Author : Soumya Bhowmick

Published on Feb 11, 2024 Updated 0 Hours ago

বিজয়ী যেই হোক না কেন, পাকিস্তানের অর্থনীতি পরবর্তী সরকারের জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা কঠিন করে তুলবে

রাজনৈতিক নাটকের মধ্যে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট নাটকের জন্য অপরিচিত নয়। পাকিস্তান তেহরিক–ই–ইনসাফ (পিটিআই), বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে কারারুদ্ধ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল, ২০২৪ সালের পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনে সকলের আগে আছে৷ তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হল নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ), যা পিএমএল–এন নামে পরিচিত। নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে একটি গুচি ক্যাপ বেছে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, যার দাম এক লাখ পাকিস্তানি রুপি বলে গুজব। অন্য  প্রতিপক্ষ পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও ২০১৮ সালে অপশাসন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

পিএমএল–এন বার্ষিক রপ্তানি ও রেমিট্যান্স–এর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, সৌদি আরবের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল শোধনাগার চুক্তি চূড়ান্ত করা, এবং চিন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)–এর অধীন প্রকল্পগুলি চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

রাজনৈতিক নাটকীয়তার প্রদর্শন সত্ত্বেও, ২০২৪ সালের নির্বাচনের মনোযোগের কেন্দ্র ব্যক্তিগত নাটকের বাইরে পাকিস্তানের মুখোমুখি গুরুতর আর্থিক পরামিতিতে প্রসারিত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বছর–থেকে–বছর ভিত্তিতে ২৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এবং প্রত্যাশিত ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ বিল ছিল প্রচারাভিযানের চূড়ান্ত পর্বের কেন্দ্রবিন্দু। পিএমএল–এন বার্ষিক রপ্তানি ও রেমিট্যান্স–এর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, সৌদি আরবের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল শোধনাগার চুক্তি চূড়ান্ত করা, এবং চিন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)–এর অধীন প্রকল্পগুলি চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এদিকে, পিপিপি–র ঘোষিত লক্ষ্য মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করা এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলিকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।


একটি অনিশ্চিত অর্থনীতি

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশার মূল কারণ নিহিত আছে অনেকগুলি বিষয় কেন্দ্রীভূত হওয়ার মধ্যে:‌ কোভিড–১৯ অতিমারি দ্বারা সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী দুর্দশা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা, এবং ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ (যা উন্নয়নশীল বিশ্ব জুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার অবনতি ঘটিয়েছে)। ঘটনাগুলির এই সঙ্গম দেশকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে নিমজ্জিত করেছে, যা ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার (ফরেক্স) রিজার্ভ হ্রাস, এবং নাগরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে।

চিত্র ১: পাকিস্তানের জাতীয় মোট মুদ্রাস্ফীতি (বছর–থেকে বছর হেডলাইন ইনফ্লেশন) কোভিড–১৯–এর আগে এবং পরে

সূত্র: বিশ্ব ব্যাঙ্ক

প্রথম এবং সর্বাগ্রে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হল তার ফরেক্স রিজার্ভের চরম পতন। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে এই রিজার্ভ মাত্র ৩.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে নেমে এসেছিল। এটি একটি নগণ্য পরিমাণ, যা দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের আমদানির দাম দেওয়া যায়, যা আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা  ভান্ডারের (আইএমএফ) সুপারিশকৃত তিন মাসের ন্যূনতমের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে নীচে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে
২০২৫ সালের মধ্যে ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রাককলিত ঋণ পরিশোধ করার কঠিন কাজ, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হল চিন ও সৌদি আরবের পাওনা।


চিত্র ২: পাকিস্তানের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স (বিলিয়ন মার্কিন ডলারে)

সূত্র: বিশ্ব ব্যাঙ্ক

পাকিস্তানি রুপির (‌পিকেআর) নাটকীয় অবমূল্যায়ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে বিশ্বের সেরা পারফরম্যান্সকারী মুদ্রা হওয়ার আশা থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে রেকর্ড সর্বনিম্নে পতনের ঘটনাটি ঘটে। এই অবমূল্যায়নের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে, যা জ্বালানি, ভোজ্য তেল ও ডালের মতো প্রয়োজনীয় আমদানিকে প্রভাবিত করে৷


উপরন্তু, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ)–এর পাকিস্তানকে
ধূসর তালিকায় স্থান দেওয়ার যথেষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইতিমধ্যে ২০০৮ সাল থেকে তার জিডিপি–তে আনুমানিক ক্ষতি ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরের ওই তালিকা থেকে দেশটি বাদ যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও, এটি শক্তিশালী অ্যান্টি–মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাস–বিরোধী অর্থায়ন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।


নড়বড়ে বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি

পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের গতিশীলতা জটিল, যা চিন ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রতিফলিত করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণ
জিডিপির ৩৩ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে — এটি বহুপাক্ষিক, প্যারিস ক্লাব, ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ঋণের সংমিশ্রণ, যার মধ্যে চিনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি। এই ধরনের কিছু ঋণের স্বল্পমেয়াদি প্রকৃতি ও উচ্চ সুদের হার, বিশেষ করে প্রাইভেট বন্ড ও চিনা ঋণের, পাকিস্তানের ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাধা।

সিপিইসি সংক্রান্ত অর্থনৈতিক জটিলতা, এবং সেইসঙ্গে ঋণ পরিশোধ কাঠামো পুনর্গঠন করতে চিনের অনিচ্ছা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডার (আইএমএফ)–সহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করেছে।

দুর্ভাগ্যবশত, চিন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), যাকে ২০১৫ সালে একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ হিসাবে কল্পনা করা হয়েছিল, পাকিস্তানের চলতি অর্থনৈতিক সংকটের একটি কেন্দ্রীয় কারণ হয়ে উঠেছে। সিপিইসি সংক্রান্ত অর্থনৈতিক জটিলতা, এবং সেইসঙ্গে ঋণ পরিশোধ কাঠামো পুনর্গঠন করতে চিনের অনিচ্ছা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডার (আইএমএফ)–সহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করেছে। এক দিকে বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক অংশীদারদের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছেন, আর পাকিস্তানের সঙ্গে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের একটি বিদ্যমান আইএমএফ বেলআউট চুক্তিও রয়েছে যা জরুরি প্রয়োজনীয়তার উপর নির্ভরশীল; অন্য দিকে, পাকিস্তান ও আইএমএফ–এর মধ্যে সম্পর্ক চ্যালেঞ্জ দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে, যেহেতু দেশটি গত ৬০ বছরে ২২ বার বেলআউট চেয়েছে।


নির্বাচন পরবর্তী দৃশ্যপট

অর্থনীতি–কেন্দ্রিক নির্বাচন সত্ত্বেও, নির্বাচনী প্রক্রিয়াগত পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত অসংখ্য বিক্ষিপ্ততা দেখা দিয়েছে। ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং পরবর্তী আইনি জটিলতার কারণে অর্থনৈতিক উদ্বেগ থেকে মনোযোগ সরে গিয়েছে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে, এবং মিডিয়ার প্রভাব, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপর হামলা ও ফলাফলের কারচুপির সম্ভাব্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা উচ্চতর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভীতিকে বাড়িয়ে তুলেছে।

একটি অস্থির রাজনৈতিক ভূচিত্রের মধ্যে পাকিস্তানের
৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির পথ চলা কিন্তু সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নীতিগুলি সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়ায়, যা আবারও অতীতের অস্থিতিশীল পদক্ষেপগুলির প্রতিফলন হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির বিরূপ প্রভাবের মোকাবিলা করা, এবং নাগরিকদের — বিশেষ করে দীর্ঘায়িত মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মধ্যে নিমজ্জিত দুর্বল জনসংখ্যাকে — স্থিতিশীলতা নীতির প্রভাব থেকে রক্ষা করা প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

 

আগামী সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে, যার মধ্যে আছে একটি নতুন আইএমএফ কর্মসূচি, ব্যয় হ্রাস এবং ঘাটতি ব্যবস্থাপনার অপরিহার্যতা।


আগামী সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে, যার মধ্যে আছে একটি নতুন আইএমএফ কর্মসূচি, ব্যয় হ্রাস এবং ঘাটতি ব্যবস্থাপনার অপরিহার্যতা। নতুন সরকার যখন তার অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে শুরু করবে, তখন প্রচারাভিযানের প্রতিশ্রুতিগুলিকে একটি শ্লথ অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সারিবদ্ধ করা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। এখন প্রয়োজন একটি জরুরি
সর্বাত্মক পরিকল্পনা, একটি সম্প্রসারিত করের জাল, এবং উপভোগ–ভিত্তিক বৃদ্ধির মডেল থেকে সরে আসা। তার উপর, জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজন কৌশলগুলিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া, যেমন বন্যা ও সম্পর্কিত বিপর্যয়, মোকাবিলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।


অবশেষে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির দিকে পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যাত্রার জন্য একটি সামগ্রিক, সমগ্র–দেশব্যাপ্ত দৃষ্টিভঙ্গির অপরিহার্যতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের জন্য রাজনীতি থেকে অর্থনৈতিক শাসনকে বিচ্ছিন্ন করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের পুনর্মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলি অপরিহার্য।



সৌম্য ভৌমিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের একজন অ্যাসোসিয়েট ফেলো

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.