুদ্ধ বিমান (এলসিএ) (এইচএএল তেজস) থেকে উন্নত হালকা হেলিকপ্টার (এএলএই) (এইচএএল ধ্রুব) পর্যন্ত… ভারত দেশীয় উন্নয়নে অগ্রগতি অর্জন করলেও অতি-প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
নয়াদিল্লির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলিও তাদের কেনাকাটার ভাণ্ডারে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - তার অপ্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সামরিক শক্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে ও আকার দিতে সক্ষম হয়েছিল। তবে বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি চিনা ড্রোন পরিচালনা করে, মিশর রুশ মিগ-২৯ ক্রয় করেছে এবং বেজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য রিয়াদের দরজায় কড়া নাড়ছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রিয়াদে বিশ্ব প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে চিনা সংস্থাগুলি সর্বাধিক স্থান দখল করে, যদিও মার্কিন সংস্থাগুলি বিক্রয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি চিনা ড্রোন পরিচালনা করে, মিশর রুশ মিগ-২৯ ক্রয় করেছে এবং বেজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য রিয়াদের দরজায় কড়া নাড়ছে।
সৌদি আরব বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সক্রিয় ভাবে কাজ করছে। রিয়াদ এবং আবুধাবি উভয়ই কেবল পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনার জন্য নয়, বরং অর্থায়নের জন্য বাজারে রয়েছে, যেখানে তারা আংশিক মালিকানা দাবি করতে পারে। সৌদি আরব এই ধরনের দুটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত: প্রথমটি হল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুর্কিয়ের তাই কান, যা ইতিমধ্যেই তার উড়ান-পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে, এবং দ্বিতীয়টি হল দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্বাধীন কাই কেএফ-২১, যা ২০২২ সালে তার প্রথম উড়ান পরিচালনা করেছিল।
প্রতিরক্ষা খাতে উচ্চ-প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে ভারত বেশ অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। তবে প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণ করা অপরিহার্য হলেও প্রচলিত যুদ্ধ সরঞ্জাম - কার্বাইন থেকে শুরু করে গোলাবারুদ – বেশির ভাগই বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে থাকবে, বিশেষ করে যখন স্থল-ভিত্তিক অভিযানের কথা ওঠে। বিদ্যমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে ইউরোপীয় শক্তিগুলি কিয়েভে গোলাবারুদ সরবরাহের ঘাটতি পূরণের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত-উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা গভীরতার উন্নয়ন
ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক ৯৩,৮৯৫টি ক্লোজ কোয়ার্টার যুদ্ধ কার্বাইন সরবরাহের জন্য একটি চুক্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক কারাকাল বিজয়ী দরদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে (সর্বনিম্ন মূল্যের চুক্তি প্রদানের মাধ্যমে)। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড (ওএফবি) উভয়ই সেনাবাহিনীর প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার পরে এই বিশ্বব্যাপী দরপত্রটি চালু করা হয়েছিল। তবে কারাকাল চুক্তিটিও এড়ানো যেতে পারত, এমন কারণে ভেস্তে যায়, যার ফলে সামগ্রিক অভিজ্ঞতা খারাপ হয়েছিল। তবুও কারাকাল ভবিষ্যতের সুযোগগুলি মাথায় রেখে হায়দ্রাবাদে একটি ছোট অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি স্থানীয় ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে।
ভারত এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্র উভয়ই একটি অনিশ্চিত ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে, এমন এক সময়ে যখন বেশির ভাগ দেশই ঠান্ডা লড়াইয়ের সমাপ্তির পর থেকে দ্রুততম গতিতে নিজেদের অস্ত্রে সজ্জিত করছে। ভারত এবং তার উপসাগরীয় অংশীদারদের, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার যৌথ বিকাশের ধারণা গ্রহণের জন্য বর্তমানে উপযুক্ত সময় এসেছে।
ভারত এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্র উভয়ই একটি অনিশ্চিত ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে, এমন এক সময়ে যখন বেশির ভাগ দেশই ঠান্ডা লড়াইয়ের সমাপ্তির পর থেকে দ্রুততম গতিতে নিজেদের অস্ত্রে সজ্জিত করছে।
এই ধরনের একটি সহযোগিতামূলক কাঠামোর লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে হবে। প্রান্তিক মঞ্চগুলির জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ভারতের ক্ষেত্রে একটি কঠিন পদক্ষেপ। ২০২৩ সালে দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। ভারতীয় বেসরকারি খাত রাজ্যের প্রতিরক্ষা চাহিদা মেটাতে তার পরিসর সম্প্রসারণ করতে চাইলেও বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্বকে দৃঢ় ভাবে গড়ে তোলা স্বল্প সময়ের মধ্যে শিল্পকে বহুগুণে বৃদ্ধি করার একটি নিশ্চিত উপায়।
ভারত ও সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার জন্য সাইবার নিরাপত্তা সরঞ্জামের মতো অসম যুদ্ধের ক্ষেত্রে সহ-মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা পণ্য বিকাশের জন্য নিবেদিত গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল স্থাপন করতে পারে। তবে এই ধরনের তহবিল ভারতে একটি বেসরকারি খাত-নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত। সাঁজোয়া যান, কার্বাইন, ছোট অস্ত্র, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, চলাচলের সরঞ্জাম এমনকি ছোট নৌকা ও জাহাজের মতো সরঞ্জাম উৎপাদনে অন্যান্য সহযোগিতা দু’টি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে একটি ‘প্রতিরক্ষা সেতু’ গড়ে তোলার জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও উচ্চ মূল্যের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সহ-তহবিল ও সহ-উন্নয়নের নেতৃত্বে সফল ছোট থেকে মাঝারি আকারের প্রকল্পগুলি নৌ জাহাজ নির্মাণের মতো বৃহত্তর ও আরও প্রগতিশীল উদ্যোগের দিকে চালিত করতে পারে। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরী উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যেখানে ভারতীয় শিপইয়ার্ডগুলি দেশের কৌশলগত চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
উপসংহার
এ কথা সত্যি যে, প্রতিরক্ষা খাত একটি কঠিন ক্ষেত্র - প্রযুক্তি স্থানান্তর, বুদ্ধিবৃত্তিগত সম্পত্তি অধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার, যেখানে পশ্চিমি সংস্থাগুলি সর্বোচ্চ আধিপত্য বিস্তার করে। তবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মৌলিক সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করার জন্য একটি সার্বভৌম অংশীদারিত্ব-চালিত পদ্ধতি ভারত এবং উপসাগরীয় দেশগুলির জন্য একটি উন্মুক্ত পথ। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি ব্যবসা ও আমলাতন্ত্রকে এই ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করার জন্য আরও দক্ষতার সঙ্গে একত্রিত হতে হবে, যা অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
কবীর তানেজা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.